‘এখন কিছুক্ষণ শুয়ে থাকুন।’
মা চলে গেল রান্নাঘরে। তখন ভাবতে লাগলুম পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে বাবাকে অপমান করব। স্কলারশিপের টাকায় পড়ব। ভাবতে ভাবতে ঘুম এসে যাচ্ছিল। শুনতে পেলুম মা চাপা ধমক দিচ্ছে, কচি ছেলেকে ওইভাবে মারে? দু-একদিন যদি স্কুল কামাই করে খেলতেই যায়, তাতে কী এমন সব্বোনাশ হয় যে চোরের মার মারবে?
ওর ভালোর জন্যই মেরেছি।
মরে গেলে তখন ভালো করা যে ঘুচে যেত।
ওর খেলা আমি ঘোচাব। কালই মল্লিকমশাইকে গিয়ে বলছি, আপনার বাগানে ছেলেদের খেলা বন্ধ করে দিন।
কাত হয়ে চোখ বুজে ভাবতে ভাবতে তারকের হাসি পেল। গগন বসুমল্লিকের সামনে দাঁড়াবার কোনো যোগ্যতাই ছিল না বঙ্কুবিহারী সিংহের। তার ছেলেরও ছিল না। গোপাল বলেছিল, জাতে না মিলল তো কী হয়েছে, আসলে দেখতে হয় চরিত্র। তুই কি খারাপ ছেলে? রাজি থাকিস তো মাকে বলি।
‘এইবার উঠুন।’
তারক উঠে বসল। একটা টাকা দিল যুবকটিকে।
‘আপনি কি রোজ নেবেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘ক-টা নেবেন?’
‘সাতদিন, দুবেলা করে।’
‘সকালে ন-টায় ডাক্তারখানা খোলে।’
‘কিন্তু অত দেরি করলে তো আমার চলবে না। ন-টায় অফিস বেরোই।’ তারক ঘড়ি দেখল। ন-টা বেজে দশ। কাল সকাল নটা-দশে বারো ঘণ্টা পূর্ণ হবে।
‘ঠিকানা দিন ন-টার মধ্যেই বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসব।’
আঁতকে উঠল তারক। বাড়িতে বঙ্কুবিহারীর সামনে ইঞ্জেকশন!
‘সকালে একজনের কাছে নিচ্ছি। রাতে তার অসুবিধা বলেই আপনার কাছে এলুম।’ এই মিথ্যেকথাটুকু বলবার জন্য তারক দুঃখবোধ করল।
একটি টাকা হাতছাড়া হওয়ায় যুবকটি ক্ষুণ্ণ হল। পেনিসিলিনের খালি শিশিটা দেখে তারকের মনে হল অমুর খেলনা হতে পারে এটা। কিন্তু ওর মা বা দাদু যদি জানতে চায় কী করে এটি সে পেল?
বাইরে এসে তারক প্রফুল্ল বোধ করতে লাগল। দশ পয়সার একটা সিগারেট কিনে, ধরিয়ে, ট্রাম বাস মানুষ ইত্যাদি দেখতে দেখতে তার মনে হল, রেণুকে এখন না আনাই ভালো। তিন মাস স্বামীসঙ্গ না পেয়ে ও নিশ্চয়ই কাতর। কিন্তু এলেও সাতদিন সবুর করতেই হবে। তাকি ওর পক্ষে সম্ভব? আসার সময় একটা চুমু দিয়েছিলাম, দিন পঁচিশ হয়ে গেল, তখন শরীরটাকে দুমড়ে বেঁকিয়ে দিচ্ছিল। পাউডারের গন্ধর সঙ্গে ব্লাউজ থেকে বাসি দুধের টকটক গন্ধও পেয়েছিলাম। সাতদিন ঠেকিয়ে রাখার জন্য ভালোমতো অজুহাত চাই। তারক খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ল।
রাত্রে ঘুম এল না। রেণুকে সাতদিন পর আনলেই হবে কিন্তু কাল সকালেই দ্বিতীয় ইঞ্জেকশন কোথায় নেবে, এই ভাবনা তারককে পেয়ে বসল। ক্রমশ সে বিরক্ত এবং অসহায় বোধ করতে লাগল। এরপরও আছে প্রণবের কাছে গিয়ে অনীতাকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করা। ওকে রাজি করাতে হবে। সেজন্য বোঝাতে হবে এ ঘটনার জন্য সমাজই দায়ী, নয়তো গতরই নাড়াবে না। কিন্তু কোন কথাগুলো বললে প্রণব পটবে তারক কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না! এইসব ঝুটঝামেলা আমার ঘাড়েই বা চাপে কেন?
তারক অক্ষম রাগে নিজেকেই দায়ী করতে থাকল। দয়া মায়া মমতা-যেকটা ছেঁদা আছে সব বন্ধ করে দেব, দেখি কোনখান দিয়ে ঝামেলাগুলো ঢোকে। ইন্টারভিউ পাইয়ে দাও, পেট খসিয়ে দাও, খালি আবদার আর আবদার। ভেবেছে কী আমায়, বেগার খাটার লোক! শুধু ফিল্ডিং দেবার জন্যই ডাকবে?
পায়ের ডিম আর উরুর পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠল তারকের। মাথার মধ্যে ঝনঝনানি শুনতে পাচ্ছে। ভেবেছে কী, ভেবেছে কী মনে মনে সে আউড়ে চলল। বালিশটাকে পাঁচ আঙুলে চেপে ধরে সে ভাবল এইবার উপড়ে নেব ওর ড্যাবড্যাবে চোখ। শুধু দুটো খোঁদল দগদগ করবে। অন্ধ হয়ে হাতড়ে হাতড়ে চলবে। ছেলেদের মতো রুগণ হাত দেখলে মায়া হয়। ও দুটো ছিঁড়ে নেব, শিরদাঁড়াটা পিঠ থেকে টান দিয়ে ছাড়িয়ে নেব-ভেবেছে কী, বেগার খাটার লোক? নেভাবার জন্য জ্বলন্ত সিগারেট ঘষবে আমার গায়ে?
দয়া-মায়া-মমতা থেকে রেহাই পাবার জন্য তারক হিংস্রভাবে বালিশটাকে তলপেটের নীচে চেপে অনুভব করল, সকালে ট্রামে যেভাবে চুলের গন্ধে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এসেছিল, সেইরকম শ্বাসরোধকারী উত্তেজনা। স্ত্রীলোকটিকে কল্পনায় প্রত্যক্ষ করতে গিয়ে দেখল, তেল চিটচিটে ব্রেশিয়ারের স্ট্র্যাপ। তারপরই দেখতে পেল, শিরদাঁড়ার একটা ফুলে ওঠা গ্রন্থি। তখন প্রাণপণে সে, গৌরীকে আঁকড়ে ধরতে গেল। দেড়শো বছরের বাড়ির অন্ধকার সিঁড়ির খিলেনের তলা দিয়ে গৌরী ছুটে উপরে উঠে গেল। কাতরস্বরে তারক বারকয়েক, গৌরী, গৌরী, বলে ডেকে ধীরে ধীরে এলিয়ে পড়ল বালিশে।
কিছুক্ষণ পর তারক উঠল। জলখেয়ে, জানালার ধারে দাঁড়িয়ে, পুরো একটি সিগারেট শেষ করতে করতে নিজেকে আর বেগারখাটার লোক বলে মনে করতে পারল না। সলিলের মতোই প্রায় শ্যামল গাঙ্গুলির পায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল রবি বোস।-‘ইনিংস ডিফিট খাব? শ্যামল তুই থাকতে বাংলার এ অপমান দেখতে হবে?’ শ্যামল ছিল বাংলা দলে অটোমেটিক চয়েস। সেদিন সাতাত্তর রান করে শ্যামল ইনিংস ডিফিট থেকে বাংলাকে বাঁচায়।
এখন তারকের মনে হচ্ছে সে যেন শ্যামল গাঙ্গুলি। সলিল গুহ আর রবি বোস একই লোক। বাঁচাবার আবেদন দু-জনেরই হাতে। টুয়েলফথ ম্যানের কাছে কি কেউ করুণার পাত্র হয়ে আসে? তারক নিজের মনে হাসল এবং নিজেকে শুনিয়ে বলল-টি. সিনহা তাহলে বাপু সাতাত্তরটি রান করে এবার তোমার এলেম দেখাতে হবে।
পাঁচ
‘তোর বোন?’
