বুদ্ধিমান, সুশিক্ষিত, রুচিমান লোকেদের সামনে তার বিদ্যার, মেধার পরিচয় দেবার জন্য তাকে আমন্ত্রণ করে আনা হয়েছে। অথচ তার মুখ দিয়েই কিনা ইতরের মতো, ‘তোমাকেও তাহলে জ্বলেপুড়ে মরতে হবে’, এই ধরনের মানসিক হীনতাও তার মধ্যে থিতিয়ে আছে যা বাইরের জগৎ জানে না।
লজ্জাটা শমিতার আর অসিতের এবং তা পাওয়া উচিত কিনা সেটা অন্য কথা। কিন্তু সে তা পাবার ভয়ে কাতর হয়ে পড়েছিল। পড়ার কি কোনো দরকার আছে? সামাজিক নিন্দার ভয় না থাকলে সে অবিবাহিত বোনের পেট হওয়া নিয়ে কোনো চিন্তায়ই পড়ত না। এমন অবস্থা তো কেয়ারও হতে পারত, সৌভাগ্যবশত আজও হয়নি। বেচারা অসিত, তারই সমবয়সি ভগ্নিপতি, ফেঁসে গেল। ওকে পাপী বললে তার নিজেকেও বলা উচিত। মনে মনে বলতে চেষ্টা করে স্বচ্ছন্দেই বলতে পেরেছে।
অথচ সে অসিতকে বলেছিল, ‘দুশ্চরিত্র, লম্পট। একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করে দিলে! অনিতার উচিত তোমাকে ডিভোর্স করা। শমিতা তোমাকে কোর্টে নিয়ে যেতে পারে তা জানো?’
কিন্তু না অনিতা, না শমিতা, না সে নিজে অসিতের বিরুদ্ধে কিছুই করেনি, সম্ভ্রম খোয়াবার ভয়ে।
উচিত ছিল। তার একটা কিছু করা উচিত ছিল। কিন্তু অসিতের গালে একটা চড়ও সে মারতে পারেনি। বরং চিন্তায় পড়েছিল, নার্সিং হোমের খরচটা তার ঘাড়ে যদি চাপিয়ে দেয়। যদি অসিত বলে বসে: একা আমাকে দায়ী করছেন কেন, শমিতারও তো সায় ছিল। অর্ধেক খরচ শমিতার হয়ে আপনি দিন? নয়তো রইল ওর পেটের বাচ্চচা।
এতটা পর্যন্তও সে ভেবেছিল, অসিত যদি এই ধরনের কথা বলেই তাহলে সে বলবে, ঠিক আছে, শমিতার বাচ্চচা হোক আমিই তাকে মানুষ করব।
কিন্তু-কোথায় মনের মধ্যে সামাজিক মানমর্যাদা বোধের খুব পুরোনো একটা বাগান আছে। সেখানকার ফুলগুলো শৈশব থেকেই চেনা…মুচকি হাসি, বাঁকানো ঠোঁট, কথা বলতে বলতে থেমে গিয়ে আড়চোখে চাওয়া, ভ্রু তুলে মুখ ফিরিয়ে রাখা, গা টেপাটেপি।
তবুও বাগানটা রয়েই গেছে। বিদ্যাবুদ্ধি, অনুভূতি দিয়ে সব মেনে কাজের মধ্য দিয়ে তার ধারণা বা বিশ্বাসগুলোকে সে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না। এই রকম কাচের দরজা সবসময়ই তার সামনে। ঠেলাঠেলি করে খুলতে গিয়ে ভেঙে যাবার ভয়ে সে থমকে যায়। অথচ ওপরেই একটা বাগান সে দেখতে পাচ্ছে যার ফুলগুলো অজানা, স্বচ্ছন্দ বাতাসও বইছে।
কেয়াকে সে বিয়ে করেনি। দশ বছর অপেক্ষা করে বাড়ির পছন্দ করা পাত্রর গলায় সে মালা দিয়েছে। বোধহয় তারা দুজনেই বেঁচে গেছে। শমিতার বিয়ে অনিতার সংগ্রহ করা পাত্র বিদ্যুতের সঙ্গে হয়েছে। শমিতা শান্তিতে নেই।
সহদেব সুটকেস থেকে টাইপ করা কাগজগুলো বার করে, ঝালিয়ে নেবার জন্য, মৃদুস্বরে পড়তে শুরু করল। মাঝে মাঝে থেমে সামনের শ্রোতাদের দিকে যেভাবে তাকাবে, তার মহড়া দিল। তখন সে কেয়া, শমিতা, অসিত, বিদ্যুৎ এদেরই মুখগুলো দেখতে পায়।
কণ্ঠস্বর ভালো, ইংরেজি উচ্চচারণ ভালো, ভঙ্গিটা আকর্ষণীয়, তার প্রবন্ধ পাঠ তারিফ পেল। সহদেব মঞ্চ থেকে নেমে চেয়ারে ফিরে আসতেই পাশের চেয়ারের মহিলা ডানদিকে মাথা হেলিয়ে তাকে ইংরেজিতে বললেন, ‘সিক্সটিনথ সেঞ্চুরিতে রাজস্থানের পশ্চিমে কয়েকটা গ্রামে মেয়েরা নাটক করত বৈশাখী পূর্ণিমার রাতে। ওদিকে ঘুরতে গিয়ে আমি এটা জেনেছি। এখন অবশ্য আর হয় না। কাহিনিগুলো ট্র্যাডিশনাল, পৌরাণিক রাধাকৃষ্ণ নিয়ে। কিন্তু সংলাপ আর গান তক্ষুনি ওরা বানিয়ে নিত। অনেকটা বাংলার কবিগানের মতো। এখন তো এই ফর্মে রাস্তায় স্ট্রিট ড্রামা হচ্ছে!’
মহিলা মুচকে হাসলেন। মুখে টোল পড়ল। পুরুষদের মতো ঘাড় পর্যন্ত ছাঁটা কালো চুলে বাম রগের কাছ থেকে কানের উপর দিয়ে পিছন পর্যন্ত এক ইঞ্চি চওড়া সাদা চুলের পটি। সহদেব হাসিটা ফিরিয়ে দিয়ে মাথাটা পাশে কাত করে বলল, ‘আমরা আধুনিক হচ্ছি তো, তাই সিক্সটিনথ সেঞ্চুরি থেকে নাটকের ফর্ম খুঁজে আনছি।’
কথাটা বলে সহদেব মহিলার মাথায় আড়চোখে নজর ফেলল। কী একটা কেমিক্যাল দিয়ে যেন সাদা করা যায়। মন্দ দেখায় না। অনেক মেয়ে, পুরুষই এটা করে, বহুজনের মধ্যে এদের চোখে পড়ে যায়। আর পাঁচটা লোকের থেকে যে এরা রুচিতে, বিত্তে, শিক্ষায় ও মর্যাদায় আলাদা, তারই বিজ্ঞাপন যেন ওই সাদা চুলের দাগ। তার ক্ষীণ একটা ইচ্ছা হল, চুলে এই রকম একটা সাদা ব্যাপার করতে পারলে কেমন হয়। কিন্তু একটা ইউ ডি ক্লার্ককে কি মানাবে? ইউনিভার্সিটির মাস্টার হলেও নয় চলে যেত।
আর একজনের প্রবন্ধ পাঠ হচ্ছে। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক ডক্টর অরোরা পার্বত্য উপজাতিদের মধ্যে মৌখিক সাহিত্যের উৎসের হদিশ ঘরের জন্য ত্রিশ মানুষকে দিচ্ছেন। সহদেব আবার আড়চোখে পাশের মাথার দিকে তাকাল কাঠ হয়ে সামনে মুখ করে। ইনি কে হতে পারেন? এঁর স্বামী বা বন্ধু কী আজকের কোনো বক্তা? কিংবা রিসার্চ ফেলো? কাগজের লোক? অথবা নাটকের পরিচালক? অভিনয় করেন?…হতেও পারে কিংবা বুটিকের মালিক। বয়স চল্লিশের এধার-ওধারে, চমৎকার একটা মিষ্টি গন্ধ ঘাড় বা চুল থেকে আসছে। ইন্টিমেট বোধহয়, আর তো কোনো সেন্টের নাম সে জানে না, তবে গন্ধটা তাকে মাতিয়ে তুলছে।
‘ছেলেমানুষের মতো!…সবাই যা জানে তাই বলছে।’ মহিলা আবার মাথা কাত করে ফিসফিস করলেন।
