শমিতা সেই সময় বলে ওঠে, ‘মমতাজ মহলের কটা সন্তান? উনিশ বছরের বিয়েতে চোদ্দোটা! বাচ্চচা হয়ে বেচারা অ্যানিমিয়ায় মারা গেল আর অমনি, ভুলি নাই, ভুলি নাই প্রিয়া, বলে শাজাহান একটা তাজমহল বানিয়ে দিল। প্রেমের কী ছিরি!’
তখন ‘তাজমহল’ শব্দটা সহদেবকে মনে পড়িয়ে দেয়, একদা সে একটা গল্প লিখেছিল যেটা এখনও ফাইলের মধ্যে রয়েছে। তারপরেই মনে পড়ল, এখনও তার তাজমহল দেখা হয়নি।
গল্পের কথাটা সে কেয়াকে বলেছিল। খাতা, বই, বড়ো বড়ো খাম আর ফাইল ভরা লোহার র্যাকটা দেখিয়ে সে ঠাট্টার সুরে বলে, ‘এর মধ্যে আমার প্রথম সাহিত্যপ্রেমের তাজমহলটি লুকিয়ে আছে।’
চারদিন পর ফাইলটা হাতে নিয়ে কেয়া গভীর স্বরে তাকে বলেছিল, ‘গল্পটাকে বাজে বলেছেন কেন?’
সহদেব অবাক হয়ে বলে, ‘এটা তুমি পেলে কী করে, খোঁজাখুঁজি করে নিশ্চয় বার করে নিয়ে গেছ!’ তার গলায় অনুযোগ ছিল না।
‘হ্যাঁ নিয়ে গেছি, কেন অন্যায় করেছি নাকি?’
‘তা নয়, তবে এত কাঁচা গল্প…’
‘জানেন, পড়তে পড়তে আমার কান্না আসছিল জয়দীপের জন্য।’
কে জয়দীপ! তারপর মনে পড়ে নামটা গল্পের সেই নায়কের যে তাজমহল থেকে যমুনায় ঝাঁপ দিয়ে ব্যর্থ প্রেমের জ্বালা জুড়োয়। কেয়ার আন্তরিক মুখ, গভীর করুণ কণ্ঠস্বরের জন্যই হেসে উঠতে গিয়ে সহদেব হাসতে পারেনি। তার মনে তখন প্রশ্ন উঠেছিল, এই রকম একটা আবেগে ভ্যাদভ্যাদে, হাস্যকর, অবাস্তব প্রেমের কাহিনি যাকে কাঁদাতে পারে, তার মাথার মধ্যে কী রয়েছে?
কেয়া সম্পর্কে এই প্রশ্নটা সহদেবের মনে মাঝে মাঝে উঠলেও উত্তর খোঁজার চেষ্টা কখনো করেনি কেননা, ইতিমধ্যে বহু চুমু খেয়ে এবং শরীরটাকে ধামসে সে কেয়ার প্রতি নৈতিক দায়বদ্ধতায় আটকে গেছে। এবং এখনও তার তাজমহল দেখা হয়ে ওঠেনি।
দুই
অবশেষে সুযোগটা এল।
ফেব্রুয়ারির শেষে দিল্লিতে ‘ভারতীয় পরম্পরায় মৌখিক সাহিত্য’ বিষয়ে সেমিনার। উদ্যোক্তা, সাহিত্য আকাদেমি। সহদেব প্রবন্ধ পড়ার আমন্ত্রণ পেল। প্লেনে বা ট্রেনের প্রথম শ্রেণিতে যাতায়াত ভাড়া এবং ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে দু-দিন থাকা ও খাওয়ার ব্যয় আকাদেমি বহন করবে।
সহদেব ঠিক করল এবার সে তাজমহল দেখবেই। দিল্লি পৌঁছবে মঙ্গলবার সকালে রাজধানী এক্সপ্রেসে, বুধবার সকাল সাড়ে নটায় তার সেমিনার। চারজন প্রবন্ধ পড়বে। ঘণ্টা তিনেক লাগবে পড়ায় ও আলোচনায়। পরের দিন দুপুরে খাওয়া সেরে তাকে সেন্টার ত্যাগ করতে হবে।
সে চিঠি দিল শ্যামলকে। রঙ্গ ভারতীতে কিছুদিন শিক্ষানবিশি করেছিল। দীনেনই ওকে সুপরামর্শ দেয়, ‘সময় আর বয়স নষ্ট না করে, অন্য কিছু দেখ।’ শ্যামল তাই দেখেছে। রাজস্থান থেকে পাথর আনিয়ে, সাইজ মতো কেটে বিক্রি করা। ভারতের নানান জায়গায় খদ্দের। পাথর কাটার কারখানাটা দিল্লির কিনারে। ব্যবসাটার মালিক সে একা নয়, আরও দুজন আছে।
এগারো বছর সে চিত্তরঞ্জন পার্কে ভাড়া বাড়িতে বাস করছে। বিয়ে করেনি। একাই থাকে এবং রেঁধে খায়। শ্যামল কলকাতায় গেলেই সহদেবের সঙ্গে দেখা করে। সহদেবের চিঠি পেয়ে সে উত্তরে জানাল আগ্রায় যাওয়ার জন্য এত আগে থেকে বাসে সিট বুকিং করতে হয় না, যাওয়ার আগের দিনও করা যায়। অনেকগুলো ট্রাভেল এজেন্সির বাস রোজ আগ্রা যায়। ‘সেমিনার শেষ হলে আমি গিয়ে সেন্টার থেকে আপনাকে আনব। দু-চার দিন আমার কাছে থাকবেন।’
মাকে নিয়ে দিল্লি আসার পর এই আবার আসা। কয়েকটা বছর পর রাজধানীকে দেখে কোনো পরিবর্তন সে বুঝতে পারল না। তার কাছে প্রথমবারের মতোই ভালো লাগল। রাস্তাগুলো চওড়া, পরিচ্ছন্ন, মসৃণ, কলকাতার মানুষের কাছে ভালো না লেগে উপায় নেই। চমৎকার বাড়িগুলোও। ভালো মেজাজেই সে ম্যাক্সমূলার মার্গে ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে পৌঁছল। দুপুরে খেয়ে, ঘুমিয়ে, কিছুক্ষণ রাস্তায় হেঁটে ঘরে ফেরামাত্রই শ্যামলের ফোন পেল।
‘সহদেবদা পরশু দুপুরে যাচ্ছি। রেডি থাকবেন।’
‘থাকব। শুধু তো একটা সুটকেস।’
‘খাওয়াদাওয়ার অসুবিধে হচ্ছে না তো?’
‘আরে দারুণ দারুণ খাদ্যদ্রব্য, আমিষ নিরামিষ নানান রকমের ডিশ। মেনু কার্ডে নাম দেখে তো কিছুই বুঝলাম না। এধার-ওধার যারা খাচ্ছিল তাদের প্লেট দেখে একটা পছন্দ করে বললাম, ‘ওইটে এক প্লেট’। লোকটা আমার কথা শুনে কিন্তু মুচকে হাসল না, ওয়েল ট্রেইন্ড!…প্রচুর কাবাব খেয়ে ফেলেছি। পরের পয়সায় খেলে এই হয় মুশকিল।’
‘আমি কিন্তু আপনাকে পাবদামাছের ঝোল খাওয়াব। কলকাতার থেকে এখানে মাছটা ভালো পাওয়া যায়। আর শুনুন, কয়েকটা দিন থাকছেন তো?’
‘ট্রেনের টিকিট কাটা আছে ভাই। শনিবার উঠব, রবিবার হাওড়ায় নামব।’
‘সে কী! দিল্লিটা একটু ঘুরে দেখবেন না!’
‘পরে যদি আসি তখন দেখব…বাড়িতে ভীষণ ঝামেলা চলছে, তাড়াতাড়ি ফেরা দরকার। তাজমহলটা দেখব বলেই একদিন বেশি থাকছি নয় তো শুক্কুরবারই রওনা দিতাম।’
‘আপনার আবার ঝামেলা কী? আমার মতোই তো ব্যাচেলার রয়ে গেছেন।’
‘বিয়ে না করলে বুঝি ঝামেলা থাকে না? ভাই, বোন, প্রতিবেশী, আত্মীয়, বন্ধু, অফিসের কলিগ, এরা তো আছে। মা থাকলে আরও ঝামেলা হত। ব্যাচেলারদের বোঝা তো বিধবা মা! আমার বোন শমিতাকে দেখেছ তো, একতলায় থাকে স্বামী আর একটা পঙ্গু মেয়ে নিয়ে…ঝামেলাটা ওকে নিয়েই। সে সব কথা তোমায় বলা যাবে না, এদিকে দাদারা আসছে ম্যাঞ্চেস্টার থেকে, তবু রক্ষে শ্বশুরবাড়িতে উঠবে। বাড়িতে থাকার মতো ঘর আর কোথায়!’
