‘রাত্রে লালবাজারে পুলিশের এক মুখপাত্র বললেন, গহনা বা টাকা চুরি না হওয়ায় এবং ধর্ষণের আগে খুন করায় মনে হয় আততায়ী মানসিক বিকারগ্রস্ত। বলাইকে ধরার জন্য জোর তল্লাশ শুরু হয়েছে। কলকাতা থেকে গোয়েন্দা দল আজই মেদিনীপুর রওনা হয়েছে।’
সরলা খুঁটিয়ে আর একবার পড়ল। বারান্দা থেকে রঞ্জনার ডাক শুনতে পেল। কাগজটা হাতে নিয়েই রঞ্জনা বলল, ‘পড়লি?’
‘হ্যাঁ। এরকম খুন তো প্রায়ই হয়, এই নিয়ে অবাক হবার কি আছে?’ সরলা স্বাভাবিক থাকার মতো ভাব গলায় আনল।
‘বলছিস কি! অবাক হব না? পুলিশ কী বলেছে সেটা পড়িসনি? লোকটার মানসিক বিকার ঘটেছিল নাহলে খুন করে তারপর একটা মরাকে এই জিনিস করতে পারে? অথচ লোকটা নম্র, মার্জিত, এই বলে স্বামীই তো সার্টিফিকেট দিয়েছে। সত্যিই বাবা, মানুষের বাইরেটা দেখে কিছু বোঝা যায় না। অত বছরের পুরোনো চাকর আর তার মনের মধ্যে কিনা এই ছিল!…এটাকে তুই হালকাভাবে নিতে পারিস, আমি পারব না।’
‘আমি হালকাভাবে নিচ্ছি কে বলল? আমি বলেছি অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার এটা নয়। রেপ তো হরদমই হয়, এটাও তাই। এক্ষেত্রে সরলা দত্ত হয়তো এমন বাধা দিয়েছিল যে শেষপর্যন্ত তাকে খুন করে তবেই রেপ করা সম্ভব হয়েছে।’
‘হ্যাঁ, সেটাই হওয়া সম্ভব, বাধা তো দিয়েছেই। কিন্তু ওই বলাই চাকরটার কথা ভাব। বাড়ির লোকের মতো ব্যবহার পেয়েছে, ছ-বছর থেকেছে আর কিনা… উনি বলেছেন খোঁজ নিয়ে বার করবেন বাড়িটা কোথায়, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে একজন ঠিকই বেরিয়ে পড়বে। যাই শাশুড়ি এবার চেঁচাতে শুরু করবে।’
বিকেলে বিটু স্কুল থেকে ফিরল গম্ভীর মুখে। অন্যান্য দিনের মতো প্রথমেই খাবার টেবিলে গিয়ে বসল না। নিজের ঘরে খাটে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল।
উদবিগ্ন হয়েই সরলা ছেলের কপালে তালু রেখে তাপ দেখল। কলকাতায় কখন যে কি অসুখ তৈরি হয় তার ঠিক আছে? আশ্বস্ত হল তার স্বাভাবিক অনুভব করে।
‘শুয়ে পড়লি যে, খাবি না?’
‘আজ কাগজে একটা খবর বেরিয়েছে।’ বিটু শান্ত স্বাভাবিক গলায় বলল।
সরলার বুক ধক করে উঠল। ছেলের চোখে সে রাগ বা ক্ষোভ দেখল না, কেমন যেন আহত দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে।
‘হ্যাঁ, পড়েছি।’
‘কী বিশ্রি, ভালগার স্টাইলে যে লেখে! পরনে শুধু মাত্র সায়া, এটা কি খুব গুরুত্বপূর্ণ? বলতেই হবে?’ বিটুর স্বর তিক্ত। সে উঠে বসল। ‘এই নিয়ে বাপ্পা আর রাজেশের সঙ্গে আমার একচোট হয়ে গেল। ওরা বলছে রিপোর্টে এটা না জানালে, রিডাররা ক্রাইমের গুরুত্বটা বুঝবে না, ইমপ্যাক্টটা জোরালো হবে, না, এটা সেক্সকে সুড়সুড়ি দেওয়ার জন্য নয়…ব্লাডি শিট!’ বিটুর চোখ দুটো বড়ো হয়ে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
‘এই সব জিনিস নিয়ে তোরা তর্ক করিস কেন?’ সরলা মৃদু ধমক দিল।
‘কাগজে লিখলে বহুলোক পড়ে, তাই নিয়ে আলোচনা, তর্ক হতেই পারে। কিন্তু ওরা ব্যাপারটাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে গেল…আমাদের বাড়িতে ক্লাসের অনেক ছেলেই তো এসেছে, তোমাকে, চাঁদুদাকে দেখেছে।’ বিটু হঠাৎ থেমে গেল। সরলার ধুকপুকুনি গলায় এসে আটকে গেল। বিটু ইতস্তত করে বলল, ‘যত মাথাব্যাথা ওদেরই।’
‘কী জন্য?’
‘এই দুপুরে তুমি বাড়িতে একা থাকো।’ বিটু খাট থেকে দ্রুত নেমে কলঘরে চলে গেল। সরলা মনে মনে ভগবানকে ডাকল। শেষকালে ছেলের বন্ধুরাও কিনা সায়া পরা সরলা দত্তর দিকে উঁকি মারছে! কি লজ্জার!
লোকেশ অন্যদিনের থেকে একটু আগেই ফিরল। সরলা তখন দোতলায়। সে শুনতে পেল, নীচে রান্নাঘরের সামনে লোকেশ বলছে, ‘হ্যাঁরে তোর দেশের ঠিকানাটা কী?…অ, ওপরে আয়, লিখে রাখব।’
উপরে এল লোকেশ। সরলা তীক্ষ্ন নজরে মুখভাব লক্ষ করল। স্বাভাবিক। প্রতিদিনের মতো অ্যাটাচি কেসটা খাটে ছুড়ে দিল। সরলা পিছনে এসে দাঁড়াতেই দুটো হাত পিছনে বাড়াল। সরলা কোটটা খুলে নিল।
‘উফফ আজ বড্ড ভ্যাপসানি। বৃষ্টি হলেই দেখছি কষ্টটা বেশি হয়।’ টাই খুলতে খুলতে লোকেশ বলল।
‘ঠান্ডা ঘরে সারাদিন থাকলে, একটু বেশিই লাগে। আমার তো অত লাগছে না।’ সরলা মনে মনে স্বস্তি বোধ করল। লোকেশ যে উগ্র মেজাজে সরলা দত্ত খুন নিয়ে কথা শুরু করেনি, এটাই এখন তার ভালো লাগছে।
‘উপরেই ছাদ, দুপুরে তো ঘরটা গুমোট হয়ে যায়!’
‘আমার তো তেমন লাগে না। ঘরের দরজা-জানলা সব বন্ধ করে দিই।’
‘একতলাটা খুব ঠান্ডা।’ বাইরের ঘরটায় চাঁদু দুপরে নিশ্চয় খুব আরামেই কাটায়।’
চাঁদু নামটা শুনেই সরলা তটস্থ হল। দুপুরে টেলিফোনে ‘চাঁদু কী করছে’ শুনেই সে ধরে নিয়েছিল লোকেশ আর স্বাভাবিক থাকতে পারবে না।
‘তোমার হঠাৎ যে মাথা ধরল? আগে কখনো ধরেছে বলে তো জানি না।’ জাঙ্গিয়া পরা লোকেশ পিছন ফিরে নীচু পাজামা গলাচ্ছে। সরলা মুখটা দেখতে পেল না।
‘ কী জানি, কেন যে ধরল। আগে তো কখনো-‘ সরলা আর কথা খুঁজে পেল না।
‘দুপুরে বাইরের ঘরে গিয়ে তো থাকতে পার। অসুবিধে কী?’
‘নীচে চাঁদু থাকে।’
‘ওহ হ্যাঁ।’
চাঁদু দরজায় এসে দাঁড়াল। ‘চা দিয়েছি।’
‘হ্যাঁ যাচ্ছি। লোকেশ অ্যাটাচি খুলে ছোট্ট ডায়েরি বইটা আর ডট পেন নিয়ে খাবার ঘরে গেল। সরলা তাকে অনুসরণ করতে গিয়েও থমকে গেল। কী যেন একটা ভয়, যা গত আঠারো বছর তার মধ্যে ছিল না, এখন সে অনুভব করছে। এই প্রথম সে নিজেকে অনিরাপদ ভাবল। ধীরে ধীরে সে খাটের উপর বসল।
