‘সোমনাথ দেখতে শুনতে কেমন, শিক্ষাদীক্ষা বয়স, কালচার? তোর সঙ্গে মিলবে?’
‘বয়স আমার সমান, দু মাসের ছোটোই। নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন আর সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়েছে, কথায় মাঝে মাঝে দোখনো টান বেরিয়ে পড়ে, ওকে ভ্যাঙাতে গিয়ে আমার কথাতেও টানটোন এসে যাচ্ছে। এ ছাড়া, দেখতে শুনতেই খুবই সাধারণ, তোমার চাঁদুকে ওর পাশে উত্তমকুমার মনে হবে।’
‘তাপাকে নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না?’
‘বিন্দুমাত্র না। তাপার নিজের বাবাকে প্রায় ভুলেই গেছে আর সোমনাথের সঙ্গে ভালোই বন্ধুত্ব হয়েছে। দুজনে দুজনকে পছন্দও করে খুব।’
‘সোমনাথ নিজের সন্তান তো চাইতে পারে!’ সরলা উদবিগ্ন চোখে তাকাল।’ ‘তুই লাইগেশন করিয়ে নিয়েছিস?’
‘না। আর চাইতে পারে বলছ কি? আমি বলেছি…’তপু বাঁ হাতের তর্জনীটা উঁচিয়ে ধরল। ‘এর বেশি নয়। ও বলেছে…’ তপু তিনটি আঙুল ওঠাল।
সরলা থ হয়ে রইল। তার আজন্ম পোষিত বোধ থেকে সে তপুকে বুঝে উঠতে পারছে না। এটা ওর সাহসের না বেহায়াপনার, প্রশংসার না নিন্দার কোন ধরনের কাজ, সেটা তার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। গল্প-উপন্যাসে কী সিনেমায় এই ধরনের ব্যাপার সে পেয়েছে। যাহোক একটা গোঁজামিল দিয়ে সমস্যা মেটানো হয়। কিন্তু সত্যিসত্যিই, চেনাজানা একটা মেয়ে যে এমন ব্যাপার ঘটাবে, তার সামনে বসে অনায়াস স্বচ্ছন্দে বলে যাবে, এতটা সে ভাবতে পারছে না।
‘তোরা এই নিয়ে আলোচনা করেছিস তাহলে।’
‘নিশ্চয়।’
সরলার মনে পড়ল দেশবন্ধু পার্কে লোকেশের সঙ্গে পরিচয় হবার জন্য গেছল। মলিই কথাটা তুলেছিল, ‘আপনি ক-টা ছেলেমেয়ের বাবা হতে চান?’ লোকেশ সরাসরি স্পষ্ট কোনো জবাব দেয়নি, হালকা চালে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছল।
ধুপধাপ সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
‘মা, মা-‘ বলতে বলতে ঢুকল লম্বা চওড়া দেহের এক কিশোর, চোখে চশমা। তপুকে দেখে থমকে সরলার দিকে তাকাল।
‘আমার ছেলে বিটু। এবার মাধ্যমিক পাশ করল, ফার্স্ট ডিভিসনে। তোর মাসি হয়, তপু মাসি।’
বিটু হাত তুলে নমস্কার করল, তপুও তাই করল। পলকের জন্য সরলার মুখ নিষ্প্রভ দেখাল। ‘তপু দিল্লিতে থাকত, এখন কলকাতায়, ব্যাঙ্কে চাকরি করে। ওর ছেলে তাপা…দ্যাখ তো বারান্দায় ঝুঁকছে কি না?’
‘ঝোঁকেনি, আমি নজর রেখেছি।’ ঘরের বাইরে থেকে চাঁদুর গলা শোনা গেল।
‘মা, রাজেশ, বাপ্পা, শান্ত সব মোটরে ওয়েট করছে, ট্যাংরায় চায়নাটাউনে খেতে যাব। চট করে, একটু বাইরে এসো বলছি।’ বিটু দ্রুত ব্যস্ত গলায় বলল।
‘তপু সামনেই বল না, টাকা চাই তো?’
‘হ্যাঁ।’
‘কত?’
‘একশো দাও। চাঁদা করে বিল দেব।’
‘এই সেদিন পঞ্চাশ দিলুম, পরশুই তো, আজ আবার…’ বিটু গলা জড়িয়ে ধরায় কথা অসমাপ্ত রেখে তপুর দিকে তাকিয়ে সরলা অত্যন্ত সুখের হাসি হাসল।
‘সরলাদি আমি এবার উঠি। ছ-টার সময় সোমনাথ অপেক্ষা করবে।’
‘আবার কবে আসবি? দাঁড়া একটু, টাকাটা দিয়ে দি। ছেলে তো নয়, কাবলিওলা!’
টাকা নিয়ে বিটু ছুটে নীচে নেমে গেল। তপু বলল, ‘দেখে কে বলবে বয়স ষোলো-সতেরো! আমি তো ভেবেছিলাম তোমার দাদাটাদা হবে। এই বয়সি এমন বড়ো চেহারার ছেলে আরও কয়েকজন চোখে পড়েছে। জেনারেশনটার গ্রোথ খুব ভাল হয়েছে।’
‘সব জেনারেশনেরই গ্রোথ ভালো যদি বাবা দু-বেলা দুধ-মাখন, মাছ-মাংস খাওয়ায়। ছেলের স্বাস্থ্য আর ফিগার ঠিক রাখার জন্য তোর জামাইবাবু যা করে!’
‘শুধু ছেলের জন্যই? বউয়ের বয়স তো আঠারো বছর ধরে একই জায়গায় তিনি দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। আমি এবার, তাপা এসো।’
সিঁড়ি দিয়ে ছেলের হাত ধরে নামতে নামতে তপু দাঁড়াল। ‘সরলাদি আমাদের বিয়েতে তুমি উইটনেস হবে? আত্মীয়স্বজন তো কেউ আসবে না, তুমি এলে বলতে পারব দিদি এসেছে।’
সরলা প্রস্তাবটা শুনেই কুঁকড়ে গেছল। ‘দিদি এসেছে’ কথাটা হৃদয়ের অনেক ভিতরে ঢুকে মৃদু একটা বিস্ফোরণ ঘটাল।
‘কবে বিয়ে তোদের?’
‘এই মাসে নোটিস দেব, সামনের মাসেই ঠিক করেছি।’
‘বলিস।’ সরলা হাত রাখল তপুর কাঁধে।
সন্ধ্যাবেলায় খাবার ঘরে সোফায় হেলান দিয়ে সরলা টিভি-তে বাংলা সিরিয়াল দেখছিল। খাওয়ার টেবলের চেয়ারে বসে চাঁদু। অফিস থেকে ফিরে পায়ের শব্দ না-করে লোকেশ দোতলায় উঠে খাবার ঘরের দরজায় দাঁড়াল।
তাকে দেখেই চাঁদু চেয়ার থেকে উঠে পড়ল। সরলা সোজা হয়ে বসে বুকের কাপড় ঠিক করে বলল, ‘এইমাত্র শুরু হল, দেখবে নাকি?’
‘না। চা দাও।’ লোকেশ শোবার ঘরের দিকে গেল। সরলা তাকে অনুসরণ করল।
‘চাঁদুকে চেয়ারে বসার পারমিশন কে দিয়েছে? ওকে চেয়ারে পাশে বসিয়ে, গা এলিয়ে তুমি টিভি দেখছ?’ লোকেশ বিরক্তি এবং ক্ষোভ জানাতে হাতের অ্যাটাচি কেসটা বিছানায় ছুড়ে বারান্দার পর্দার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কোঁচকাল। ‘পই পই বলি পর্দাটা ঠিক করে টেনে রাখবে, সামনের বাড়ির রাসকেলটা তো হাঁ করে ঘরের দিকে তাকিয়ে থাকে।’
সরলা কথা বলল না। এই ধরনের কথায় সে অভ্যস্ত। প্রতিদিনই লোকেশ অফিস থেকে ফিরেই কিছু না কিছু ত্রুটি বার করে ধমকধামক শুরু করবে। সরলা পর্দাটা টেনে দিয়ে বলল, ‘আমি তো খাবার ঘরে, তাহলে এ ঘরের দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ ব্যথা করবে, এমন বোকা কেউ নেই।’
‘আছে কি নেই, তুমি আর কি জান?’ লোকেশ মুখ নীচু করে জুতোর ফিতে খুলছে। তাকাল না সরলার দিকে। ‘চান করেই আমি বেরোব, ভটচাযের কাছে যাব, ওকে নিয়ে যাব হোটেল হিন্দুস্থানে। আমাদের এক ডিরেক্টর এসেছে।’
