‘সহদেবদা, এবার আমি উঠব। কাজ আছে।’ বলার সঙ্গে শ্যামল উঠেই দাঁড়াল।
‘আরে বোস বোস, আমিও একটা শিক্ষিত বাঙালি, সুতরাং মাতৃভাষায় সেক্স অর্গানের, এটাও ইংরেজিতে বললুম, একটা নামও জিভ থেকে বেরোবে না।…ছোটো ভাইয়ের বয়সি তো কী হয়েছে, দুজনেই অ্যাডাল্ট পুরুষ এবং কুমার। ঠিক বললুম? কুমার তো?’ সহদেব চোখ মারার চেষ্টা করল শ্যামলকে বন্ধুর পর্যায়ে আনার জন্য।
শ্যামল সেটা লক্ষ করে বলল, ‘নাহ, কাল দেখছি আপনার জন্য রাম বা হুইস্কি রাখতেই হবে। কোনটা রাখব?’
‘তুমি খাও নাকি?’
‘খাই, নিয়মিতই।’ শ্যামলের গলা স্বাভাবিক।
‘আমি মাঝেমধ্যে, তবে কাল খাব, তোমার সঙ্গে। যে-কোনো একটা হলেই হবে। মদের পার্থক্য আমি বুঝি না, যেমন বয়সটয়সের পার্থক্যটা কোনো ফ্যাক্টরই নয়। কলকাতা থেকে হাজার মাইল দূরেও যদি প্রাণ আর মুখ না খুলতে পারি তা হলে কবে কোথায়, কার কাছে খুলব? বাংলায় তো লেখাই যায় না! ইংরেজিটা শিখে বেঁচে গেছি, ইংরেজি কাগজে সবই লেখা যায়, অন্তত সৎ থাকা যায়।’
‘ওরে বাবা, আপনি তাহলে সৎ?’ শিউরে ওঠার ভান করল শ্যামল।
‘আলবাত।’
‘তাহলে কাল দুপুরে আপনি চেক-আউট করছেন। আমি একটায় রিসেপশন থেকে আপনাকে তুলে নিয়ে যাব। তাজমহল দেখার জন্য বাস-এ সিট পেয়ে যাবেন আর পাবদা মাছের ঝোল কেমন রাঁধি সেটাও জেনে যাবেন।’
শ্যামল চলে যাবার পর সহদেব কিছুটা আচ্ছন্ন হয়ে থাকল। এখন তার মনে হচ্ছে, কেয়াকে বিয়ে করে ফেললে এমন কী সর্বনাশ তার হত? কেয়ার তো এখন যথেষ্ট নাম, দেখতেও সুন্দর, সহ্য করা যেত না কী? টাকাও তো ভালো রোজগার করে।
একলা এই ঘরে এখন কাচের দরজায় দাঁড়িয়ে ওপাশের বাগানের দিকে তাকিয়ে থাকার শাস্তি নিজেই তো ডেকে এনেছি। এটা ভেবেও সহদেব নিজের জন্য দুঃখ বোধ করল না কারণ এবার সে তাজমহল দেখবেই।
তিন
সুটকেসটা ঘরের একধারে নামিয়ে রেখে শ্যামল বলল, ‘বেশ গরম, চান করবেন?’
খাটে বসে ঘরের জিনিস ও আসবাব দেখতে দেখতে সহদেব বলল, ‘নাহ, আর একটু পরে।’
‘চা না কফি, কী দেব?’
‘চা।…গ্যাসের উনুন?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমরা মাসদুয়েক হল কয়লার পাট তুলে দিয়েছি।’
‘আমরা মানে? আপনি তো একা।’
‘হ্যা, কিন্তু তাই বলে তো আর হোটেলে খাওয়া চলে না। শমিরা একতলায় থাকে, ওর বর বিদ্যুৎ আর একটা মেয়ে।’
‘বাড়িতে আর কেউ নেই, আপনার ভাই?’
‘বাসু তো দুর্গাপুরে কোয়ার্টারে থাকে। তোমারই বয়সি। ভালো মাইনে পায়, দুটো ছেলে, ওর ঘরটা তালা দেওয়া। মায়ের ঘরটায়, মা মারা যাওয়ার পর থেকে আমিই থাকি। আর যে ছোটো ঘরটায় আগে আমি থাকতাম সেটা কে নেবে তাই নিয়ে মন কষাকষি শুরু হল বাসুর সঙ্গে, তার জের আজও চলছে।’
‘চায়ের জলটা চড়িয়ে আসি, আপনি লুঙ্গি না পাজামা পরবেন।’
‘আমার সঙ্গেই আছে, লুঙ্গি আমি পরি না।’
সহদেব সুটকেস থেকে পাজামা বার করে পরল। সিঙ্গল বেড খাট, টেবলে কয়েকটা ইংরেজি-বাংলা বই, দেয়ালে একটিই ছবি, রামকৃষ্ণের, সাদা-কালো পোর্টেবল টিভি সেট, একটা রেফ্রিজারেটর। ঘরটা তিনতলায়। বেরোলেই ছোটো একটা ছাদ।
ছাদে এসে দাঁড়াল সহদেব। কোনোক্রমে শেষ করা, পুরোনো একতলা দুটি বাড়ি ছাদের নীচেই। দূরে দূরে উঁছু বাড়িগুলো বুঝিয়ে দিল ধনবান লোকেরাও এখানে বাস করে। রাস্তা দিয়ে বহু লোক হেঁটে যাচ্ছে। সহদেব পাঁচিলে হাত রেখে পথিকদের দিকে তাকিয়ে রইল। শ্যামল দুটো চেয়ার টেনে আনল তারপর চা।
‘চা খেয়ে, চান করে চলুন বাসের টিকিটটা নিয়ে আসি। নব্বুই টাকা, আমি বলে রেখেছি ট্রাভেল এজেন্টকে।’
চায়ে চুমুক দিয়ে দূরের বাড়িগুলোয় চোখ বুলিয়ে সহদেব বলল, ‘একা থাকতে অসুবিধে হয় না?’
‘কীসের অসুবিধে? ঠিকে কাজের লোক সব করে দিয়ে যায়, রান্নাটা শুধু নিজে করি। সহজ রান্না, ডাল, ভাত, মাছ একবেলা রাঁধি।’
‘তা বলছি না। নিঃসঙ্গ বোধ কর না?’ সহদেব একটু তীক্ষ্ন করল নজরটা। শ্যামলের মুখে কোনো ভাবান্তর ঘটল না দেখে দমে গেল।
‘আপনি বলছেন বিয়ে করার ইচ্ছে হয় কি না?…না।’
ছোট্ট একটা শব্দ, ‘না’। কেন হয় না, সেটা জানতে চাইবার উৎসাহ সহদেবের এল না। তবে স্বগতোক্তির মতো সে বলল, ‘আমার মাঝে মাঝে হয়। ভয় থেকে হয়। একদিন তো বুড়ো হব, অশক্ত হয়ে পড়ব, চাকরি থাকবে না, লেখালেখির সামান্য টাকায় তো আর চালানো যাবে না…ধর বড়ো কোনো অসুখে পড়লুম, কে তখন দেখবে?’
‘তাহলে বিয়ে করে ফেলুন, এখনই না করলে দেরি হয়ে যাবে। চাকুরে মেয়েকেই করুন, এই পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ…অনেক পেয়ে যাবেন। আপনার অফিসে কেউ নেই?’
সহদেব একচোট হেসে নিয়ে মাথা নাড়ল। ‘আছে তবে বিয়ে করা যায় না।’
‘কাগজে বিজ্ঞাপন দিন কিংবা পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপন পড়ুন।’
‘বিজ্ঞাপন দিলে কী লিখব বল তো? বিজ্ঞাপন চার্জ কমাবার জন্য তো সাংকেতিক পদ্ধতিতে লিখতে হবে, দঃ রাঢ়ি, বসু, পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি, সুশ্রী, উঃ শ্যাম, চুয়াল্লিশ, এমএ কেঃ সঃ চাকুরে, স-অসঃ চাকুরে, পঁয়ত্রিশ মধ্যে, দাবি নাই, বিধবাও চলিবে।…এইভাবে লিখব তো?’ সহদেব কথাগুলো বলে মজা পেল।
‘উঁহু, একটু বেশিই ইনফর্মেশন দিয়ে ফেলেছেন। খরচ কমান।’ শ্যামলের গলাতেও মজা।
‘কোনটে আবার বেশি?’
‘আসল কথাটাই তো বললেন না, কলকাতায় নিজের বাড়ি…কলিঃ নিজ বাড়ি, এটা বলতেই হবে। মেয়েরা বা তাদের বাপ-মা ওইটে আগে দেখে। ওরা ভাবে বাড়ি থাকলে মেয়ের পথে বসার ভয় আর থাকবে না।’
