আত্মীয় কুটুম্ব ও বন্ধুবর্গের ভোজনের পর ভাড়া করা শ্রাদ্ধবাড়ি থেকে রাত বারোটা নাগাদ লোকেশ ও সরলা ফিরেছিল।
ইদানীং লোকেশ যৎসামান্য মদ খেতে শুরু করেছে। অফিসের নানান কাজে আসাম বা উড়িষ্যায় প্রায়ই যেতে হয়, তখনই সে অল্পস্বল্প খেতে শুরু করে। কলকাতায়ও সে কয়েকবার খেয়েছে তবে লোকের বাড়িতে নিমন্ত্রণে এবং সামান্যভাবে। শুধু সরলা ছাড়া বাড়ির আর কেউ তা জানে না। বাড়িতেও সে প্রায়শই খায়। বিটু ঘুমিয়ে পড়লে, দরজা বন্ধ করে রাত্রে আলমারি থেকে বোতল বার করে দু পেগ খেয়েই শুয়ে পড়ে। তার একটাই ভয় বাবা যেন না জানতে পারে। শিবেন্দ্র বলেন, মদ খেয়ে মানুষ নষ্ট হয় না, নষ্ট হয়ে মানুষ মদ খায়। লোকেশ বাবার চোখে নষ্ট ছেলে হতে কোনোভাবেই চায় না।
‘এতে হার্ট ভালো থাকে। এক্সারসাইজ তো একদমই হয় না, অ্যালকোহলে হার্টটা জোরে দপদপ করে, রক্ত চলাচল দ্রুত হয়।’ লোকেশ যুক্তি দিয়েছিল সরলাকে।
সরলা তা মেনে নিয়ে বলেছিল, ‘তবে দেখ বাপু বাড়িয়ে ফেল না। ও বাড়িতে তোমার মেজদা এক একরাতে বাড়ি ফিরে যা তুলকালাম করে।’
না, ওরকম হবে না। মেজদার ওরকম হয় ডীপ ফ্রাস্ট্রেশন থেকে। ক্ল্যাসিকাল গান শিখতে যেত ওস্তাদের কাছে সেখানে ভাব হয় একজনের সঙ্গে, আমি তাকে দেখেছি। শিক্ষিতা এবং সুন্দরীও। তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল মেজদা। জ্যাঠামশাই না বলে দেয়। বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে, সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করবে, এইসব হুমকি দিয়ে মেজদার তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিল। তারপর থেকে কীরকম যেন হয়ে গেল, গানও ছেড়ে দিল।’
‘সম্পত্তি হারাবার ভয়ে বিয়ে করার সাহস হল না।?’ সরলা তখন শাড়ির আঁচল দাঁতে কামড়ে বুকের সামনে ঝুলিয়ে ব্লাউজ খুলছিল। লোকেশ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রয়েছে অনাবৃত কাঁধের দিকে।
‘এখনই শোবে নাকি? দাঁড়াও এইটুকু রয়েছে শেষ করেনি।’
‘যা গরম পড়েছে। ঘাম সারাক্ষণই লেগে রয়েছে।’ সরলা দু-হাত পিঠের দিকে মুচড়ে ব্রেসিয়ার খোলার উদ্যোগ নিল। তারিফের স্বরে লোকেশ বলল, ‘তোমার ওটা না পরলেও চলে, কোনো দরকারই নেই।’
‘হ্যাঁ তাই করি আর তোমার মুখঝামটা খাই। দরকার নেই আমার। জানি তো তোমায়। ব্লাউজের ঝুল কম নিয়ে কীসব খারাপ কথা বললে মনে আছে? তার আগে একদিন বললে, বগলকাটা ব্লাউজ পরলে আমাকে দারুণ দেখাবে। কোনটে যে তোমার মনের কথা এতদিনেও আমি বুঝতে পারলাম না।’
‘রাতে এই সময় একবার পরতে পার।’
‘এই সময়? শোবার আগে একবার পরা?’ সরলা দরজার ছিটকিনি খুলল বাইরে যাবার জন্য।
‘কোথায় যাচ্ছ এখন?’ লোকেশ সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল।
‘ভিজে তোয়ালেতে গা মুছব।’
‘দাঁড়াও আমি তোয়ালে ভিজিয়ে আনছি। বারান্দায় কে আছে না আছে, বুক খুলে……’ লোকেশ ব্যস্ত হয়ে বেরোল।
‘এত রাতে বারান্দায় কে আবার থাকবে।’ সরলা বিরক্তি প্রকাশ করেছিল।
ভিজে তোয়ালে নিয়ে ফিরে লোকেশ উত্তর দিয়েছিল ‘আমি ছাড়াও তো এ বাড়িতে পুরুষমানুষ আছে।’
‘তুমি চাঁদুর কথা বলছ?’ সরলা অবাক হয়ে গেছল। লোকেশ একঢোঁকে বাকিটা শেষ করে। জবাব দেয়নি।
রাত বারোটায় শ্রাদ্ধ বাড়ি থেকে ফিরেই লোকেশ আলমারি খুলে বোতল বার করেছিল। মাস দুয়েক আগে বোম্বাইয়ে সেলস সম্পর্কে হায়ার একজিকিউটিভ ট্রেনিংয়ের জন্য গেছল। তখন সেলস ম্যানেজার তাকে একটা জনিওয়াকারের বোতল উপহার দেয়। সেটা এতদিন তুলে রেখেছিল বিশেষ কোনো উপলক্ষে খুলবে বলে।
সরলা ভ্রু কুঁচকে বলে, ‘আজ না খেলেই তো পারতে।’
‘কেন শ্রাদ্ধটাদ্ধ তো চুকে গেছে। বাবাকে তো ঘটা করেই….।’ লোকেশ ছিপির প্যাঁচ কাটার জন্য মুখটা বিকৃত করে মোচড় দিল। কট কট শব্দ হল। একবার সে সরলার মুখের দিকে তাকিয়েই গ্লাসে ঢালল এবং পরিমাণটা বেশিই।
‘বরফ এনে দেব?’
‘থাক।’ লোকেশ কাচের জাগ থেকে গ্লাসে জল ঢেলে চোখের সামনে তুলে ধরল। ‘বিলিতি। আমার উন্নতি হয়েছে বাবা সেটা দেখে গেছেন।’ এই বলেই একচুমুকে গ্লাস শেষ করে সরলার দিকে তাকিয়ে, বাহবার দাবি জানানোর মতো করে হাসল।
গ্লাসে আবার ঢেলে লোকেশ চোখ কুঁচকে বিটুর হাত থেকে হরিণের ছোলা খাওয়ার ছবিটা দেখতে দেখতে বলল, ‘সুন্দর দৃশ্য, ভালোই তুলেছি। এটাকেই তো বাঁচিয়ে রাখতে চাই।
উঠে গিয়ে সে ছবির সামনে দাঁড়াল। গ্লাসটা একবার ছবির কাচে ঠেকিয়ে চুমুক দিল।
‘বিটুকে বিদেশে পাঠাব। না আমেরিকা ফ্যামেরিকা নয়, গাদাগুচ্ছের ওখানে গিয়ে জুটেছে। জাপান পাঠাব।’
লোকেশ বাঁ হাতের তালু মাথায় বোলাল। তবলায় চাঁটি মারার মতো আঙুল দিয়ে বাজাল। সরলা অবাক চোখে শুধু দেখে যাচ্ছে।
‘জীবনে এই দ্বিতীয় বার ন্যাড়া হলুম। খুব ছোটোবেলায়, বিটুর থেকেও ছোটো, খুব ফোড়া হত। বাবা কেষ্ট নাপিতকে দিয়ে কামিয়ে দিয়েছিল। তোমার কখনো ফোড়া হয়েছে মাথায়।’
‘না।’
‘বিটুর হয় না। ওর ধাতটা তোমার মতোই হয়েছে।’ লোকেশ আবার এক চুমুকে গ্লাস শেষ করল। এবার হাতটা একটু কেঁপে উঠল।
‘তুমি বেশি খাচ্ছ।’
‘খাই একটু। আজ স্পেশাল অকেশন তো।’ লোকেশ বোতল থেকে গ্লাসে ঢালল। সরলা গ্লাসে জল ঢেলে দিতে জাগটা তুলল।
‘থাক আমিই ঢালছি। বিটুকে জাপান পাঠাব। ওরা ভালো মেশিন তৈরি করে। জার্মানিও করে কিন্তু আমি জাপানেই পাঠাব। ওদের মেশিন খারাপ হয় না কখনো, নেভার। এই যে রেডিয়ো ওটা জাপানি, টেপ রেকর্ডারটাও জাপানি, টিভি-টার সার্কিট জাপানি নকশা থেকে, ভালো কথা কালার টিভি আসবে আমাদের দেশে। এলে একটা কালার টিভি কিনব তবে এদেশি নয়, জাপানি কালার টিভি। কেন বলতো?’ লোকেশ গ্লাসে জল ঢেলে চুমুক দিল।
