বলতে বলতে লোকেশ সরলাকে টানতে টানতে নিজেই খাটের উপর গড়িয়ে পড়ল। সরলা তার মুখের উপর ঝুঁকে বলল, ‘এবার শান্ত হও, ঘুমোও।’
‘অবশ্যই, অবশ্যই ঘুমোব। কিন্তু শাস্তি পেতে হবে। ভগবান সব দেখছে, সব জানে। হোম, যজ্ঞি, স্বস্ত্যয়ন, শালা সব বোগাস।’ আচমকা ধড়মড়িয়ে উঠে বসল লোকেশ। সরলা ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।
‘তুমিও শাস্তি পাবে, ভগবান সব জানে ইউ আর আ কোলাবোরেটর, হাত মিলিয়ে ছিলে।’
‘আমি মেশিন খারাপ হওয়ার কথা বলিনি। এটা তোমার মাথা থেকে বেরিয়ে ছিল।’
‘কিন্তু বারণও তো করেনি। চাঁদু, হারামজাদা চন্দন গড়াই বিশ্বাস করেছে, তুমিও কি করেছিলে? মিথ্যে কথা বোল না, করেছিলে?’
‘না।’
‘তাহলে এসো।’
সরলার কাঁধ ধরে লোকেশ হ্যাঁচকা টান দিল। খাটের উপর সরলা চিৎ হয়ে পড়ে যেতেই পায়ের কাছ থেকে শাড়িটা কোমর পর্যন্ত তুলে লোকেশ হুমড়ি খেয়ে পড়ল বুকের উপর এবং নিথর হয়ে রইল। তার বড়ো করে নেওয়া শ্বাসপ্রশ্বাস এখন স্বাভাবিক হতে শুরু করল।
মিনিট দশেক পর বেহুঁশ লোকেশকে বিছানায় লম্বা করে শুইয়ে দিয়ে সরলা তার পাশে শুল। ভোর রাতে ঘুম না আসা পর্যন্ত সে অনেক কিছু ভাবল এবং অবশেষে একটি ব্যাপারে নিশ্চিত হল, লোকেশ এবং সে ঠিকই আছে। সংসারে অনেক কিছুই ঘটে, সবই সাময়িক, কেউ তা মনে করে রাখে না।
সত্যিই কেউ মনে করে রাখেনি। সকালে ঘুম থেকে উঠে লোকেশ বলেছিল, ‘ঘুমটা ডীপ হয়েছিল, বেশ ঝরঝরে লাগছে শরীরটা, আর এক কাপ চা খাব।’
সরলা সুখ বোধ করল লোকেশকে প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিক দেখে। এই সুখবোধ নিয়ে তারা কয়েকটা বছর স্বচ্ছন্দ্যে কাটিয়ে গেল।
বিটু মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম ডিভিশনে পাশ করেছে। ফল বেরোনোর পরের দিনই বিকেলে ছেলেকে নিয়ে তপু হাজির। হাতে বাক্স ভরা সন্দেশ। সরলা তো অবাক আনন্দে শুধু তাকিয়ে রইল।
‘সরলাদি কত বছর পর এলাম বল তো?’
‘বিটু তখন ক-দিনের মাত্র। নার্সিং হোম থেকে সবে ফিরেছি, আমার মা তখন এখানে। সতেরো বছর, না না বিটুর এখন ষোলো হয়ে তিন মাস। এইটি তোর ছেলে? বয়স কত, নাম কী? ভারি মিষ্টি মুখখানি তো!’ সরলা ছেলেটিকে কোলে টেনে নিয়ে চুম্বন দিল।
‘ওর নাম প্রতাপাদিত্য রায়, ডাক নাম তাপা, তপুর সঙ্গে মিলিয়েই। বয়স ছয়।’
‘চোখ দুটো ঠিক তোর মতোই হয়েছে।’ বলেই সরলা তাকাল তপুর চোখের দিকে এবং তখনই খেয়াল করল তপুর সিঁথেয় সিঁদুর নেই।
সরলার মুখভাব বদলাতেই তপু বলল, ‘তারপর দু-বছর বয়সে ওর বাবা মারা গেছে। অফিস থেকে স্কুটারে বাড়ি ফিরছিল। কালকাজির কাছে একটা সার্কেল ঘোরার সময় মোটরে ধাক্কা লাগে। হাসপাতালে তিন দিন কোমায় থেকে মারা যায়।’
তপু খুব সহজ গলায়, যেন অন্য কারোর বৈধব্যের খবর জানাল। চোখমুখে শোক বা বিষণ্ণতার কোনো স্পর্শ নেই। সরলা ফাঁপরে পড়ল। সে নিজে কত বেদনাহত হবে তপুকে দেখে আন্দাজ করতে পারছে না, তপু সেটা লক্ষ করল।
‘সরলাদি, চার বছর হয়ে গেছে। শোক তাপ যা করার এত দিনে করে ফেলেছি। এখন সামনের দিকে তাকিয়ে আমায় চলতে হবে। দিল্লি বরাবরের জন্য ছেড়ে চলে এসেছি।’
‘য়্যাঁ! তোর শ্বশুরবাড়ি তো ওখানেই, ছেড়ে দিয়ে কোথায় এলি?’
‘মেয়েরা যেখানে যায়, বাপের বাড়ি। আমার ক্ষেত্রে দাদার বাড়ি, বাঁশবেড়ে।’ ‘সেখানে তো ভাজ-এর সঙ্গে তোর বনিবনা হত না।’
‘মনে আছে তোমার? হ্যাঁ হয়নি, এখনও হয় না। তবে টাকা দিয়ে থাকি তো! আসলে অন্য কোথাও ঘর নিয়ে থাকার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু তাপাটা এত ছোটো, আলাদা কোথাও থাকতে ভরসা হয় না। সারাদিন একটা ওইটুকু ছেলে একা থাকবে।’
‘তাহলে সারাদিন তুই কী করিস?’
‘চাকরি, অ্যাসোসিয়েটেড ব্যাঙ্কে।’
তাপা ইতিমধ্যে গুটি গুটি বারান্দায় চলে গেছে। রাবারের বল দিয়ে ফুটবল খেলা হচ্ছে রাস্তায়। তপু বারান্দায় গিয়ে তাকে বারণ করে এল না-ঝুঁকতে।
‘বউদি চা করে আনব?’ দরজার কাছ থেকে চাঁদু বলল।
তপু অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘এই তোমার সেই চাঁদু না? ওরে বাবা, কত বড়ো হয়ে গেছে গো! রীতিমতো একজন ম্যান…জেনটেলম্যান! প্রথম দিন আমাকে বলেছিল বউদি বিশ্রাম করছেন,’ তপু হেসে উঠল শব্দ করে। ‘এখনও ওইভাবে কথা বলে?’
চাঁদু চোখ নামিয়ে লাজুক হাসল। সরলা বলল, ‘বলে না আবার! ওর দাদা যতক্ষণ বাড়ির বাইরে ততক্ষণ ওর কত্তামি চলে বাড়ির সবার ওপর।’
‘চা আনব?’ চাঁদু সন্দেশের বাক্সটার দিকে তাকাল। ‘ওটা ফ্রিজে তুলে রাখি?’
‘তপুর ছেলেকে দে, তপুকেও দে।’
‘না না আমায় নয়, মিষ্টি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি, দেখছ না কীরকম মোটা হয়ে গেছি।’
এবার সরলা ভালো করে লক্ষ করল তপুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। একটু ভারী হয়েছে। ঘাড়ে আর গলায় সামান্য চর্বি, কোমরটাও আর পাতলা নয়। অমলার বন্ধুর কতই বা বয়স হবে, তার থেকে তিন-চার বছরের হয়তো ছোটো। হালকা লিপস্টিকটাই যা বেমানান মনে হচ্ছে যেহেতু তপু বিধবা। এটা ওর উচিত হয়নি। কিন্তু ওর সারা অবয়বে, বিশেষ করে দুটি চোখে কেমন একটা ছেলেমানুষি চাপল্য, ছটফট করে চলেছে যেটা ওর সাদামাটা রূপের উপর আলাদা একটা সৌন্দর্যের প্রলেপ দিয়েছে। বয়সটাও যেন তার ফলে কম কম দেখাচ্ছে। ঝরঝরে, সহজ, ন্যাকামো বর্জিত কথাবার্তা, যার মধ্যে দিয়ে ওর নিজের উপর ভরসা আর বুদ্ধি ফুটে বেরিয়ে আসে, এটাই বোধহয় ওর ব্যক্তিত্ব যা প্রবলভাবে পুরুষদের টানে। সরলার মনে হল, টানবার এই ধরনের ক্ষমতা তার মধ্যে নেই।
