‘কাগজটা পড়া হলে আমায় একবার দিবি।’
সরলার এখন একমুহূর্তও রঞ্জনার সামনে থাকতে ইচ্ছা করছে না। সে জিনিস কেউ কখনো ভাবে না, অনুমানও করবে না, সেই সব কথাই ও বলবে বা মাথায় ঢুকিয়ে দেবে।
ঘরে এসে সে খাটে শুয়ে পড়ল। মাথার মধ্যে একটা নাগরদোলা ঘুরতে শুরু করেছে। নানান মুখ, তাদের অভিব্যক্তি, তাদের কথাবার্তা ঘুরতে ঘুরতে উঠছে আর নামছে। কাগজের এই খবর লোকেশ পড়বে, বিটু পড়বে, পাড়ার লোকেরা বিশেষ করে পাশের জ্যাঠার বাড়ির লোকেরা পড়বে। বাবা মারা না গেলে নিশ্চয় পড়তেন। দাদা-বউদিরা, মা, দিদি, জামাইবাবুরা এমনকী তপুও পড়বে।
সে বেঁচে আছে জেনে সবাই হাঁফ ছাড়বে ঠিকই কিন্তু কীসের একটা নোংরা সম্ভাবনা সবার মনের মধ্যে বোধহয় এবার পাঁচড়া তৈরি করে দিয়ে গেল, আরাম পাবার জন্য যেটা অনেকেই মাঝে মাঝে চুলকোবে। অনেক দিন পর্যন্ত সবাই এটা নিয়ে গল্প করবে, এই আশ্চর্য মিল-এর কথার সঙ্গে সঙ্গে নোংরা একটা ছবি তাকে নিয়ে পলকের জন্য হলেও আঁকা হবে। ভাগ্য, একেই বলে ভাগ্য। সরলা বালিশে মুখ চেপে ধরল।
‘ভাত দিয়েছি, ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।’ দরজায় দাঁড়িয়ে চাঁদু। সরলা জবাব দিল না। একটু পরেই ফোন বেজে উঠল।
রিসিভার তুলে ‘হ্যালো’ বলতেই লোকেশ ওধার থেকে বলল, ‘আজকের কাগজে একটা খুনের খবর বেরিয়েছে, দেখেছ নাকি?’
সরলার গলা শুকিয়ে গেল। কোনোক্রমে বলল, ‘না তো।’
‘আমিও জানতুম না, ভট্টাচার্য আমায় দেখাল।’
থেকে কয়েক সেকেন্ড পর লোকেশ বলল, ‘চাঁদু কী করছে?’
‘বলতে পারব না, আমি শুয়ে ছিলুম। মাথাটা ভীষণ ধরেছে।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে।’
ফোন রাখার পর সরলা ইতস্তত করল। লোকেশ জানতে চাইল চাঁদু কী করছে এবং কেন জানতে চাইল সেটা সে বুঝতে পেরেছে। ঘরের জানলা থেকে জ্যাঠামশাইদের ছাদ দেখা যায়। সে মুখ তুলে তাকাতেই বড়দার মেয়ে অমিতা সরে গেল পাঁচিলের ধার থেকে। মেয়েটা আগে কখনো এই বাড়ির দিকে এইভাবে তাকিয়ে থেকেছে বলে তার মনে পড়ে না।
‘সরলা, অ্যাই সরলা।’
রঞ্জনা বারান্দা থেকে ডাকছে। সরলা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ‘এই নে, আধঘণ্টা পরে নেব। শাশুড়ি পড়বে।’
কাগজটা হাতে নিয়েই সরলার মনে হল একটা কেউটে সাপ সে যেন ধরল। কাগজটা ভাঁজ করে খবরটা সাজিয়েই রাখা, খোঁজাখুজি করে বার করার আর দরকার হবে না। ভয়ে ভয়ে সে হেডিংয়ে চোখ রাখল।
উত্তর কলকাতায় গৃহবধূকে খুন করে ধর্ষণ, গৃহভৃত্য পলাতক
স্টাফ রিপোর্টারের লেখাটি নাটকীয় ভঙ্গিতে শুরু হয়েছে : ‘প্রায় বিবস্ত্র সরলা দত্তর নিষ্প্রাণ দেহটিকে শোবার ঘরের বিছানায় প্রথম দেখতে পায় তার একমাত্র পুত্র উচ্চচ মাধ্যমিক একাদশ শ্রেণির ছাত্র পরিমল। স্কুল থেকে ছুটির পর বাড়ি ফিরে খোলা সদর দরজা দিয়ে সে দোতলায় উঠে আসে। ভৃত্য বলাইকে দেখতে না পেয়ে সে নাম ধরে ডাকাডাকি করে, খাবার টেবিলে ঢেকে রাখা খাবার খেতে বসে যায়। খাওয়ার পর সে নিজের ঘরে যায়। তারপর সে মায়ের শোবার ঘরে গিয়ে দেখে বিছানায় তার মা সরলা চিৎ হয়ে শুয়ে, দেহে শুধুমাত্র সায়া ছাড়া আর কোনো আবরণ নেই। মৃতার কানের পাশে রক্ত শুকিয়ে রয়েছে। সম্ভবত ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। মাকে এই অবস্থায় দেখে কিশোর পুত্র বিমূঢ় হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি সে মেঝেয় পড়ে থাকা শাড়িটা দিয়ে মা-র দেহ ঢেকে দেয়।’
সরলা চোখ বন্ধ করে ফেলল। কল্পনাতেও সে নিজেকে এইরকম অবস্থায় ভাবতে পারবে না। কিন্তু সে ভাবতে না পারলেও অন্যরা তো পারবে। শুধু সায়া পরিয়ে তাকে মুহূর্তের জন্যও একবার দেখার চেষ্টা করবে তার চেনাজানারা।
সে বাকিটুকু কি পড়বে? সরলা চোখ খুলল। ‘পরিমল চিৎকার করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। প্রতিবেশীরা, ছুটে আসেন। খবর পেয়ে শ্যামপুকুর থানার ওসি দ্রুত পৌঁছে যান। লালবাজার থেকে আসেন মার্ডার স্কোয়াডের অফিসাররা। পুলিশের কুকুরও আনা হয় কিন্তু আততায়ীর হদিশ করায় সে ব্যর্থ হয়। ভূপেন বসু অ্যাভিনুয়ের বাস স্টপে এসে কুকুরটি গৃহভৃত্যের গন্ধের খেই হারিয়ে ফেলে।
‘পুলিশের অনুমান, সম্ভবত হাওড়া স্টেশন যাবার জন্য বলাই বাসে উঠে দক্ষিণ দিকে গেছে। তার বাড়ি মেদিনীপুর জেলার জোনাক গ্রামে। মৃতার স্বামী, এক মালটি ন্যাশনাল সংস্থার উচ্চচপদস্থ অফিসার নরেনবাবু জানালেন, ঘরের কোনো জিনিসই চুরি হয়নি। মৃতার দেহের কোনো গহনা খোয়া যায়নি। বালিশের নীচে আলমারির চাবি ছিল কিন্তু আলমারি খোলা হয়নি। তিনি আরও জানান, বলাই ছয় বছর তাদের বাড়িতে কাজ করছে। নম্র এবং মার্জিত কথাবার্তার জন্য বাড়ির সবাই তাকে খুব পছন্দ করত। তিনি এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না যে বলাই এমন কাজ করতে পারে।
‘প্রতিবেশী গোপেন সিকদার বললেন, বলাইকে তার চেহারা, কথাবার্তার জন্য অপরিচিতরা প্রথমে ধরে নিত সে দত্ত পরিবারেরই কেউ। ওর চালচলনও ছিল সেইরকম। ওর মধ্যে এমন নৃশংসতা যে লুকিয়ে থাকতে পারে, বিশ্বাসের এমন জঘন্য প্রতিদান যে মানুষ দিতে পারে তা তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না।’
‘প্রতিবেশিনী জয়শ্রী বসাক জানালেন, মৃতা সরলার সঙ্গে তার প্রায় পনেরো বছরের পরিচয়। সরলা অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের এবং পতি অন্ত প্রাণ বলতে যা বোঝায় সেইরকম চরিত্রেই মহিলা ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেন না যে বলাইয়ের সঙ্গে তাঁর কোনো প্রণয় জনিত সম্পর্ক ছিল।
