‘সরলাদি জামাইবাবুকে বলব?’ তপু আগ্রহ নিয়ে বলেছিল।
‘বলে লাভ নেই।’ সরলা অম্লানবদনে মিথ্যা কথা বলে। ‘দশ তারিখে উনি ভুবনেশ্বর যাবেন তারপর আরও কতকগুলো জায়গায়। আমি একাই যাব।’
‘ঠিক সাতটায়। তুমি কিন্তু একজন উইটনেস। লোকজন বেশি হবে না, জনা দশেক বড়োজোর।’
‘ভাবিসনি, যাব বলেছি যাব।’
ফার্নিচারের দোকানে যাবার তাড়া তাই ওরা আধ ঘণ্টার বেশি থাকেনি। চাঁদু চা-এর কথা বলেছিল ওরা খায়নি। যেমন হুড়মুড়িয়ে আসা তেমনিভাবেই যাওয়া। সরলা আলমারির লকার থেকে গহনার বাক্স বার করে তার তিনটি আংটির থেকে একটি বেছে নিয়ে আঙুলে পরল। তপুকে বিয়ের পর এটা সে দেবে।
অফিস থেকে ফিরে জুতো খুলতে খুলতে লোকেশ বলল, ‘একজনের কথা বলল আমাদের বেয়ারা। মুর্শিদাবাদে ওদেরই গ্রামের মেয়ে, স্বামী নিরুদ্দেশ। নিউ আলিপুরে এক উকিলের বাড়িতে বছর দুই কাজ করছে। শ-খানেক পায়। তেরোটা লোকের সংসারে সব কাজই করছে। স্বভাবটভাব ভালো। আমি বলেছি আমরা মাত্র তিনজন, দেড়শো দোব, নিয়ে এসো তাড়াতাড়ি। দেরি করলে ওদিকে বোলপুরটাও শেষকালে হাতছাড়া হয়ে যাবে। বলেছে তো কাল পরশু যাবে।’
সরলা চুপ করে শুনে গেল। কথা বলতে বলতে লোকেশ মুখ তুলে তাকাচ্ছিল। লক্ষ করছিল তার কথা শুনে সরলার প্রতিক্রিয়াটা কেমন হয়। কিছুই হতে না দেখে সে বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তোমার কি পছন্দ হচ্ছে না?’
‘কেন হবে না।’
লোকেশ যখন খেতে বসেছে সরলা তখন বলল, ‘তপু এসেছিল। ওর বিয়ে।’
খাওয়া থামিয়ে লোকেশ তাকিয়ে রইল। ‘কী বললে?’
‘তপু বিয়ে করছে। আগে যে ব্রাঞ্চে কাজ করত সেখানকার একটি ছেলেকে।’
‘কবে?’
‘এই তো এগারোই। বেলাঘাটায় ওদের এক বন্ধুর বাড়িতে, সন্ধ্যে সাতটায়। আমি উইটনেস হব।’
‘তুমি! এই বিয়েতে?’
‘কেন, কি হয়েছে যদি সাক্ষী থাকি?’
‘না।’
‘কেন?’
‘কৈফিয়ত দিতে পারব না। একটা পুরুষকে ভোগ করে তৃপ্তি হয়নি, এখন আর একটা।’ কথাটা বলে লোকেশ দরজার বাইরে তাকাল।
ছলাৎ করে সরলার মাথায় রক্ত উঠে এল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘এ কথা বলার মানে? আমি জানি কাকে উদ্দেশ্য করে এ কথা বললে।’
‘জান তো ভালোই।’
‘তোমার মন অত্যন্ত নোংরা। আজ নয়, বিয়ের পর থেকেই দেখেছি তুমি আমাকে সন্দেহ কর। কেন?’
লোকেশ মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘সন্দেহ করি না, ভয় পাই। তোমার ওই শরীরটাকে খুব ধারালো লাগে।’
‘বাজে ন্যাকামো রাখ। ষোলো আনা সুখ কোনোদিনই তুমি আমায় পেতে দাওনি। বরাবরই তুমি চাঁদু আর আমাকে নিয়ে নোংরা চিন্তা করছে।’
লোকেশ ছিলেছেঁড়া ধনুকের মতো ছিটকে উঠল। ‘মুখ সামলে। আর একটা কথা বলেছ কী-‘ -লোকেশ নিজেকে সামলে নিল।
‘কী করবে তুমি, মারবে?’
লোকেশ টেবল থেকে উঠে গেল এবং কিছুক্ষণ পর নেমে গেল একতলার বাসার ঘরে। তিনটে দিন ওরা নেহাত দরকারি কথা ছাড়া পরস্পরের সঙ্গে কথাই বলল না। সরলা রাত্রে বিটুর ঘরে শুয়েছে। বিটু এখন বন্ধুদের সঙ্গে দার্জিলিং বেড়াতে গেছে।
এগারো তারিখে তপুর বিয়ের দিন, লোকেশ যখন অফিসে বেরোচ্ছে সরলা তাকে বলল, ‘আজ তপুর বিয়ে, আমি যাব।’
লোকেশ একবার ওর মুখের দিকে তাকিয়েই বেরিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু পরের কথাটা শুনে থমকে গেল।
‘চাঁদুকে সঙ্গে নিয়ে যাব।’
উপেক্ষা, ঔদ্ধত্য, অস্বীকৃতি সরলার সর্বাঙ্গে। থুতনি তুলে সে লোকেশের দিকে তাকিয়ে। জ্বলজ্বল করছে চোখ।
চোয়ালটা একবার শান্ত করে লোকেশ মুখ দিয়ে শব্দ বার করল। যে শব্দে কোনো অর্থ নেই।
লোকেশ অফিস থেকে ফিরল অসময়েই। তখন বিকেল পাঁচটা। সরলা এই নিয়ে কোনো প্রশ্ন করল না কৌতূহল দেখাল না। সে যেন জানতই লোকেশ তাড়াতাড়ি ফিরবে তার যাওয়া বন্ধ করতে। সে গা ধুয়ে মুখে প্রসাধনী দিল। সযত্নে লিপস্টিক মাখল ঠোঁটে। চুল বাঁধল। তারপর আলমারি থেকে একটা বেগুনি কাঞ্জিভরম বার করল। বিছানায় চিৎ হয়ে কপালে দু-বাহু রেখে লোকেশ দেখে যাচ্ছে। তার সামনেই সরলা শাড়ি বদলাল। হাত ব্যাগটা খুলে ভিতরটা দেখল। ঘড়ি পড়ল। আংটিটা খুলে ব্যাগে রেখে আবার কী ভেবে আঙুলে পরল। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় গিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘চাঁদু তোর হল, ছ-টা বাজতে যাচ্ছে।’
নীচ থেকে চাঁদু কী একটা বলল।
‘তাড়াতাড়ি কর। ট্যাক্সি ধরাও তো এক ঝকমারির ব্যাপার।’
ঘরে ফিরে এসেই দেখল লোকেশ উঠে বসেছে। চোখে কর্কশ চাহনি।
‘তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি।’
সরলা জবাব না দিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখতে লাগল।
‘এখনও বলছি তোমার যাওয়া হবে না।’
‘কেন হবে না?’
‘আমার পছন্দ নয়।’ লোকেশ খাট থেকে নেমে দরজা বন্ধ করে ছিটকিনি তুলে নিল।
‘একি! তুমি আমায় ঘরে আটকে রাখবে নাকি?’
লোকেশের পাশ দিয়ে সরলা দরজা খোলার জন্য যেতে গিয়ে বাধা পেল। সে ধাক্কা দিল লোকেশকে। ‘কী ছেলেমানুষি-।’
মুঠোয় সরলার চুল ধরে টেনে এনে এনে তাকে খাটের উপর প্রায় ছুড়ে দিল লোকেশ।
‘এ ঘর থেকে এক পা বেরিয়েছ কি তোমায় মোক্ষম শাস্তি দেব। এ বাড়িতে আর তা হলে তুমি ঢুকতে পারবে না। তোমার ছেলেকে বলব, তোর মা চাকরের সঙ্গে দুপুরে প্রেম করত। একসঙ্গে ওদের আমি বিছানায় শুতে দেখেছি। ধরা পরে গিয়ে ভয়ে দুজনেই পালিয়েছে। পাড়ার লোকেদের, তোমার বাপের বাড়ির লোকেদেরও তাই বলব।’ লোকেশ ধীর পায়ে গিয়ে ছিটকিনিটা নামাল। দরজা খুলে বেরিয়ে যাবার আগে পিছন ফিরে তাকাল। সরলা বিস্ফারিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে। দৃষ্টিতে কোনো অর্থ নেই।
