সরলা চুপ। তার মনে হচ্ছে লোকেশের এইসব অনর্থক আবোল তাবোল, মনের একটা ভয়ংকর অবস্থা থেকে রেহাই পাবার জন্য। আর সেই ভয়ংকর অবস্থাটা যে কী, সেটা সে আন্দাজ করতে পারছে।
‘জাপানি মেশিন খারাপ হয় না, খারাপ হয় ব্যাড হ্যান্ডলিংয়ের মানুষও খারাপ হয় এই কারণেই। সাহস না থাকলে, ‘সেল্ফ কনফিডেন্স না থাকলে, বিশ্বাস না থাকলে হ্যান্ডল করবে কী করে। তোমার সাহস আছে? আমি যদি আজ মরে যাই পারবে এই পৃথিবীকে ফেস করতে? পারবে? বিটু পারবে?…আমি কিন্তু পারব। আই অ্যাম সেলফ মেইড।’ লোকেশ গ্লাসটা বুকে ঠেকাল।
‘তুমি এতবার মেশিনের কথা বলছ কেন?’
লোকেশ যেন শুনতে পায়নি, পূর্ব কথার জের টেনে সে বলল, ‘আমি খেটেছি, বুদ্ধি খরচ করেছি, ভাগ্যও ফেভার করেছে। একটা ভালো চাকরি করছি। সুন্দরী বউ…না না প্রতিবাদ করো না, তুমি অত্যন্ত অ্যাট্রাকটিভ, আমায় দুনিয়ার পুরুষরা হিংসে করে কেন জান? তোমার সঙ্গে বিছানায় শোয়ার ছাড়পত্র আমার আছে, কিন্তু তাদের নেই বলে। …এ ছাড়া একটিমাত্র ছেলে, সেও দেখতে সুন্দর, স্বাস্থ্যবান, পড়াশুনায় মন আছে। কেমন একটা পারফেক্ট মেশিন আমি বানিয়েছি, সর্বাঙ্গসুন্দর, নিখুঁত। এটা কখনো খারাপ হবে না বলেই আমার ধারণা ছিল।’
লোকেশ খাটে সরলার পাশে বসল। মুখ নীচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে মাথা নাড়তে শুরু করল। সরলা ওর বাহু আঁকড়ে ধরল।
‘এবার শুয়ে পড়ো। সারাদিন ধকল গেছে।’
‘হ্যাঁ গেছে। তাতে কী হয়েছে, আমার অভ্যেস আছে। তুমি বরং শুয়ে পড়ো….একটু খাবে?’ লোকেশ গ্লাসটা সরলার মুখের কাছে ধরল। ‘অনেকেই খায়। ও বাড়ির মেজো বউদিকে রাতে দরজা বন্ধ করে মেজদা খাওয়াত। ছাদ থেকে আমাদের চাকর দেখেছিল খোলা জানালা দিয়ে। সে আমাকে বলেছিল, তখন আমি বিটুর বয়সে।’ বলেই লোকেশ হেসে উঠে সামনে ঝুঁকে পড়ল। হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল প্রায়ই সরলা দু-হাতে জড়িয়ে ধরল।
‘এবার শোও, কাল তো সকাল সকাল উঠতে হবে।’
‘ঠিক আছি, আমার কিছু হয়নি। এটা হল স্কচ।’ লোকেশ গ্লাস বাড়িয়ে দিল সরলার মুখের কাছে। ‘খাও।’
ওর চোখ মুখের অবস্থা লক্ষ করে সরলা গ্লাসটা হাতে নিল।
‘সামান্যই তো, খেয়ে নাও। এতে চরিত্র নষ্ট হবে না।’
সরলা এক চুমুকে গ্লাসটা খালি করে তাকিয়ে রইল লোকেশর মুখের দিকে। মুখটা একবার বিকৃত করল মাত্র।
‘ভালো না?’
‘হ্যাঁ। এবার শোও।’
‘তুমি ব্লাউজ খুলবে না?’
‘না।’
‘ইসস একটু দেখতুম।’
‘আজ এসব থাক।’
‘থাকবে। কেন? ন্যাড়া হয়েছি বলে?’ লোকেশ মাথায় হাত বুলিয়ে চাঁটি মারল।’ বাবা ভালো তবলা বাজাত, জ্যাঠামশাই এস্রাজ বাজাত। গানবাজনার চর্চা ছিল দত্তবাড়িতে। এখন কিছুই নেই। এস্রাজ তো কেউই বাজায় না!….ব্লাউজ খুলবে না?’
‘বললুম তো আজ থাক।’
‘কেন থাকবে? সটান দাঁড়িয়ে উঠল লোকেশ। আমাকে অমান্য? কেন আজ থাকবে?’ চাপা গর্জনের মতো কথাগুলো শোনাল।
সরলার মুখ ফ্যাকাসে দেখাল। কথা না বলে সে ঘরের দরজা বন্ধ করতে গেল।
‘দরজা কেন বন্ধ করছ? জানালা বন্ধ করো, ছাদ থেকে রাত্তিরে কে দেখছে তুমি কি তা জান? চাঁদু এখন কোথায় তা কি তুমি জান?…. দরজা বন্ধ করা হচ্ছে, হুঁউ।’
সরলা জানলাগুলো বন্ধ করতে লাগল।
‘মেইনট্যানন্স, হ্যান্ডলিং-এর উপর নির্ভর করে মেশিনের আয়ু। আমার মেশিন খারাপ হতে দেব না। আই মেড ইট, আমার দ্বারা নির্মিত, আমিই ইঞ্জিনিয়ার, বিশ্বকর্মা। আজ রাত আমি ডেডিকেট করব শিবেন্দ্রলাল দত্তকে, আমার বাবাকে….ডেডিকেট, ডেডিকেশ্যান, মানে জানো? উৎসর্গ, বাবাকে উচ্ছুগ্যো করব, খোলো।’
ধমক দিয়ে ঘোলাটে চোখে লোকেশ তাকিয়ে রয়েছে। সরলা একটা জিনিস এত দিনে বুঝে গেছে, কোনোরকম প্রতিবাদ বা আপত্তি এই সময় করা উচিত নয়। করলে মারাত্মক ফল ফলবে, লোকেশ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। সে ব্লাউজ খুলল। আঙুল নেড়ে লোকেশ ইসারা করল ব্রেসিয়ারটাও খোলার জন্য।
‘আসলে কি জানো? লোকেশ এগিয়ে এল। টলছে না। কিন্তু কথাগুলো জড়ানো। ‘আমার মেশিনের একটা পার্টসও আমি খারাপ হতে দেব না। আমি ঠিকমতো সবকিছু মেইনটেইন করব। দরকারের সময়ে, প্রাণ নিয়ে টানাটানির সময়ে তুমি যে বলবে মেশিন খারাপ হয়ে গেছে, তা আমি বলতে দোব না। হুঁ-হুঁ বাব্বা, আমি অনেক চালাক, আমি শিবেন্দ্রলাল নই। আমার মেশিন জাপান থেকে তৈরি করে আনবে বিটু। মাই অনলি সান…খুলেছ?’
লোকেশের চোখ দুটো ছোটো হয়ে এসেছে। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। সরলার দুই কাঁধ ধরে সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে।
‘হাউ আই লুক, কেমন দেখাচ্ছে আমাকে, ন্যাড়া লোকেশকে? তুমি কি জান আমরা কি করেছি?’
‘কিছু করিনি।’
‘বলছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমার মেশিন ঠিক আছে, চলছে, পারফেক্ট?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে বলছ কেন আজকে নয়?’
সরলা চুপ।
‘তাহলে একটা কথা জেনে রাখ, কিছুই থেমে থাকে না, বন্ধ থাকে না। তুমি কি রোজ রাতে বাবাকে শ্রদ্ধা জানাতে ব্রেসিয়ার পরে ঘুমোবে? নিশ্চয় নয়, তাহলে বুঝব মেশিন কাজ করছে না।’ লোকেশের ঘোলাটে দৃষ্টি সরলার মুখে। কিছুই সে দেখতে পারছে না, চোখ বড়ো করে সে প্রাণপণে দেখার চেষ্টা করতে করতে সরলার গালে, কাঁধে এবং বুকে হাত বুলিয়ে বলল, ‘আমার ছাড়পত্র আছে। কিন্তু বাবাকে বাঁচাবার জন্য…শুধু তখনই মেশিন খারাপ হয়ে যায়। আশ্চর্য!’
