‘আপনি তাহলে এবার বিশ্রাম করুন, কাল তো পেপার পড়তে হবে… যদি পেট ভার থাকে তা হলে রাতে আর কিছু খাবেন না।’
‘না না, স্রেফ উপোস।’
বিছানায় শুয়ে সকালে স্টেশনে কেনা খবরের কাগজটা চোখের সামনে তুলে পড়তে শুরু করল। কয়েক মিনিট পর সে কাগজটা নামিয়ে দুটো হাত আড়াআড়ি কপালের উপর রাখল।
ঝামেলা। শব্দটা মুখ থেকে বেরোনো মাত্র একটা গুমোট অনুভব তার মাথাটাকে ভারী করে দিয়েছে। কী যেন একটা খারাপ ঘটনা ঘটবে, এমন একটা সন্দেহ তার কাজকর্মের, পড়া ও লেখার, এমনকী যৌন আবেগের উপরও প্রভাব বিছিয়ে রেখেছে সেই ব্যাপারটা থেকে। পনেরো বছর ধরে সে দমচাপা অস্বস্তিকর একটা অবস্থার মধ্য দিয়ে চলেছে যাতে তার পরিবারের লোকেদের অবদানটাই বেশি। তার মধ্যে শমিতার ভূমিকাটাই মুখ্য।
বছর পনেরো আগে কেয়ার কাছ থেকে সে খবরটা শোনে। মা তখন এক বছর ধরে দাদার কাছে। বাসুদেব ড্রাফটসম্যানশিপ পড়ছে যাদবপুরে। কেরিয়ার তৈরি করার জন্য খুব খাটছে। সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যায় ফেরে। শমিতা ছুটির দিনে থাকে বেলগাছিয়ায় অনিতার কাছে। রাতে অসিত পৌঁছে দিয়ে যায় গাড়িতে। সহদেব নিজেও বাড়ি ফেরে, কোনো কোনো দিন রাত এগারোটায়। সারাদিন বাড়ি থাকে শুধু কেশবের মা।
শনিবার সহদেবের অফিসে ছুটি। শমিতা কলেজ থেকে বেলগাছিয়ায় চলে যাবে, বাসুদেব সন্ধ্যায় ফিরবে, কেশবের মা দরকার না পড়লে দোতলায় ওঠে না। সহদেব দুপুর থেকে তার নিজের ছোট্ট ঘরটায় একাই। কেয়া আসবে।
সে তখন বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিল। কেয়া ঘরে ঢুকে দরজার একটা পাল্লা ভেজিয়ে তার পাশে খাটে বসল। কিছুক্ষণ কথা বলার পর সে হাত ধরে অল্প টান দিতেই কেয়া তার বুকের উপর ঝুঁকে এল। এই সময় কেয়া কথাটা বলবে, ‘বড্ড সাহস তোমার, দরজা খোলা রয়েছে না?’ তখন সহদেব বলে থাকে : ‘বন্ধ করে দিয়ে এসো।’ কেয়া বলবে, ‘তুমি দাও, আমার লজ্জা করে’। তখন সহদেব উঠে গিয়ে খিল দেবে।
সেদিন, সেই শনিবারে, যথারীতি কেয়া বুকের উপর ঝুঁকে পড়ল। ব্লাউজের গলার ফাঁক দিয়ে সে ভিতরে তাকাবার ভান করল। তারপর ওর গলা জড়িয়ে ধরে আকর্ষণ। এবার কেয়া বললেব-‘বড্ড বাড়াবাড়ি করছি আমরা…ভয় করে।’
‘কীসের ভয়!’ সহদেব ধড়াস করা হৃৎপিণ্ডটা সামলে নিয়ে বলেছিল।
‘যদি’…
‘যদি কী?’
‘…কিছু হয়ে যায়?’ বুকে মাথা রেখে কেয়া ফিসফিস করে বলেছিল, প্রায় মাফ চাওয়ার মতো গলায়।
‘হবে না, কিছু হবে না। তুমি তো লেখাপড়া জানা, আমিও…ব্যবস্থা নিয়েই তো…’। সহদেব বিরক্তি চাপল না।
তার মুখের খুব কাছে কেয়ার মুখ। সে দেখল চোখ দুটোয় যন্ত্রণা আর ভয় মিশে ওকে অসহায় করে দিচ্ছে।
‘জান, শমিতার পেটে বাচ্চচা।’ দু-হাতে তার কাঁধ আঁকড়ে বুকে মুখ গুঁজে কেয়া ফুঁপিয়ে উঠল।
কথাটা মাথার মধ্যে বসতে কয়েক সেকেন্ড লেগেছিল। তারপর সে বলে, ‘কী বললে?…য়্যা?’
‘হ্যাঁ, আজই কলেজে ও আমায় বলল। আমি বিশ্বাস করতে পারছিলুম না…কিন্তু এই রকম কথা কী মিথ্যে মিথ্যে কেউ বলতে পারে?’
কেয়া ফুঁপিয়ে চলেছে। নির্ভেজাল ওর চোখের জল। সহদেবের মনে হল তাকে শ্মশানে নিয়ে যাবার জন্য খাটে শোয়ানো হয়েছে। ‘বল হরি’ বলে খাটটা তোলার আগে বুকের উপর শেষবারের মতো কেউ কেঁদে নিচ্ছে।
শুকনো গলায় প্রথম কথাটা সে বলল কিছুক্ষণ পর, ‘আর কেউ জানে?’
‘দিদি জানে।’
‘আর কেউ?’
‘বোধহয় না। কাউকে বলতে বারণ করেছে, শুধু তোমায় বললুম।…কেন, বলব না তোমায়?’
কিছুক্ষণ পর সে আসল প্রশ্নটা করে, ‘কাজটা কার,…বলেছে?’
‘হ্যাঁ।’ তারপর কণ্ঠস্বর সহদেবের বুকে মিশিয়ে সে বলেছিল, ‘জামাইবাবু।’
প্রায় পনেরো বছর আগে একদলা ধোঁয়া তার বুকের মধ্যে ঢুকে গেল, এখনও যা তাকে কাশতে কাশতে প্রায়ই দম বন্ধ করায়।
‘চারমাস হয়ে গেছে।…নার্সিং হোমে অপারেশন করাবার ব্যবস্থা হয়েছে, ভয়ের কিছু নেই বলেছে।’
‘কাউকে আর বলবে না, কেউ যেন জানতে না পারে।’ কঠিন, ভয় দেখানো স্বরে সহদেব বলেছিল।
সিধে হয়ে বসে মাথা নাড়তে নাড়তে কেয়া খুব আন্তরিকভাবে বলে, ‘কাউকে না,মরে গেলেও না। এই রকম লজ্জার কথা কি বলা যায়! আমার নিজের বোনের এমন অবস্থা হলে কি কাউকে…’
‘চুপ করো।’ কর্কশ চাপা ধমকে ওকে থামিয়ে দিয়ে সহদেব উঠে বসে। যদি জানাজানি হয় তাহলে বুঝব তোমারই কাজ, তা হলে কিন্তু-‘
কেয়া ঝাঁপিয়ে তার দুটো পা বুকে চেপে ধরে হাউ হাউ করে উঠেছিল।
‘আমাকে তুমি বিশ্বাস করো, তোমাকে ছুঁয়ে দিব্যি করছি, আমার মুখ দিয়ে যদি একটা কথাও বেরোয় তাহলে তুমি আমাকে-‘ কেয়া আর কিছু বলার মতো কথা খুঁজে না পেয়ে অসহায়ের মতো সহদেবের পায়ে মাথা ঘষতে থাকে।
পা টেনে নিয়ে সে ধীর গলায় বলেছিল, ‘তোমাকেও তাহলে জ্বলেপুড়ে মরতে হবে।’
কথাগুলো এতবছরেও সে ভোলেনি। সহদেব খাট ছেড়ে উঠে, সিলিং থেকে মেঝে পর্যন্ত ঝোলানো ভারী পর্দাটা সরাল। কাচের দরজার পরে ছোটো বারান্দা, বিস্তৃত বাগান আর চওড়া বাঁধানো রাস্তা। এয়ারকুলারের জন্য ঘরটা ঠান্ডা। তার মনে হল বাইরে এখন চমৎকার বাতাস বইছে। কাগজে দেখেছে গতকাল এখানকার তাপ ছিল উনত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
কাচের দরজাটার দুটো ছিটকিনি খুলে ঠেলাঠেলি করল। কোথায় যেন আটকে যাচ্ছে। আর চেষ্টা করতে গিয়ে কাচ যদি ভেঙে যায়! সে দাঁড়িয়ে বাইরের বাগানের দিকে তাকিয়ে রইল। বিকেলে ফুলের ছোটো ছোটো সাজানো বাগিচায় যেসব ফুল দেখেছে শুধু গোলাপ ছাড়া, তাদের কোনোটাই সে চেনে না।
