‘খেয়ে ফিরবে?’
‘বলতে পারছি না।…হয়তো খেয়েই ফিরব।’
লোকেশ পাজামা পরে খাটে বসেছে, চা দিয়ে চাঁদু বেরিয়ে গেল। তখন সরলা বলল, ‘আজ কে এসেছিল জান?….সেই তপু। মনে আছে ওকে। সেই যে আমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেছল, তারপর বাঁশবেড়েতে চলে গেল।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ওর তো দিল্লিতে বিয়ে হয়েছিল। একটা চিঠি লিখেছিল, শ্বশুরবাড়ি নাকি খুব কনজারভেটিভ,…মেয়েদের এই এক বাঁধাবুলি, শ্বশুরবাড়ির লোকেরা পাজি, বদমাস, হুটহাট বেরোতে দেয় না, ঘরের কাজকর্ম করতে বলে, ঝিয়ের মতো খাটায়।’
‘কথাটা অনেকটাই তো সত্যি, এই তো পাশের বাড়ির রঞ্জনাকেই তো দেখছি।’
‘থাক ওর কথা আর বোল না। আমরা এখন যে কথা বলছি, তুমি কাল ওকে জিজ্ঞেস কোরো, দাঁড়ি কমা সমেত সব তোমায় বলে দেবে।’ লোকেশ হাসল। কয়েক বছর হল তার হাসি কমে এসেছে, যেমন চাঁদি থেকে চুল ঝরে টাক জেগে উঠছে। ‘মনে পড়ে, বাবার শ্রাদ্ধের পর রাতে মদ খেয়েছিলাম। সেই অত রাতে বারান্দায় কানখাড়া করে উনি সব শুনেছিলেন। ওর হাজব্যান্ডটাও তেমনি…।’
‘তপুর স্বামী মারা গেছে, ও বিধবা হয়ে ছেলেকে নিয়ে চলে এসেছে।’ সরলা নীচু স্বরে বলল।
লোকেশ অপ্রতিভ, হতভম্ব। ‘স্যাড, ভেরি স্যাড। কী হয়েছিল?’
সরলা যা যা শুনেছে তপুর কাছ থেকে সবই বলল। কলকাতায় থাকার জন্য ফ্ল্যাট খুঁজছে কিন্তু কেন খুঁজছে, তার পুরো কারণটা বলল না। তার মনে হল তপুর আবার বিয়ে করার ব্যাপারটা এখন না বলাই ভালো।
স্নান করতে যাওয়ার সময় লোকেশ আলগাভাবে বলল, ‘বয়স তো বেশি নয়, পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ, মেয়েদের এই বয়সটায় অ্যাট্রাকটিভ দেখায়, ওকে একটু সাবধানে থাকতে বোলো।
ক-দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। দুপুরে কিছুক্ষণের জন্য ধরে আবার শুরু হয় বিকেলে। রাস্তার দিকের বারান্দায় রেলিংয়ে ভিজে তোয়ালেটা মেলে দিয়ে সরলা দাঁড়িয়ে রয়েছে। এক বাসনওয়ালি স্টিলের বাসনের ঝুড়ি মাথায় আর পুরোনো কাপড়ের পোঁটলা পিঠে নিয়ে হাঁক দিতে দিতে এগিয়ে আসছিল, সতেরো নম্বর বাড়ি থেকে কেউ ডাকায় সে থেমে পড়েছে। পুরোনো শাড়ি, জামা প্যান্ট কিছু জমেছে যদি একটা বড়ো ঢাকনাওলা বাটি পাওয়া যায়, এই আশা নিয়ে সরলা দাঁড়িয়ে।
‘ওম্মা, সকাল থেকে দুবার আমি বারান্দায় ঘুরে গেছি!’ রঞ্জনার কথা শুনে সরলা ফিরে তাকাল।
‘কেন?’
‘কেন কি রে, আজকের কাগজ দেখিসনি?’
”না, দুপুরে খাওয়ার পর দেখি।’
‘দেখ, দেখ, তাড়াতাড়ি দেখ, একটা কি অদ্ভুত রকমের খবর বেরিয়েছে।’
‘কী খবর!’ সরলা অবাক হল এবং অস্বস্তি বোধ করল। বাড়িতে ইংরিজি কাগজ নেওয়া হয় কিন্তু ভাষাটা সে ভালো করে বুঝতে পারে না বলে ছবিটবি দেখে রেখে দেয়। তার দু-বছর বি এ পড়ার বিদ্যা দিয়ে খবরের কাগজের ইংরাজি থেকে অর্থোদ্ধারের কাজ যথেষ্ট কষ্টসাধ্য ব্যাপার। সে কষ্ট করতে অনিচ্ছুক কেননা দুনিয়ার খবর না জেনেও সে সুখেই আছে।
‘সরলা দত্ত নামে একটা বউ খুন হয়েছে।”
শোনামাত্র সরলার বুকটা হিম হয়ে গেল। অর্থহীন একটা হাসি সে হাসল।
‘আমার নামে? অদ্ভুত তো?’
‘কাগজটা দেখ, খুব বড়ো বড়ো করে আমাদের কাগজে হেডিং দিয়েছে। আমি তো ভেবেছি তুই পড়েছিস। আর শুধু কি নামেরই মিল, আরও অনেক মিল আছে!’
সরলা প্রায় ছুটে ঘরের মধ্যে এসে খবরের কাগজ খুলল খুনের ইংরিজি মার্ডার। সে বড়ো বড়ো হেডিংয়ে ‘মার্ডার’ শব্দটা খুঁজল। পাতার পর পাতা উলটে, তন্নতন্ন করে সে খুনের খবর পেল মাত্র দুটি। পড়ে বুঝল একজন গুন্ডা তার আগের দলের হাতে ছুরি খেয়ে মরেছে আর গ্রামে জমিজমা নিয়ে বাবাদে ভাইপোর হাতে কাকার মুণ্ডু ধড় থেকে খসেছে। কোথায় সরলা দত্তের নামের বউ?
খবরটা খুঁজে না পেয়ে সরলার কৌতূহল বেড়ে গেল। সে বারান্দায় এসে ঝুঁকে রঞ্জনাদের ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে ওর ছোটো মেয়েটিকে দেখতে পেল। ‘এই গোবি তোর মাকে একবার ডাক তো।’
কিছুক্ষণ পর রঞ্জনা এল।
‘তোদের কাগজটা দে, আমাদের ইংরিজি কাগজে খবরটা নেই।’
‘আমাদের কাগজ এখন ভাসুরের ঘরে, ওর পড়া না হলে এখন দিতে পারব না।’
‘কি লিখেছে কি? কি মিল আছে।’
মিল মানে সরলা দত্ত নাম, বয়স চল্লিশ, দেখতে সুন্দরী, একমাত্র ছেলে উচ্চচ মাধ্যমিক পড়ছে, বাড়িটা আমাদের এই শ্যামপুকুর থানার এলাকাতেই আর…’
রঞ্জনা থেমে গেল। পিছনে ঘরের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে, বারান্দায় ঝুঁকে, উত্তেজিত নীচু গলায় বলল, ‘খুন করেছে বাড়ির চাকর, দুপুরে গলা টিপে মেরেছে।’
রঞ্জনার চোখেমুখে, বলার ভঙ্গিতে কী যেন একটা ইঙ্গিত সরলা দেখতে পেল। তার মাথা মুহূর্তের জন্য ঘুরে উঠল।
‘শোবার ঘরে বিছানায়, সায়া ছাড়া গায়ে একটুকরো কাপড়ও ছিল না। ধস্তাধস্তির মতো চিহ্ন অবশ্য বিছানায় ছিল তবে সেটা কিসের ধস্তাধস্তি, কে জানে!’ রঞ্জনা এক চোখ টিপে ঠোঁট ওলটাল। ভ্রু তুলল। আর একবার পিছন ফিরে সন্তর্পণে ঘরের দিকে তাকিয়ে নিল। আরও ঝুঁকে ফিসফিস করল, ‘ছোকরা জোয়ান চাকর!’
‘সকালে উনি কাগজ পড়তে পড়তে আমাকে ডাকলেন। ছেলেমেয়েদের সরিয়ে দিয়ে বললেন, এই দ্যাখো। আমার তো পড়েই হাত পা পেটে সিঁধিয়ে গেল। উত্তর কলকাতা, শ্যামপুকুর থানার অধীন, এক ছেলের মা, বয়সটাও মিলছে, দুপুরে একা আর বাড়িতে শুধু চাকর! খুন করেছে যে সেও পুরোনো চাকর তবে ছ-বছরের পুরোনো। উনি ঠাট্টা করে বললেন, এত মিল তার ওপর নামটাও একই, দ্যাখোতো একবার উঁকি দিয়ে উনি বেঁচেটেচে আছেন কি না। আমি বললুম, পাশের বাড়িতে দুপুরে এমন কাণ্ড ঘটলে পুলিশ আসবে, পাড়ায় জানাজানি হয়ে লোক জমে যাবে। সে সব কিছুই হয়নি! তা ছাড়া বিকেলে আমি চাঁদুকে দেখেছি লন্ড্রি থেকে কাপড় নিয়ে বাড়িতে ঢুকতে!’
