নিজে গিয়ে লোকেশ ডাকল চাঁদুকে। ধবধবে ধুতি-পাঞ্জাবি আর চটি পরে সে তখন তৈরি।
‘বউদি যাবে না। ভীষণ মাথা ধরেছে। আর তুই কালই সকালে নটা-পঞ্চান্নর শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসে বোলপুর রওনা হবি। আজ আমাকে টেলিফোন করে বলেছে, কাল যদি তুই না যাস তা হলে অন্য লোক রাখবে। ছ-শো টাকা মাইনের কাজ জীবনে তুই পাবি?’
‘দাদা আমার কিন্তু এখানেই-‘
‘কাল আটটার মধ্যে রওনা হবি। তারপর আর যেন তোকে এ বাড়িতে না দেখি। জামাকাপড় খুলে ফেল। এককাপ চা করে দে?’
লোকেশ ধীর পায়ে সিঁড়ির দিকে এগোল। ফ্যাল ফ্যাল করে চাঁদু তাকিয়ে। দোতলায় পৌঁছেই সে ফোন বাজার শব্দ পেল। দ্রুত গিয়ে রিসিভার তুলল।
‘হ্যাঁ বলুন, সরলাদি উনি এখন খুব অসুস্থ, মাথায় একটা যন্ত্রণা হচ্ছে বলে…হ্যাঁ, ওহ তপু তুমি!’
‘আপনি কলকাতায় থাকবেন না বলেছিলেন সরলাদি। নইলে আপনাকেও নিমন্ত্রণ করতাম। আজই তো আমার বিয়ে। রেজিস্ট্রি।’
‘কনগ্রাচুলেশনস, খুব ভালো খবর। অবশ্যই বিয়েতে যেতাম। কিন্তু এমনই দুর্ভোগ বাইরেও যেতে পারলাম না তোমার সরলাদির জন্য। যে এক মাথার অসুখ বাধিয়েছে।’
সরলাদি সাক্ষী থাকবেন বলেছিলেন, তাই ওকে আবার মনে করিয়ে দিতে ফোন করছি। অবশ্য সাক্ষী হবার মতো লোক আছে, তবু আমার নিজের দিকের কেউ থাকলে খুব ভালো লাগত। আচ্ছা রাখছি, আমি যাব একদিন।’
‘নিশ্চয় আসবে।’
ফোন রেখে লোকেশ ফিরে তাকাল। সরলা একইভাবে খাটে পড়ে রয়েছে।
বারান্দায় সরলা দাঁড়িয়ে। এখন কলে জল আসার সময়, দুটি ঝি কাজে যাচ্ছে। সরলা চেঁচিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ গো আমাদের বাড়ি কাজ করবে?…দাঁড়াও না, কাজ করবে? শোনই না, কথা কানে নাও না কেন বল তো?’
ঝি দুজন দাঁড়াল না। শুধু একজন অপর জনকে বলল, ‘বউটার মাথা খারাপ, ছ-মাসে পাঁচটা বাসনমাজার লোক কাজ করেছে। এ বাড়িতে লোক টেকে না।’
সহদেবের তাজমহল
এক
এখনও পর্যন্ত সহদেব তাজমহল দেখেনি।
কিন্তু বছর বাইশ আগে সে একটা বড়ো গল্প লিখেছিল, যাতে তার নায়ক নায়িকার মধ্যে প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল তাজমহলের চত্বরে। তখন তার বয়স প্রায় কুড়ি। প্রি. ইউ. থেকে বিএ ক্লাসে বসছে।
কলেজের ম্যাগাজিনে দেবার জন্য গল্পটা লিখেছিল। যথেষ্ট বড়ো হয়ে যাওয়ায় ওরা নিতে রাজি হয়নি। ছাত্র সম্পাদক বলেছিল, একটা লেখাই যদি অর্ধেক ম্যাগাজিন খেয়ে নেয় তাহলে অনেকের লেখা বাতিল করতে হবে। তারা তখন তাকেই খেয়ে ফেলবে।
সহদেব অতঃপর গল্পটি মাসিক ‘সাহিত্য ভারতী’ পত্রিকায় দিয়ে এসে প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর খবর নিতে শুরু করে। তিনমাস পর প্রবীণ সম্পাদক তাকে নিজের কামরায় বসিয়ে কোনো ভণিতা না করে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনি তাজমহল দেখেছেন?’
‘না।’
‘ছবিতে দেখেছেন।’
‘হ্যাঁ।’
‘কেমন ছবি সেটা?’
‘ক্যালেন্ডারে, স্কুলের ইতিহাস বইয়ে আর-‘ সহদেবের গল্প ছাপবার বাসনা তখন মিইয়ে আসছে।
‘রবীন্দ্রনাথের ‘শাজাহান’ পড়েছেন।’
‘হ্যাঁ।’
‘আর?’
‘শচীনদেব বর্মনের গানটা, প্রেমের সমাধি তীরে, নেমে এল ওই-‘
সম্পাদক হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আগে তাজমহলটা দেখে আসুন। যমুনা নদীতে কতটা জল, তাজমহল থেকে তাতে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে ডুবে মরা যায় কিনা…লিখেছেন, আগ্রা ফোর্ট থেকে শাজাহান যে স্ফটিকের মধ্যে তাজমহল দেখত সেটা দিয়ে আপনার নায়ক তাজমহল দেখল…এগুলো স্বচক্ষে একবার দেখে আসুন।’
পাণ্ডুলিপিটি এগিয়ে দিয়ে অবশেষে তিনি ভয়ংকর বাক্যটি উচ্চচারণ করেন: ‘আপনার লেখার হাত ভালো, লেখা ছাড়বেন না।’
সহদেব তখনই প্রায় প্রতিজ্ঞা করেছিল, অচিরেই সে তাজমহল দেখে আসবে, লেখাটা আবার লিখে এই সম্পাদককেই দেবে এবং দেখবে, অবশ্যই সম্পাদকের সাহিত্য বোধ যদি থাকে, তাহলে না ছাপিয়ে আবার ফেরত দিতে পারে কি না!
পাণ্ডুলিপিটি একটা ফ্ল্যাট ফাইলে ভরে সে তাকে তুলে রেখে দিয়েছিল। বছর দুয়েক পরই পত্রিকাটি পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলে এবং বাইশ বছর পর সে তাজমহল প্রথমবার দেখতে যাওয়ার জন্য টুরিস্ট বাসের টিকিট কাটল দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কের বাজারে সাইনবোর্ড, টেলিফোন আর টেবল নিয়ে বসা একটা লোকের কাছ থেকে।
তবে একটা ব্যাপারে সে নিজেকে কিছুটা এগিয়ে রেখেছিল, যদিও সাহিত্য সৃষ্টির কাজে তার কোনো দরকার হবে বলে সে মনে করে না। এম এ পড়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে আর্কেওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার এক সাহেবের লেখা একটা পুরোনো বই পেয়ে সেটা উলটে পালটে দেখেছিল। আগ্রা ফোর্ট, তাজমহল, ফতেপুর সিক্রি ইত্যাদি মুঘল আমলে তৈরি অট্টালিকাগুলোর গড়ন ও সৌন্দর্য সম্পর্কে স্থাপত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বইটি লেখা। বইয়ের ছবি আর স্কেচগুলো দেখে, সম্পাদকের উপদেশ, ‘স্বচক্ষে একবার দেখে আসুন,’ তার মনে পড়ে এবং কানদুটি গরম হয়ে ওঠে।
সে তখন আবার প্রতিজ্ঞা করে, তাজমহল দেখতে আগ্রায় যেতে হবেই। এর দু-বছর পরই দুর্গাপূজায় নাটক করার জন্য ‘রঙ্গ ভারতী’ দলের সঙ্গে সে দিল্লি যায়। সহদেব অভিনেতা নয়। সার্ত্রের যে নাটকটি রঙ্গ ভারতীয় প্রযোজনায় মঞ্চস্থ হয়ে থাকে, সেটিকে ইংরেজি থেকে বাংলায়, হুবহু অনুবাদ নয়, বঙ্গীয়করণ তারই করা। সহদেব ফরাসি ভাষাটা জানে না। নাটকটি জনপ্রিয় হয়।
