কত বছর ধরে বাবাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সে মাসে মাসে এত টাকা দিতে পারবে? কিডনি বদল করে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে শুধু কিডনি কিনতেই হাজার পঞ্চাশ হাজার টাকা বেরিয়ে যাবে। সে নিজে যদি একটা কিডনি দেয় তাহলে অবশ্য এই টাকাটা বাঁচবে। সরলাকে বলতেই সে আঁতকে উঠেছিল। ‘সে কি গো। না না তুমি কিডনি দেবে না। জানি একটা কিডনি নিয়েও লোকে বেঁচে থাকে। কিন্তু ভগবান না করুন, যদি সেটা খারাপ হয়, তাহলে? আমার কথা বাদ দাও, বিটুর কথাটা ভাব।’
‘তাহলে লাখখানেক টাকা আমি পাব কোথায়? লোকে তো বলবে ছেলে চিকিৎসা করায়নি বলে বাপ মনে গেল।’
‘লোকেরা কেউ জানে না বাবার কী অসুখ হয়েছে। আমি কাউকে কিছু বলিনি।’
‘চারবার গাড়ি করে নার্সিং হোমে ডায়ালিসিস করাতে নিয়ে গেলুম পাড়ার বহু লোকই দেখেছে। ও বাড়ির বড়দার ছেলে কার্তিক তো আমায় জিজ্ঞাসাও করল কোথায় নিয়ে যাচ্ছি। কিডনি ফেইলিওয়ের কথা অবশ্য বলিনি। কিন্তু জেনে তো যেতে পারে।’
‘জানুক না, তাতে হয়েছে কী?’
‘হয়েছে নয় হবে। সবাই তখন কী চিকিৎসা হচ্ছে জানার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে। এতবড়ো চাকরি করে আর বাপের জন্য লাখ টাকা খরচ করবে না, তা কী হয়? কিন্তু লাখ টাকা তো আর জমানো নেই যে চেক কেটে দিয়ে দেবে, প্রভিডেন্ড ফান্ডেও অত টাকা নেই বাড়িটা বিক্রি করে অবশ্য চেষ্টা করা যায়, এটা তো বাবারই।’
‘তা হয় না। নিজের বাড়ি ছেড়ে ভাড়া বাড়িতে থাকা! পারবে তুমি?’
জবাব না দিয়ে মুখ নীচু করে লোকেশ গোমেদের আংটিটা আঙুলে ঘোরাতে থাকে। সরলা তখন একদৃষ্টে তাকিয়েছিল ছবিটার দিকে। চিড়িয়াখানার হরিণটাকে ছোলা খাওয়াচ্ছে তিন বছরের বিটু। ভয় আর আনন্দ মুখটাকে জমার করে দিয়েছে, শক্ত করে ওর হাত ধরে আছে সরলা। ছবিটা লোকেশের তোলা।
ওরা একই সঙ্গে হঠাৎই পরস্পরের দিকে তাকাল। দুজনেই কী একটা ভাবছিল এবং ভাবনাটা মিলে যাওয়ায় চমকে উঠল। ‘তাহলে কী ঠিক করলে?’ সরলা শুকনো গলায় ফিসফিসিয়ে বলল।
‘দেখি ভেবে দেখি।’
পঞ্চমবারের ডায়ালিসিসের জন্য লোকেশ তার বাবাকে নিয়ে গেল না। চাঁদু শুধু বলেছিল, আজ বুধবার, দাদুকে নিয়ে যাবার দিন।’
লোকেশ গম্ভীর মুখে বলে, ‘জানি।’ তারপর সে টেলিফোন তুলে ডায়াল করল।
‘হ্যালো, সানি নার্সিং হোম?…..আচ্ছা কাল আমার অফিসে আপনারা ফোন করে জানিয়ে ছিলেন আপনাদের ডায়ালিসিস মেশিনটা খারাপ হয়ে গেছে, সেটা কি সারানো হয়েছে?……হয়নি, পার্টস ভেঙে গেছে।…..
কোনো দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না? তাহলে তো বিপদে পড়লাম।…..হ্যাঁ, হ্যাঁ, প্লিজ, সারানো হলেই ফোনে একবার জানিয়ে দেবেন।’
টেলিফোন রেখে লোকেশ চাঁদুর মুখের দিকে তাকাল। ‘মুশকিল হল।’
‘অন্য কোথাও করানো যায় না?’ চাঁদু উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল।
‘না। মাত্র এই একটা জায়গাতেই হয়। বিলিতি মেশিনও যে খারাপ হয়। তুই একটা ফোনের কাছাকাছি থাকিস যদি খবর দেয়।’
লোকেশ অফিস বেরিয়ে যাবার আগেই বিটুকে নিয়ে স্কুলে পৌঁছে দিতে গেল চাঁদু। ফিরে এসে কাজের মধ্যেই কান পেতে রইল ফোন বাজার শব্দের জন্য। পিটুকে স্কুল থেকে বাড়িতে এনে সে আবার কান পেতে রইল। বিকেলে ফোন বাজল। সে ছুটে গিয়ে দেখল সরলা কথা বলছে।
‘না, নার্সিং হোম থেকে এখনও কোনো ফোন আসেনি। চাঁদু? ও এখানেই দাঁড়িয়ে…..তুমি আর একবার ওদের ফোন করো। ……নিজেই যাবে?…..আচ্ছা।’
‘কী হবে বউদি?’ ভীত চোখে চাঁদু তাকিয়ে। সরলা চোখ সরিয়ে নিল।
‘কী আবার হবে, মেশিন আজকালের মধ্যে নিশ্চয় সারাবে, তখন বাবাকে নিয়ে গেলেই হবে।’
শিবেন্দ্রকে আর নিয়ে যাওয়ার সুযোগ এলনা, কেননা ডায়ালিসিস মেশিনের পার্টসের খোঁজে বোম্বাইয়ে যে লোক গেছে সাত দিনেও সে ফিরে আসেনি। অগত্যা শিবেন্দ্র আর অপেক্ষা না করে পরপারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলেন। সরলা ও লোকেশ কেঁদেছিল, চাঁদু পারেনি।
শিবেন্দ্রকে শেষবারের মতো দেখতে এসেছিলেন তার দাদা আর ভাই। অমৃতলাল নীরবে কিছুক্ষণ ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় লোকশকে বলেছিলেন, ‘শিবু এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে ভাবিনি। কিই বা বয়স হয়েছিল।’
‘মেশিনটা ঠিক থাকলে দাদু চলে যেতেন না।’ পিছন থেকে চাঁদু বলে ওঠে। লোকেশ চমকে ফিরে তাকিয়েই অস্বাভাবিক স্বরে চিৎকার করে, ‘তোকে ওস্তাদি মেরে কথা বলতে কে বলেছে? চাকর চাকরের মতো থাকবি।’
ফ্যালফ্যাল করে চাঁদু তাকিয়ে থাকে। এমন রূঢ় কথা এই বাড়িতে সে প্রথম শুনল। জ্যাঠামশাইও অবাক হয়ে লোকেশের দিকে তাকিয়েছিলেন ভ্রু তুলে। নিজের শোকগ্রস্ত অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে লোকেশ কয়েক সেকেন্ড সময় নেয়। ‘ছোটো থেকে আছে তো তাই আশকারা পেয়েছে।’
জ্যাঠামশাই নির্বিকার মুখে বলেন, ‘একটু বেশিই পেয়েছে, পরে না পস্তাতে হয়। যেখানে যেখানে খবর দেবার দিয়ে দাও। মেজো আর সেজো পিসিকে ফোন করো, ওদের মেজদাকে শেষবারের মতো দেখে যাক আর খাটটা একটু ভালো কিনো।’
শিবেন্দ্রর মাথার কাছে বসে নৃত্যলাল হু হু করে কেঁদে ফেলেন। চাঁদু তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে,
‘কেঁদে আর এখন কী হবে। দাদা তো এত চেষ্টা করলেন কিন্তু মেশিন যদি ঠিক না করা যায়, দাদা আর কী করতে পারে।’
চাঁদুই শবযাত্রার আগে খই আর পয়সা ছড়াতে ছড়াতে গিয়েছিল তার পিছনে ছিল কীর্তনের দল। বাবার শ্রাদ্ধে লোকেশ আলাদাবাড়ি ভাড়া নিয়ে প্রায় পাঁচশো লোক খাওয়াল, বারোজন ব্রাহ্মণকে পিতলের থালা গ্লাস ও একশো টাকা দক্ষিণা দিল, লাইব্রেরিকে দান করল বাবার কাচের আলমারিটা, তাতে সাদা অক্ষরে লেখা,’শিবেন্দ্রলাল দত্তের স্মৃতিতে।’
