‘তুই মোটা হয়ে গেছিস কি রে? কি চমৎকার ফিগার তোর, দেখলে…।’
‘থাক, থাক সরলাদি থাক, আর আমাকে গাছে চড়িয়ো না। তোমার পাশে আমি? কত হল তোমার চল্লিশ ছুঁয়েছে? শেষ যা দেখেছি তার থেকেও সুন্দরী হয়েছে।’
‘তপু বাজে কথা বন্ধ কর তো।’ আপ্লুত সরলার মুখ পুলকে ভেসে গেল।
‘দেখ বাপু, আমি পুরুষ হলে তবু ধরে নেওয়া যেত তোমাকে পটাবার জন্য বলছি কিন্তু একটা মেয়ে যখন আর একটা মেয়ের রূপের প্রশংসা করে, তখন কত জ্বালা কত ঈর্ষা দমিয়ে রেখে যে তা করে সেটা কি তুমি জেনেছ কখনো?’
শিবেন্দ্রলালের ঘরটা দেয়াল তুলে দুটি ঘর হয়েছে। একটি বিটুর শোবার, অন্যটি একাধারে বসার ও খাবার ঘর। এখানেই রয়েছে কালার টিভি সেটটা আর দর্শকদের জন্য সোফা।
‘ডাইনিংয়ে চা দিয়েছি, আপানারা আসুন।’ চাঁদু কেতাদুরস্ত ভঙ্গিতে ঘোষণা করল।
‘চল, খাবার ঘরে যাই।’ সরলা কনুই ধরে তপুকে নিয়ে এল।
টেবলে টি পট, পেয়ালা ইত্যাদি সাজিয়ে রাখা এবং প্লেটে শিঙাড়া ও রাজভোগ। তপু ধরে নিয়েছিল তার আনা সন্দেশই তাকে দেওয়া হবে। চাঁদু নিজেই এটা করেছে।
‘আপনার ছেলেকে আমি বারান্দাতেই দিয়ে আসছি।’ চাঁদু আর একটা প্লেট নিয়ে বেরিয়ে গেল।
‘তুমি খুব ভাগ্যবতী সরলাদি তাই এমন একজন গৃহিণী পেয়েছে। কতদিন হল রয়েছে?’
‘আমার বিয়ের আগে থেকেই তো রয়েছে! তিন কুলে কেউ নেই, যাবেই বা কোথায়! লেখাপড়া একটু আধটু আমিই ধরেকরে শিখিয়েছি। চেহারাটা ভালো, বাইরের লোকজনের সামনে বার করা যায় নইলে বুদ্ধিশুদ্ধিতে গবেট। যাকগে এসব, তোর ব্যাঙ্কটা কোথায়, কতদিন চাকরি কচ্ছিস?’
‘আমার ব্যাঙ্ক কাঁকুড়গাছিতে। দিল্লির রাজিন্দর নগর ব্রাঞ্চ থেকে সোজা বদলি হয়ে এখানে এসেছি। ও মারা যেতে ব্যাঙ্ক আমায় চাকরি দিল। অবশ্য চাকরি আমিই চেয়েছিলাম। তোমায় বহুদিন আগে লিখেছিলাম, শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে আমার মতের বা মনের মিল হচ্ছিল না। চাকরি নেওয়ায় ওদের সবারই আপত্তি ছিল কিন্তু জোর করেই আমি নিই। এর পর নানানভাবে শ্বশুর, শাশুড়ি, দেওর মিলে আমার পিছনে লেগে এমন অসুবিধা সৃষ্টি করতে লাগল যে মাথা ঠিক রাখা শক্ত হয়ে পড়ল। ঝগড়াঝাঁটি শুরু হল। বাড়ির বউ তাও কিনা আবার বিধবা বউ, চাকরি করলে ওদের নাকি মানমর্যাদা ধুলোয় গড়াগড়ি দেবে। আমি বললাম, দেয় তো দেবে! অসহ্য হয়ে উঠতে শেষকালে জানালাম এখানে আর থাকব না, দাদার কাছে চলে যাব। ওরা রাজি হল তবে শর্ত দিল, একটা জিনিসও সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে না, এমন কী বিয়ের গহনাগুলোও নয়। আমি তাতেই রাজি হয়ে গেলাম।’
‘গয়না তো দশ ভরির, ছেড়ে দিয়ে এলি!’ সরলা বিশ্বাস করতে পারছে না তপু এমন বোকার মতো কাজটা কেন করল!
‘ওরা বলল তপাকে যদি নিয়ে যেতে চাও তাহলে গহনা পাবে না। কাজেই সোনা ফেলে দিয়েই চলে এলাম। অবশ্য চলে আসাটা বলার মতো এত সহজ ছিল না। দিল্লি থেকে বদলি হতে পেরেছি বলেই আসা হল। অ্যাসোসিয়েশনের দিল্লি ইউনিটের সেক্রেটারি ভদ্রলোক আমার জন্য তদবির লেখালেখি করে এটা করিয়েছেন। প্রথমে এক বছর ছিলাম দমদম নাগেরবাজারে । কী কষ্ট করে যে বাঁশবেড়ে-নাগেরবাজার দুবেলা করতে হত, কী বলব, তোমায়।’ কথা বলতে বলতে তপু শিঙাড়া ভেঙে ভেঙে খেয়ে যাচ্ছিল। সরলা লক্ষ রেখেছিল প্লেটে।
‘রাজভোগ দুটো শেষ করবি কিন্তু। একদিন খেলে মোটা হয়ে যাবি না। …তাহলে তো তোর উপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে।’
‘নাগেরবাজার ব্রাঞ্চে এক নতুন অফিসার, সোমনাথ কয়াল, অনেক চেষ্টাচরিত্র করে বাঁশবেড়ের দিকে একটু ঠেলে দিতে পেরেছে, তাতে মিনিট কুড়ি সময় কমেছে। তবে আমি কাঁকুড়গাছির দিকে যদি ফ্ল্যাট পাই এখুনি চলে আসব। তপার লেখাপড়ার দিকটা আগে দেখতে হবে তো!’ তপু আস্ত রাজভোগ মুখে পুরে চিবোতে চিবোতে বলল, ‘সত্যনারায়ণের?’
‘হ্যাঁ।’
‘মনে আছে সরলাদি তোমার কাছে নীচের ঘরটা ভাড়া চেয়েছিলাম? দেখো আজও ঘর খুঁজে যাচ্ছি!’ তপুর মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল।
‘দালাল লাগা পেয়ে যাবি।’
‘সোমনাথকে একজন একটা ফ্ল্যাটের সন্ধান দিয়েছে, ব্যাঙ্কের কাছাকাছি সেটাই এখন দেখতে যাব। ও মানিকতলার মোড়ে অপেক্ষা করে থাকবে ছ-টার সময়।’ তপু ঘড়ি দেখল।
সরলার কানে ‘সোমনাথ’ নামটা খট করে বাজল। আগের ব্রাঞ্চের অফিসার চেষ্টাচরিত্র করে বদলিতে সাহায্য করেছে, ল্যাটা তো ওখানেই চুকে গেল। এরপর ঘর দেখে দেওয়াতেও উৎসাহ কেন? এত আঠা কীসের?
‘কত ভাড়া, কিছু বলেছে?’
‘দেড় হাজার। সেলামি নেবে না। দু-খানা ডাইনিং স্পেস, বারান্দা। চারতলায়।’ ঝরঝর করে তপু বলে গেল ফর্দ পড়ার মতো স্বাভাবিক স্বরে।
‘দেড় হাজার! অ্যাতো টাকা! কত মাইনে পাস যে অ্যাতো ভাড়া দিবি?’ সরলা চমৎকৃত হল।
‘একার টাকা হলে পারতাম না, দুজনের টাকায় পারব।’
‘দুজন! আর একজন কে?’ সরলার কাছে অন্য জনটি এখন আন্দাজের আওতায় আসছে। সে রোমাঞ্চ বোধ করল।
‘সোমনাথ।’ তপুর চোখ উজ্জ্বল হয়েছে। চেয়ারে নড়ে বসে সে মিটমিট হাসল। সরলা নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত দেখাবার চেষ্টা করল।
‘তোরা বিয়ে করবি?’
‘হহুঁউ। …জানি এবার কী বলবে। ওদের দেশ ক্যানিংয়ের কাছে তালদিতে। সেখানে বাবা মা ভাই বোন সবাই আছে। বিধবা বিয়েতে তাদের ঘোরতর আপত্তি তো বটেই, এক পয়সা পাওনা থোওনাও হবে না এটাই ওদের মাথা খারাপ করে দিয়েছে আমার দাদারও প্রচণ্ড আপত্তি সোমনাথ নীচু জাত বলে। তা ছাড়া বিধবা বোন প্রেমট্রেম করাতেও তিনি লজ্জিত। অতএব আমরা নিজেরাই ঠিক করলাম,’ তপু সুর করে গেয়ে উঠল, ‘একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো রে।’
