‘এরাও ইনভাইটেড হয়!’ সহদেবও ফিসফিস করল এবং মনে হল গলা থেকে ওর বুকের দিকে ঢালটা অনেকটা কেয়ার মতোই। কবজির গড়নও অনেকটা। ব্রেসিয়ারের ফিতের সঙ্গে গায়ের মাজা রঙের মিল রয়েছে। তবে কেয়া ছিল আরও মোটা, এখন নিশ্চয় আরও হয়েছে। বিয়ের পর আর সে ওকে দেখেনি। পাঁচ বছর তো হয়ে গেল। মহিলার মধ্যে কেয়ার শরীরের কিছু কিছু আদল সে খুঁজে পাচ্ছে। পাছাটা তো এখন আঁচ করা সম্ভব নয়, পরে দেখে নেবে।
মহিলাটি বক্তৃতার মাঝেই উঠে চলে গেলেন সহদেবের দিকে বিনীতভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে। মুখ ঘুরিয়ে ওর চলে যাওয়াটা অর্থাৎ পিছন থেকে দেখাটা আর সহদেবের হল না। কে কী ভাববে!
শ্যামল এল পাঁচটা নাগাদ।
‘ভাবলুম একা রয়েছেন যাই দেখা করে আসি। কাল কিন্তু এসে নিয়ে যাব এই সময়।’
ওকে পেয়ে সহদেব যেন বেঁচে গেল।
‘বোস বোস, চা আনাই। টেলিফোনে বলে দাও তো, প্যান্ট্রির নম্বরটা কার্ড থেকে দেখে নাও।’
টেবলে রাখা কার্ডে নানান নম্বর লেখা। ডায়াল করে ঘরের নম্বর বলে এক পট চা দিয়ে যাবার কথা বলে শ্যামল জিজ্ঞাসা করল, ‘সহদেবদা আর কিছু বলব?’
‘না না, অবেলায় খাওয়া এখনও পেটটা ভার রয়েছে। তুমি কিছু খাও তো বলে দাও।’
ফোন রেখে শ্যামল বলল, ‘আমিও খাব না। নেমন্তন্ন ছিল এক বন্ধুর বাড়ি, অচিন্ত্য নিয়োগি। বলল আপনাকে চেনে।’
‘আমাকে চেনে! নিয়োগি? …কই মনে তো পড়ছে না। করে কী?’
‘এল আই সি-র অফিসার বছর পনেরো আগে আপনার সঙ্গে একদিন মাত্র আলাপ হয়েছিল, আইল্যান্ডস নার্সিং হোমে। অচিন্ত্যর বাবার প্রস্টেট অপারেশন হয় ওখানেই। আপনারও কার যেন অপারেশন ছিল।’
‘ওহ হো, এতদিন পর কী আর মনে থাকে! শমির…অ্যাপেন্ডিক্স অপারেশন ছিল।’ কথাটা বলার সময় বুকটা একটু খচ করে উঠল। ‘অদ্ভুত মেমারি তো!’
‘অচিন্ত্যর! ওর মেমারি হাতির মতো, খুঁটিনাটি সব মনে থাকে। ও বলে দিল, আপনার পাজামা খদ্দরের হলুদ হাঁটু পর্যন্ত পাঞ্জাবি, কাঁধের ঝোলা, সঙ্গে ছিলেন আপনার বোন আর ভগ্নিপতি। অচিন্ত্যকে নার্ভাস হয়ে বসে থাকতে দেখে আপনি নিজেই ওর পিঠে হাত রেখে বলেছিলেন, ‘এত চিন্তার কী আছে, প্রস্টেট অপারেশন খুব জটিল কিছু নয়, হরদম করে করে সার্জনদের হাত পেকে গেছে।’ মনে করে রেখেছে এই জন্যই, সেদিন ওই একটা সামান্য কথাই ওই সময়ে ওকে খুব ভরসা জুগিয়েছিল।’
‘ওর বাবার মৃত্যু ঘটেনি তো?’
‘আরে না না, বুড়ো এখানেই ছেলের কাছে থাকেন। রোজ দোকান-বাজার করেন।’
‘কিন্তু যদ্দুর মনে পড়ছে, আমার নাম তো ওকে বলিনি।’
‘হয়তো আপনার সঙ্গের ওদের কারুর কাছ থেকে শুনেছে।’
চা আসতে কথা অন্যদিকে ঘুরে গেল। সহদেব এতক্ষণ অস্বস্তিবোধ করছিল নার্সিং হোম প্রসঙ্গে। সুদূর দিল্লিতে এমন একজন রয়েছে যে শমিতার অপারেশনের দিন নার্সিং হোমে ছিল। কেয়া ছাড়া পঞ্চম একজনও যে আছে, যদিও সে জানে অ্যাপেন্ডিক্স অপারেশন তবু এত বছর পরও ঘটনাটার স্মৃতি অস্বস্তিকর। অনিতাদের বাড়ি থেকেই শমিতা নার্সিং হোম যায় এবং তিনদিন পর ওই বাড়িতেই ফেরে। বাসুদেব আর কেশবের মা জেনেছিল দিদিদের সঙ্গে শমি দিঘায় বেড়াতে গেছে। হয়তো কেয়া জানত যাওয়াটা দিঘায় নয়- কিন্তু একবারও সে এটা নিয়ে কোনোরকম উচ্চচবাচ্য সহদেবের কাছে করেনি। এমনকী কেয়ার কোনো প্রশ্নের সম্মুখীনও শমিকে হতে হয়নি।
অদ্ভুত চরিত্র! সহদেব অবাক হয় কেয়ার কথা ভাবলে। সহদেব বিয়ে করবে এই আশায় দশটা বছর শবরীর মতোই প্রতীক্ষা করে গেছে। বি এ পাশ করেছে প্রচুর মুখস্থ করে, সাধারণভাবে। কিন্তু ক্ল্যাসিকাল সংগীতটি স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহে যত্ন করে শিখেছে। সে জানে এই জায়গায় কেয়া সূক্ষ্ম শিল্পবোধের দ্বারা মহান সুকুমার অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। কিছু একটা তবু সৃজন করে কেয়া, সহদেব যেটা পারে না। ও’ নিল-এর একটা নাটকের ছায়া ধরার চেষ্টাতেই তার নাট্যকার কেরিয়ার শেষ। হয়তো, এ জন্যই যাচ্ছেতাই ভাবে কেয়ার সঙ্গে কথা বলেছে, অপমান করেছে। ওর নিবেদিত ভালোবাসাকে তার ন্যাকামো মনে হয়েছে। অথচ সে জানত, এখনও বিশ্বাস করে, কেয়ার মধ্যে কৃত্রিমতা নেই। ওর প্রকৃতিটাই গভীর। একবার যা বিশ্বাস করে বা আঁকড়ে ধরে সেটা ও ছাড়বে না।
বিয়ের জন্য বাড়ি থেকে অসহনীয় চাপ ওর উপর দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু সহদেবের প্রতি অটল ছিল কেয়া। তখন বয়স উনত্রিশ। ওর দাদা রঞ্জন এসে সহদেবের হাত ধরে বলেছিল, ‘তুমি অনুমতি না দিলে কেয়া বিয়ে করবে না।’
‘ও সহদেবদা, চা-টা শেষ করুন।’ শ্যামল অবাক স্বরে বলল, ‘পেপার ঠিকমতো পড়েছেন তো? রিঅ্যাকশানস কী?’
‘এক মহিলা পাশে বসেছিলেন, তাকেই মনে পড়ছিল। অবাঙালি, হয়তো পাঞ্জাবি, একটা রাগেড প্রিমিটিভ, প্যাসন মুখে মাখানো যেটা সেক্সুয়ালি আমাকে অ্যারাউজ করেছিল।’ সহদেব একটু ভেবে চোখ কুঁচকে আবার বলল, ‘আচ্ছা শ্যামল, আমি ইংরেজিতে এটা বললুম কেন?…সেক্সুয়ালি অ্যারাউজ কী বাংলায় বলা যায় না?’
‘যায় তো নিশ্চয়ই তবে আমার বয়সি, ছোটো ভাই-স্থানীয়র কাছে বলতে গেলে যে বাংলাটা বলতে হবে, সেটা আপনি বলতে পারবেন না। বললে এবং শুনলে আমাদের দুজনের কানই লাল হয়ে যাবে।’
‘অথচ এটা কান লাল হওয়ার মতো একটা ব্যাপার নয়…আদি অনুভব, মানবিক, স্বাভাবিক। অথচ একে প্রকাশ করার মতো চলতি শব্দ বাংলা ভাষার নেই! আমরা, শিক্ষিতরা নিজেদের মধ্যে যখন বলি তখন সেক্স অর্গানগুলোর নাম আর বাংলায় জিভে আসে না, অন্য ভাষার সাহায্য নিয়ে বলতে হয়….পেনিস, ভ্যাজাইনা!…এসব কী, য়্যাঁ? অথচ অশিক্ষিত অমার্জিতদের মুখ থেকে পথেঘাটে বাংলায় যা বেরোয় আর না শোনার ভান করে ভদ্রলোক ভদ্রমহিলাদের যা শুনতে হয়, বাংলা নাটকের কোনো চরিত্র যদি…ধরো আমি যদি এখন তোমায়-এ কী যাচ্ছ নাকি!’
