একটু পরেই লোকেশ ঘরে এল ডায়েরি আর কলমটা যথাস্থানে রাখার জন্য। সরলাকে বসে থাকতে দেখে বলল, ‘মাথা এখনও ধরে আছে নাকি?’
‘কী লিখে রাখলে?’ সরলা ধীরস্বরে বলল।
‘চাঁদুর দেশের ঠিকানাটা। তিনকপি পাসপোর্ট ফোটোও কাল দোকানে গিয়ে তোলাতে বলেছি, থানায় দিয়ে রাখতে হবে।’ লোকেশ ব্যস্তজরুরি ভাবে কথাগুলো বলেই স্নান করতে গেল। সে শুনতে পেল না সরলার কথাগুলো-‘ওযে ছোটোবেলা থেকে আমাদের বাড়িতে রয়েছে!’
পরের দিন সরলা দত্ত খুন সম্পর্কে আরও খবর দিল ওই বাংলা কাগজটি।
রঞ্জনাই সরলাকে ডেকে পড়তে দিল। দেবার আগে বলল, ‘আমার যা মনে হয়েছিল সেটাই লিখেছে।’
সন্দেহ : ভৃত্যের সঙ্গে প্রণয়ে লিপ্ত ছিলেন গৃহবধু
হেডিংটা দেখেই সরলা পাথর হয়ে গেল। যখন সাড় ফিরে এল, তার মাথায় বিদ্যুৎ ঝিলিকের মতো তীক্ষ্ন একটা যন্ত্রণা খোঁচা দিতে শুরু করল। দৃষ্টি ঝাপসা হয়েই আবার ফিরে আসছে। রেলিং দু-হাতে আঁকড়ে সে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখল।
‘কী হল তোর? এই সরলা, অমন করছিস কেন?’ রঞ্জনা ভীত ব্যাকুল স্বরে চেঁচিয়ে উঠল। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে একটি লোক মুখ তুলে তাকাল।
সরলা ফিকে হাসল। ‘কিছু হয়নি। যেভাবে লিখেছে প্রথম লাইনটা- ‘পুলিশের সন্দেহ, মৃত্য ও ধর্ষিতা ঘরের বউ সরলা দত্ত ও তাদের গৃহভৃত্যের মধ্যে অবৈধ প্রণয় সম্পর্ক ছিল,’ পড়েই শরীরটা কীরকম গুলিয়ে উঠেছিল। আর পড়ার ইচ্ছে নেই আমার।’ হাত বাড়িয়ে সে কাগজটা ফিরিয়ে দিল রঞ্জনাকে।
‘তা তো হবেই, নিজের নামে ওইরকম একটা নোংরা খবর দেখলে……… আমার নামে বেরোলে আমারও গা গুলিয়ে উঠত। তুই তো ভেতরের লেখা আর পড়লি না। পুলিশের সন্দেহটা কেন হয়েছে জানিস, ওর স্বামীই বলেছে, অনেকবার চাকরটাকে ছাড়িয়ে দিতে চেয়েছিল কিন্তু বউ ভীষণ আপত্তি করে নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে দিত।
একদিন কোনো এক মন্ত্রী মারা যাওয়ায় অফিস হাফ ছুটি হয়ে যায়। ভদ্রলোক বাড়ি চলে এসে দেখেন বউ বিছানায় শুয়ে আর চাকরটা মাথা টিপে দিচ্ছে, ভদ্রলোক চাকরটাকে চড় মারেন, বউকে ধমকান। তাইতে চাকরটা চোটপাট করে ওর সঙ্গে কথা বলে, খুন করবে বলেও ভয় দেখায়। তক্ষুনি উনি চাকরটাকে বিদায় করে দেন। তাইতে বউ নাকি গলায় দড়ি দিতে গেছল, ছেলে দেখতে পেয়ে মাকে ধরে থামায়। কী ঘেন্নার কথা! বোঝ এত কাণ্ড তলায় তলায় হয়েছে! অথচ কাল প্রতিবেশীরা কত গুণগানই না করল রিপোর্টারের কাছে। অবশ্য তাদেরই বা কি দোষ, বাইরে থেকে যেমন যেমন দেখেছে সেই মতোই বলেছে। আমার ঘরে কী হয় না হয় তুই কী তা বলতে পারবি?’
সরলা চুপ করে শুনে গেল। বলার মতো কথা তার নেই। তার মনে হচ্ছে আজ দুপুরেও লোকেশ অফিস থেকে ফোন করবে। জিজ্ঞাসা করবে, চাঁদু কী করছে।
তার অনুমান মতো সত্যিই লোকেশের ফোন এল।
‘আজও মাথাটা ধরেছে নাকি?’
‘না,’ তারপরই সরলা বলল, ‘কী ব্যাপার তুমি দুপুরে ফোন করছ যে? কাল করলে আবার আজও।’
‘এমনিই, কেন করা নিষেধ নাকি? আঠারো বছর বিয়ে হয়েই কি প্রেমট্রেম শুকিয়ে যাবে?’
‘প্রেমালাপ করার জন্য দুপুরে অফিস থেকে ফোন!’
‘দুপুরই তো প্রেমের সময়।’
‘গৃহবধূকে খুনেরও সময়।’ কথাটা মনের অগোচরেই সরলার মুখ থেকে বেরিয়ে এল। ওধার থেকে সঙ্গে সঙ্গে জবাব এল না।
দুজনেই ফোন কানে ধরে চুপ। অবশেষে নীরবতা ভাঙল লোকেশ। ‘পরে তোমার সঙ্গে কথা বলব।’ সে ফোন রেখে দিল।
বিকেলে ফোন বেজে উঠতে সরলা ধরল।
‘হ্যালো কে বলছেন?’ এক মহিলার গলা।
সরলার মনে হল চেনা চেনা, ‘আপনি কে বলছেন? আমি সরলা দত্তকে চাই, আমার নাম মালবিকা।’
‘মলি! হতচ্ছাড়ি, মুখপুড়ি, এত কাল কোথায় ছিলিস?’ সরলা উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করল। ‘কোথা থেকে ফোন করছিস? এত বছর হল একটা চিঠিও দিসনি। বাপের বাড়ি আসিস আর আমার সঙ্গে একবারটি দেখা করিস না। তুই তো ইম্ফলে ছিলিস এখন কোথায়? বর, ছেলে মেয়ে কেমন আছে?’
‘দাঁড়া দাঁড়া বাপু দাঁড়া। তুই তো কোশ্চেনের লিস্ট ধরিয়ে দিলি। একে একে, আমি এখনও ইম্ফলেই, সেখান থেকেই ফোন করছি। কর্তার অফিস থেকে অতএব পয়সা লাগবে না। টেলিফোনের বড়োসাহেব হওয়ার এই এক সুবিধে। আমরা সবাই খুব ভালো আছি। চার নম্বর এখন আমার পেটে যন্ত্রস্থ, আর দু-মাস পরেই প্রকাশিত হবে।
‘হ্যাঁ, তোমাকে ভালোবাসি।’
লোকেশ নীরব রইল। সরলা জিজ্ঞাসা করল, ‘আর কিছু জানতে চাও?’
‘চাঁদুকে ছাড়িয়ে দেব, তুমি কিন্তু না বোল না।’
সরলার মনে হল তার আসল খুঁটিটা হেলে গেছে। এখন তার সোজা হয়ে দাঁড়াবার কোনো অবলম্বন আর নেই। লোকেশের শেষ কথাটা, ‘তুমি কিন্তু না বোল না’-র মধ্য দিয়ে জানা হয়ে গেল ওর মনের মধ্যে তার সম্পর্কে কী বিপজ্জনক ধারণা তৈরি হয়ে রয়েছে।
‘বোলপুরে আমাদের এক ডিলারের দোকানে ওর ব্যবস্থা করে দেব। এখানের থেকে বেশি মাইনে পাবে।’
সরলা মনে মনে বীভৎস একটা চিৎকার করল। একটা প্রচণ্ড লাথি মনে মনে কষাল, একদলা থুতু মনে মনে ছুড়ে দিল এবং মনে মনে বলল, ঘেন্না করি, ঘেন্না করি-সবই লোকেশের উদ্দেশ্যে।
সন্ধ্যায় তপু এসেছিল সঙ্গে সোমনাথ। যে ফ্ল্যাটটা ওরা দেখতে গেছল সেটাই ভাড়া নিচ্ছে। এবার ওরা বিয়ে করবে এই মাসেরই এগারো তারিখে, আর মাত্র চারদিন বাকি। রেজেস্ট্রি হবে ওদেরই এক বন্ধুর বাড়িতে, বেলেঘাটায়। সোমনাথ কাগজে নকশা এঁকে বুঝিয়ে দিয়েছে, কত নম্বর বাসে কোথায় নামতে হবে বা ট্যাক্সিতে কত ভাড়া পড়বে।
