দলের পরিচালক ও প্রধান অভিনেতা দীনেন ভটাচাযের অনুরোধেই সে ওদের সঙ্গে দিল্লিতে যায়। অনেকের মতো সেও ঠিক করে তাজমহলটা দেখে আসবে। কিন্তু সেই সময়ই আগ্রায় দাঙ্গা বাধার জন্য যাওয়া হল না। সহদেব অবশ্য তাতে দমল না, দিল্লিতে আবার সে আসবেই, এই রকম একটা প্রত্যয় নিয়ে সে কলকাতায় ফিরে এসেছিল।
দ্বিতীয়বার সে দিল্লি গিয়েছিল মাকে প্লেনে তুলে দিতে। সহদেবের দাদা বলরাম ম্যাঞ্চেস্টারে চোখের ডাক্তারি করে। বউদির দ্বিতীয় বাচ্চচা হবে। তাই মাকে পাঠিয়ে দেওয়া। দাদাদের পরিচিত মিসেস বসাক লন্ডনে ফিরছেন তার সঙ্গেই মা যাবেন। হিথরো এয়ারপোর্ট থেকেই মাকে তুলে নিয়ে দাদা ম্যাঞ্চেস্টার চলে যাবে।
ট্রেনে দিল্লি। স্টেশন থেকে গ্রেটার কৈলাসে মিসেস বসাকের বাড়ি। খুবই যত্ন করলেন তারা। বারো ঘণ্টা পরই, মাঝরাতে দিল্লি থেকে মা উড়ে গেলেন বড়োছেলের সংসার সামলাতে। পরদিন সহদেব ট্রেনে উঠল কলকাতায় ফেরার জন্য। তাজমহল দেখতে যাওয়ার চিন্তাটা মাথায় আনার কোনো সুযোগই সে পায়নি।
তখন বাড়িতে দিনরাতের কাজের এবং রান্নার জন্য প্রৌঢ়া কেশবের মা, ভাই বাসুদেব আর ছোটো বোন শমিতাকে নিয়ে তারা চারজন মাত্র লোক। সহদেবের থেকে দু-বছরের ছোটো অনিতার তখন দুটি মেয়ে, শ্বশুরবাড়ি বেলগাছিয়ায়। শমিতা তখন সদ্য কলেজে ভরতি হয়েছে। বাড়িতে একা অভিভাবকহীন অবস্থায় বোন থাকুক অনিতার সেটা মনঃপূত নয়। ছুটির দিনগুলোয় অসিত গাড়ি নিয়ে আসত শালিকে নিয়ে যেতে।
এই সময়েই সহদেব কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসে আপার ডিভিশন ক্লার্কের চাকরি পায়। আমদানি-রপ্তানির লাইসেন্স পাওয়া ব্যবসায়ী সংস্থাগুলি বিধি-নিয়মমাফিক কাজ করছে কি না তাই দেখার এবং না করলে পাকড়াও করার কাজ তার অফিস করে। চাকরি পাওয়ার চার-পাঁচ মাসের মধ্যে, ‘বড়ো ঢিলে ঢালা’ এবং এক বছরের মধ্যেই ‘কোনো কম্মের নয়’ রূপে প্রতিষ্ঠিত হলেও মধ্যবয়সি নাট্যরসিক মালয়লি উপরওলা তাকে খাতির করে। ইংরেজি খবরের কাগজে নাটক বিষয়ে তখন তার প্রবন্ধ বেরিয়েছে, বাংলার লোকনাট্য সম্পর্কে পড়াশুনায় ব্যস্ত। ব্রিটিশ কাউন্সিলে, আমেরিকান সেন্টারে, নাট্য সম্পর্কিত সেমিনারে তাকে বলার জন্য আমন্ত্রণ করা হয়। তা ছাড়া তার চিরকুট নিয়ে গেলে কলকাতার প্রতিষ্ঠিত নাট্যদলগুলি ‘পাস’ দিতে অসম্মত হয় না। সুতরাং তার টেবলে কিছু লোকের আনাগোনা থাকেই। সহদেবের টেবলের মতো ঢিলেঢালা কাজের টেবল সব সরকারি অফিসেই আছে। হাজিরা এগারোটা বা বারোটায় দিলেও চলে, তিনটা বা চারটায় অফিস থেকে বেরিয়ে গেলে কেউ তা লক্ষ করে না।
এই সময়েই শমিতার বন্ধু কেয়ার সঙ্গে তার পরিচয়। ওরা সমবয়সি, কলেজে একই সেকশনে। মিনিট দুই হেঁটে পাশের পাড়া, ধর লেনে কেয়াদের বাড়ি। ওর দাদা রঞ্জনের সঙ্গে সহদেব স্কুলে পড়েছে, তখন কয়েকবার ওদের বাড়িতে সে গেছেও।
কেয়ার মুখটি সুন্দর। বড়োবড়ো দুটি চোখের চাহনি শান্ত। গৌরবর্ণা, মাঝারি উচ্চচতা। শরীরের ঝোঁকটা স্থূলত্বের দিকে। চিবুকের নীচে একটা হালকা ভাঁজ, ঘাড়ে খোঁপার নীচে চর্বির একটা থাক। স্তনভারে ঊর্ধ্বাঙ্গ ঈষৎ ঝোঁকানো, গুরু নিতম্ব। কথা বলে লাজুক স্বরে, গলাটি মিষ্টি। সে ক্ল্যাসিকাল সংগীত চর্চা করছে কোনো এক গুরুর অধীনে। শমিতা আলাপ করিয়ে দেয়, দু-চারদিন কথা বলার পর তার আড়ষ্টতা ভাঙে এবং সহদেবের মার্জিত আচরণ, উচ্চচারণ সরস কথাবার্তায় সে মুগ্ধ হয়, যুবকটিকে তার ভালো লাগতে শুরু করে।
তখন সহদেবের আঠাশ বছর বয়স। সৌম্যদর্শন এবং স্বাস্থ্যবান। একটি সদ্য যৌবনা, কমনীয়া, লাবণ্যময়ী মেয়ে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে, এটা তার হৃদয়ে অবশ্যই দোলা দেয়। নানানভাবেই কেয়ার জন্য তার অনুরাগ প্রকাশ হতে থাকে। সে নাটক লিখেছে, হোক না বিদেশি নাটক থেকে, সেটা জনপ্রিয় হয়েছিল, সে সেমিনারে ইংরেজিতে আলোচনা করে, খবরের কাগজে ইংরেজিতে লেখে, থিয়েটারের নট-নটীদের সঙ্গে তার আলাপ আছে- এইসব ব্যাপারগুলি কেয়ার কাছে তাকে খুবই শ্রদ্ধার পাত্র করে তোলে। তার সব কিছুই-চীনা দোকানে ওয়েটারকে খাবারের বরাদ্দ দেওয়ার সময় কথা বলার বা চেঁচিয়ে ‘ট্যাক্সি’ ডাকার এবং দাঁড় করাবার জন্য। হাত তোলার বা থিয়েটারহলে চেনা লোকেদের দিকে তাকিয়ে মাথাটা ঈষৎ হেলিয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে কেয়া মুগ্ধ হয়ে পড়ে। এগুলো সে সহদেবকে বলতও। একবার সে বলেছিল, ‘তোমায় অটোগ্রাফ দিতে হয় না?’ ওর সারল্যে সহদেব মাঝে মাঝে বিব্রত হয়ে পড়ত।
ফ্যামিলি প্ল্যানিং নিয়ে একদিন কথা হতে হতে বারবার সন্তান হলে মেয়েদের শরীরের কী ক্ষতি হয়, সেটা বোঝাতে গিয়ে সহদেব বলেছিল, ‘দোষটা আসলে পুরুষদেরই শুধু নয় মেয়েদেরও। ছেলেপুলে তো আর অমনি অমনি হয় না! মেয়েরা তখন আর রিফিউজ করতে পারে না।’ কেয়া মুখ লাল করে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল। শমিতার সামনেই কথা হচ্ছিল। ছোটোবোনের সঙ্গে সে বন্ধুর মতো আচরণ করে। শমিতা ফাজিল প্রকৃতির, সে জানে দাদার সঙ্গে তার বন্ধুর হৃদয় নিয়ে বিনিময়ের একটা খেলা চলছে। উচ্ছ্বাসের প্রথম ধাক্কায় কেয়াই তাকে খবরটা জানিয়ে দিয়েছিল।
