ঝামেলা এড়িয়ে যাওয়াই ভালো, এই ভেবে তারক সরে পড়তে যাওয়ার আগেই লোকটা দেখে ফেলল।
‘এখানে যে?’
শুনে জ্বালা করে উঠল তারকের সর্বাঙ্গ। এমনভাবে বলল যেন দিল্লি কি বোম্বাইয়ে দেখা।
‘এই একটা ওষুধ কিনতে এসেছি। কোনো দোকানেই পাচ্ছি না।’ তারক যতটা সম্ভব হেসে বলার চেষ্টা করল।
‘কোনো জিনিসই দরকারের সময় পাওয়া যায় না। কাল খুঁজতে খুঁজতে হন্যে হয়ে গেলুম ওয়াটারবটলের একটা গ্লাসের জন্য। ক্যানিং স্ট্রিট, মুরগিহাটা চষে ফেললুম, পেলুম না। তার আগে ছেলেটার স্কুলের বই নেওয়ার জন্য হ্যান্ডেল দেওয়া প্লাস্টিকের একটা ব্যাগ খুঁজে খুঁজে পেলুম না। অথচ ক-দিন আগেই দোকানে দেখেছি। যে জিনিসটি দরকার দেখবেন উধাও হয়ে গেছে।’
মনে মনে তারক বলল, কিনছিলে তো বউয়ের ব্লাউজ। ফুটপাথ থেকে কেনার লজ্জা ঢাকতে এত বাজে কথার দরকার কী।
‘যা দিনকাল পড়েছে, জিনিসের দাম কী, আগুন সব!’ তারক গম্ভীর মুখে বলল।
‘আজ একটা সুখবর পেলুম। স্ট্যাটিসটিকাল সেকশানের মিস্টার ঘোষাল আর আমি এক ট্রামেই এলুম। উনি বললেন, যা ফিগার পেয়েছেন তাতে মনে হচ্ছে শিগগিরি একটা শ্ল্যাব হয়তো বাড়বে।’
লোকটা জ্বলজ্বল করে তাকিয়ে থাকল। তারক সঙ্গে সঙ্গে হিসেব করে দেখল, তাহলে তার ডিএ আট টাকা বাড়বে। এই লোকটারও হয়তো আট-ন টাকা বাড়বে। সেই আনন্দে বোধহয় বউকে তিন টাকার উপহার দিচ্ছে।
‘যদি বাড়ে তাহলে তো ভালোই।’
লোকটা যেন ক্ষুব্ধ হল। এমন আলগা উত্তর নিশ্চয় আশা করেনি। হয়তো ভেবেছিল শুনেই নৃত্য শুরু করে দেবে। তারক ঘড়ি দেখে বলল, ‘একটু তাড়া আছে, চলি।’
তারক হাঁটতে শুরু করল। কিছুক্ষণ সে একটিও ওষুধের দোকান পেল না। অবশেষে এক ডাক্তারখানায় একটি যুবককে চুপ করে বসে থাকতে দেখে সে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘরটা খুবই ছোটো। দুটি মাত্র আলমারি। একটি টেবল, খান চারেক চেয়ার আর বেঞ্চ। আলমারি দুটির মাঝে দড়িতে পর্দার ওধারে নিশ্চয় তোষকপাতা বেঞ্চ বা চৌকি আছে, রোগী শুইয়ে পরীক্ষার জন্য। যুবকটি ছাড়া ঘরে কোনো লোক নেই। তারক আলমারির সামগ্রীগুলো লক্ষ করল। শিশি, কৌটো, অ্যাম্পুল যা ডাক্তারদের আলমারিতে থাকা উচিত তাই রয়েছে, তবে ঠাসাঠাসি নয়। বোধহয় ওষুধ কোম্পানির স্যাম্পেলগুলো জমিয়ে রেখেছে। দেখে মনে হয় বহু দিনের। তারক ভাবল, ওষুধগুলো টাটকা না বাসি তা দিয়ে আমার কী। ছেলেটা কি ইঞ্জেকশন দিতে পারে?
তারক ডাক্তারখানায় ঢুকল। যুবকটি সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘ডাক্তারবাবু কলে বেরিয়েছেন ফিরতে আধঘণ্টা দেরি হবে।’
‘আপনি ইঞ্জেকশন দেন?’
‘কী ইঞ্জেকশন?’
‘পেনিসিলিন।’
‘বসুন।’
খুশিতে তারক ধপ করে বসল। ডাক্তার বা অন্য কেউ আসার আগেই ব্যাপারটা সেরে নেওয়া যাবে।
‘পেনিসিলিন এনেছেন?’
‘এখানে পাওয়া যাবে না?’
‘না, ফুরিয়ে গেছে।’
‘আচ্ছা নিয়ে আসছি।’
‘সঙ্গে জলও আনবেন।’
তারক হনহনিয়ে গেল। সরুগলা, গালে গর্ত, চওড়া চোয়ালওলা লোকটাকে বলল, ‘পাঁচ লাখ পেনিসিলিন আর একটা জল দিন তো।’ একটা টাকা দিয়ে, খুচরা পয়সা না গুনেই, হনহনিয়ে আবার ফিরে এল।
পর্দা তুলে যুবকটি বলল, ‘ভেতরে আসুন।’
তারক ভিতরে এসে দেখল, যা ভেবেছিল তাই। অয়েলক্লথের মতো কী একটা তোশকের উপর পাতা। তোশক দেখে মনে হয় ছারপোকা আছে। বসে থেকে সে দেখল স্পিরিট দিয়ে সিরিঞ্জের শুদ্ধিকরণ, করাতে ডিস্টিল ওয়াটার অ্যাম্পুলের মাথাটা ঘষে ঘষে মুট করে ভেঙে ফেলা, পেনিসিলিন শিশির টিনের পাতমোড়া মাথা থেকে ঢাকনা তুলে ছুঁচ ফুটিয়ে জল ঢুকিয়ে দেওয়া, শিশিটাকে ঝাঁকিয়ে গুঁড়ো পেনিসিলিন গলিয়ে ফেলা।
দেখতে দেখতে তারক খুব আরামবোধ করল। রোগমুক্ত হওয়ার নির্ভাবনা আসা মাত্র তার গা দুলে উঠল, গ্রন্থিগুলোয় যত জট পাকিয়ে ছিল খুলে গেল, শরীর থেকে বছরের পর বছর ঝরে যেতে থাকল। সে দম বন্ধ করে রইল ভারশূন্য বোধটাকে লুটোপুটি খাওয়ার সুযোগ করে দিতে।
‘ডান হাতে না বাঁ হাতে?’
স্পিরিট ঘষে যুবকটি তার বাহু পরিষ্কার শুরু করল। এত অনায়াসে আগে কখনো কি কোনো অঙ্গ সে নাড়িয়েছে? তারক মনে করতে পারছে না।
‘শুয়ে পড়ুন বাঁ কাত হয়ে।’
দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে তাকাতেই তারক দেখল নোনা লেগে বালি খসে ইট বেরিয়ে! স্কুলের ম্যাপে ভারতবর্ষের মতো রং। ইংরেজ আমলে ওই রং ছিল, এখন কী হয়েছে কে জানে! লম্বা লাঠির ডগাটা হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত গঙ্গার উপর দিয়ে টেনে নিয়ে যাবার সময় কেশববাবু বলেছিলেন, এই নদীই হচ্ছে ভারতের ইতিহাস, ভারতের আত্মা, ভারতের দর্শন। পানু ডুবে মরেছিল গঙ্গায়। আহিরিটোলা ঘাটে জেটির নীচে শেকল জড়ানো ফ্যাকাসে শরীরটা দু-দিন পরে পাওয়া যায়।
‘শক্ত করবেন না তাহলে লাগবে।’
যুবকটির নিশ্বাসের শব্দ তারক শুনতে পাচ্ছে। পেনিসিলিন নিতে গিয়ে কেউ কি মরেছে? ছোকরার হাত কাঁপছে। ছুঁচ ফোটার সময় পট করে শব্দ হল না তো! আস্ত বড়ো মাছ কোটার আগে মা ডাকত, তারক আয়, পটকা ফাটাবি। গোড়ালি দিয়ে লাথি দিলেই পট করে ফেটে যেত।
‘আঃ।’
‘লাগছে? ভেতরে ঢোকার সময় একটু লাগবে।’
লাগুক! তারক চোখ বুঝে ভাবল, এ তো খুবই সামান্য ব্যথা। মা বলল, তোর ভালোর জন্যই মেরেছে। বড়ো হয়ে বুঝবি। শুধু খেলে বেড়ালেই কী চলে? পরীক্ষায় ফেল করলে লোকে কী বলবে, তোর বাবার মাথাও তো হেঁট হবে। এইরকম জোরে জোরে নয়, আরও আস্তে আস্তে আলতো করে মা বুক পিঠ গলায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।
