‘এসব নিয়ে ঠাট্টা আমার ভালো লাগে না।’ আর কী লিখেছে?’
‘আর লিখেছে জাতকের মা দিনে দিনে সুন্দরী হবে আর বাবাটা কুচ্ছিত হবে।’
‘ছিঁড়ে ফেলে দাও কোষ্ঠীটা।’ সরলা কোপ প্রকাশ করে মুখ ঘোরাল।
‘দিচ্ছি, আর লিখেছে বিটু অত্যন্ত মেধাবী হবে, দেশ জোড়া খ্যাতি পাবে, যশ আর ধনলাভের প্রবল সম্ভাবনা।’
‘ফাঁড়া?’
‘ছিঁড়ে ফেলি এবার?’ লোকেশ দু-হাতে কোষ্ঠীটা ধরে ছেঁড়ায় উদ্যত হল।
‘আঃ ফাজলামো রাখো, ফাঁড়ার কথা কিছু বলেছেন? মা বলছিল, বদ্যিনাথ বাবার কাছ থেকে মাদুলি এনে বিটুকে পরাবে।’
লোকেশের মুখ থেকে চাপল্য ঘুচে গিয়ে গাম্ভীর্য দেখা দিল। ‘ওর একত্রিশ থেকে চৌত্রিশ বছরের মধ্যে কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা আছে। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম জ্যোতিষীমশাইকে সম্ভাবনা বলতে কী বোঝায়? উনি রোব থেকে শনি যাবতীয় গ্রহের নাম, তাদের যাতায়াত, কে কবে কাকে ধাক্কা মারবে তার হিসেব বুঝিয়ে শেষকালে বললেন স্বস্ত্যয়ন করলে গ্রহশান্তি লাভ হবে। স্রেফ পয়সার ধান্দা। আমাকেও রত্ন ধারণ করতে বললেন, গোমেদ আর পলা।’
থমথমে হয়ে গেল সরলা। ক্ষীণস্বরে বলল, ‘ওই একটাই ছেলে, আর হবে না, আমি কোনো চান্স নোব না।’
‘আর একটা কথাও কোষ্ঠীতে আছে, পুত্রভাগ্যে পিতার ধনলাভ হবে।’
‘হোক। স্বস্ত্যয়ন আমি করব।’
‘লেখাপড়া শিখেও তুমি এসব বিশ্বাস কর? সায়ান্স আর টেকনলজির অবিশ্বাস্য এই….। কিন্তু কথা শেষ করতে পারল না।
‘আমি স্বস্ত্যয়ন করাব।’ উদ্ধতভাবে সরলা মুখ তুলে, জ্বলজ্বল চোখে বলল, কাটাকাটা স্বরে। লোকেশের তর্ক করার সব ইচ্ছা মিইয়ে এল সরলার প্রতিবাদী ভঙ্গির সামনে।
‘উনি বলেছেন এক্ষুনিই যে করাতে হবে তার কোনো মানে নেই। তিরিশ বছরেও এটা করা যায়। ফাঁড়া তো একত্রিশের পর।’
‘তা হোক, তুমি ওর সঙ্গে দেখা করে বলো আমরা স্বস্ত্যয়ন করাব আর তুমিও রত্নধারণ করবে।’
এর ছয়দিন পর খবরের কাগজে রাজ্য লটারির সাপ্তাহিক ফলের নম্বরগুলোয় চোখ বোলাতে গিয়ে লোকেশ চমকে উঠল। চিৎকার করে সরলাকে ডেকে সে মানিব্যাগ থেকে লটারির টিকিটটা বার করে নম্বর মেলাল।
‘দ্যাখ দ্যাখ, চতুর্থ পুরস্কারে আমার নম্বরটা রয়েছে, পঞ্চাশ জন পাবে দেড় হাজার টাকা!’
সরলাও টিকিটের নম্বর মেলাল। অবাক ভাবটা কাটিয়ে ওঠার পর বলল, ‘বিশ্বাস হল তো? কোষ্ঠীতে কী লেখা আছে? পুত্রভাগ্যে পিতার ধনলাভ! বি এসসি পাশ করেছ বলে তো খুব অবিশ্বাস করো, এইবার কী বলবে?’
লোকেশ চুপ করে রইল।
‘এই টাকা দিয়েই স্বস্ত্যয়ন করাব। আজও যাও জ্যোতিষীমশায়ের কাছে।’
লোকেশ জবাব দেয়নি। হোম যজ্ঞ করে স্বস্ত্যয়ন হয়েছিল দু সপ্তাহ পরই।
তপু মাঝে মাঝে আসত। বি এ পাশ করার পর খবরটা দিতে এসেছিল। তখনই জানায়, ওর দাদা অজয় বিয়ে করেছে চন্দননগরের একটি মেয়েকে। দোকানেই আলাপ হয়েছিল। ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়া, অত্যন্ত মুখরা এবং তপুর সঙ্গে একদমই বনছে না।
‘সরলাদি তোমাদের একতলার ঘরটা খালি দেখলাম, কোচিংটা কি উঠে গেছে?’
হ্যাঁ, উনি অনেকদিন আগেই বলে দিয়েছিলেন ঘরটা দরকার। মাস দুই হল সমাজপতি রোডে একটা বড়ো ঘর পেয়ে উঠে গেছে।’
‘ঘরটায় আমায় থাকতে দেবে? তাহলে আর দাদার বউয়ের ট্যাঁকট্যাকনি শুনতে হয় না। ভাড়া দেবো। তোমাদের পেয়িং গেস্ট হয়ে থাকব।’
‘কিন্তু তোর জামাইবাবু যে ওটাকে বসার ঘর করবে বলে ঠিক করেছে। এখন তো উনি ফিল্ড সুপারভাইজার, বাইরের লোকজন আসে, তাদের বাবার ঘরে বসালে খুব অসুবিধে হয়। পরে যখন আরও উপরে ডিভিশনাল ম্যানেজার হবেন, একদিন হবেনই, তখন তো ঘরটায় কার্পেট পাততে হবে।’
এরপর তপু আর আসেনি। তবে তিন বছর পর দিল্লি থেকে ওর একটা চিঠি এসেছিল। তপু তার জেদ বজায় রেখেছে। এম এ পাশ করে তবেই বিয়ে করেছে। শ্বশুরবাড়ি দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কে। স্বামী ব্যাঙ্কের অফিসার। চিঠির শেষে লেখা, ‘প্রেম করে নয়, খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে দাদা যোগাযোগ করে। দিল্লি থেকে পাত্র আমাকে দেখতে আসে এবং পাঁচ দিনের মধ্যেই বিয়েটা হয়ে যায়। তাই কাউকেই জানাতে পারিনি। ওরা চল্লিশ বছর দিল্লির বাসিন্দা। আগে থাকত করোলবাগে। বিয়ের আগে বরকে ওইটুকুই দেখেছি। বাড়ির বড়োছেলে, মানুষ ভালো, রসকস একটু কম, অফিসের কথাই বেশি বলে। এরা বেশ কনজারভেটিভ। মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে উঠি। কলকাতায় গেলে ওকে নিয়ে তোমাদের বাড়ি যাব।’ চিঠির নীচে পুঃ দিয়ে বাচ্চচা কমপক্ষে তিন বছরের আগে নয় যদিও বাচ্চচা আমি ভালোবাসি।’
বিটু এখন ইংরিজি মিডিয়াম সেন্ট জন স্কুলের ছাত্র। তার আগে বাড়ির কাছাকাছি এক নার্সারি স্কুলে পড়েছে। বাসে স্কুল যায় চাঁদুর সঙ্গে, ফেরেও তার সঙ্গে। চাঁদু এখন ধোপদুরস্ত ধুতি আর শার্ট পরে। অবশ্য বাড়ির যেসব কাজ আগে করত তা করে যাচ্ছে। ওর মাইনে এখন একশো টাকা। ইংরেজিও বাংলায় নাম সই করতে পারে, যোগ-বিয়োগটাও শিখেছে। সরলা ওকে ব্যাঙ্কে নিয়ে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলিয়েছে। মাইনের সবটাই সে জমায়। টেলিফোন ধরে অপরিচিত লোকের সঙ্গে বিনীত ভঙ্গিতে কথা বলে বা ফোন নাম্বার লিখে রাখার দরকারটাও সে বোঝে।
বিটু যখন আট বছরের শিবেন্দ্র মারা গেলেন কিডনির অসুখে। ডাক্তার বলেছিলেন একটা কিডনি বদলাতে হবে। হিসেব করে দেখা গেল এজন্য খরচ হবে প্রায় লাখ টাকার কাছাকাছি। চারবার ডায়লিসিস করিয়েই লোকেশ চিন্তায় পড়ল। প্রতিবাদের জন্য খরচ হয়েছে আটশো টাকা। বাবাকে বাঁচিয়ে রাখতে মাসে যদি সাত-আটবার ডায়লিসিস করাতে হয় তা হলে মাসে কম করেও অন্তত ছ-হাজার টাকা লাগবে যেটা তার এখনকার মাইনের থেকেও বেশি। মাসে মাসে এত টাকা চলে যাবে আটষট্টি বছরের এই লোকটিকে জীইয়ে রাখতে! ভাবতে ভাবতে লোকেশ এমন এক মানসিক অবস্থায় পৌঁছায় যখন সে মনের আগোচরেই বিদ্রোহ করল নিজের কর্তব্যবোধ এবং সুকুমার অনুভূতিগুলির বিরুদ্ধে।
