‘ভালো।’ রঞ্জনা ঘরের সর্বত্র চোখ বোলাল। ‘ছেলেটাকে দেখতেও ভালো, আপন করে নেওয়ার মতোই চেহারাটা।’
সরলা হাসতে পারল না রঞ্জনার সঙ্গে। তার মনে হল হাসলেই সে নোংরা হয়ে যাবে। রঞ্জনার স্বভাবের গতিপ্রকৃতি গত একবছরের আলাপেই বুঝে গেছে। বারান্দা থেকে ডেকে কথা না বললে তাই সে কথা বলে না।
‘এর পরের বাচ্চচাটা কবে হবে, ঠিক করেছিস?’ রঞ্জনা নিজে অন্য কথায় চলে এল।
‘হবে না আর।’
‘অ্যাঁ।’ অবাক হয়ে গেল রঞ্জনা। একটাই, ব্যস? লাইগেশন করিয়ে নিয়েছিস?’
‘হুঁ। যা দিনকাল পড়েছে একটাকে মানুষ করে তোলাই শক্ত। কালকেও তো পাড়ায় বোমাবাজি হচ্ছিল।’ সরলার চোখে বিরক্তি ফুটে উঠল।
‘এ আর কি এমন, দু-তিন বছর আগে যা হত তা দেখলে তো তোর হাত-পা পেটে সিঁধিয়ে যেত। বারান্দা থেকে দেখেছি ছেলেদের চ্যাংদোলা করে ধরে এই গলি দিয়ে নিয়ে যেত খুন করার জন্য। সে কি চিৎকার আর কান্না! ওরে আমায় ছেড়ে দে, আমায় তোরা মারিসনি, তোদের পায়ে পড়ছি, তোরা আমার বন্ধু, বাপ- মা, সে আরও কতকি! আমায় বাঁচান, আমায় বাঁচান বলে পাড়ার লোকেদের দিকে তাকিয়ে যেভাবে বলত। জীবনে আমি সেই মুখগুলো ভুলব না, মনে পড়লে বুকের মধ্যে কেমন যেন করে ওঠে। তুই বেঁচে গেছিস তখন তোর বিয়ে হয়নি বলে।’ রঞ্জনার মুখে দু-বছর আগের ভয় ফিরে এসেছে।
‘পাড়ার লোকেরা কিছু করত না, বাধা দিত না?’
‘হুউস’ নাক দিয়ে তাচ্ছিল্যের শব্দ বার করে রঞ্জনা বলল, ‘কে বাধা দিতে যাবে? তাহলে হয় ছোরা নয়তো বোমায় মরতে হত। কত্তা তো আমাকে একবার টান মেরে ঘরে ঢুকিয়ে বারান্দার দরজা বন্ধ করেই একটা চড় মেরেছিল। বোঝ, কলেজে পড়ায় যে লোক তারও কীরকম বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেয়ে গেছল।’
‘উনিতো বলেন এখনকার দিনে সন্তান মানুষ করে তোলা, বিশেষ করে ছেলেদের ভদ্র শিক্ষিত করে তোলা খুব কঠিন। বাইরে ওরা কী করছে, কাদের সঙ্গে মেলামেশা করছে কিছুইতো জানা যাবে না। উনিই তাই ঠিক করলেন একটাই যথেষ্ট, আর হয়ে দরকার নেই।’ সরলা স্নেহভরে একবার বিটুর দিকে তাকিয়ে তার কথা অনুমোদিত হল কিনা দেখার জন্য রঞ্জনার মুখ লক্ষ্য করল। মুখে তিক্ততা মাখানো চাহনি জানলার বাইরে। সরলা সংকোচ বোধ করল। তার কথায় এমন কিছু তো নেই যে ওর ভাবান্তর ঘটবে!
‘কি রে হঠাৎ চুপ করে গেলি?’
‘কী আবার বলব?’ রঞ্জনার নিরাসক্ত স্বর। ‘তোর ভাগ্যটা খুব ভালো। ভালো ঘর, বর, একটামাত্র ছেলে, বরের ভালো আয়, দেখতেও তুই সুন্দরী, লেখাপড়া করিস, কলেজ যাস, সংসারেও কোনো ঝক্কি ঝঞ্ঝাট নেই-একটা মেয়ের যা যা চাওয়ার সবই পেয়েছিস, সোনার সংসার। তোকে দেখে এক একসময় খুব হিংসে হয়।’
সরলা কী যে বলবে ভেবে পেল না। রঞ্জনার মুখ করুণ দেখাচ্ছে। ‘কিছু বদলায়নি, সব সেই একশো বছর আগের মতোই রয়েছে।’
‘চা খাবি?’ অবশেষে সরলা বলল।
‘না।’ রঞ্জনা উঠল। ‘সুখ ধরে রাখতে হয়, না হলে পালিয়ে যায়। এটা মনে রাখিস।’
‘সরলা আঠারো বছর সুখ ধরে রেখেছে। বছরগুলো যে কীভাবে সাঁই সাঁই করে পিছনে চলে গেল, কীভাবে তার বয়স বাড়ল, সংসারের বাড়বাড়ন্ত ঘটল তার কোনো ধারাবাহিক স্মৃতি সে ধরে রাখেনি। রাখার দরকার বোধ করেনি। আঠারো বছরে কিছুই ঘটেনি তার জীবনে। মসৃণ দিনরাতের পথ দিয়ে সে ব্যস্ত বেগে চলে এসেছে।
বিটু জন্মাবার একমাস পর লোকেশ সন্ধ্যাবেলায় একটা লোককে সঙ্গে করে বাড়ি ফিরেছিল। কী ব্যাপার?
‘বাচ্চচা হবার পর তলপেটের মাসল, ফাইবার ঢিলে হয়ে যায়। পেটটা ক্রমশ ঝুলে পড়ে। ওটাকে টাইট করে বেঁধে রাখা দরকার।’ লোকেশ তাকে বুঝিয়ে ছিল।
‘ধ্যাৎ, ঝুলে পড়বে আবার কি! এই তো ঠিকই রয়েছে।’ সরলা তলপেটে হাত রেখে বলেছিল।
‘ঠিক তুমি বলছ, আমি বলছি নেই।’ লোকেশ বলতে বলতে সরলার তলপেটে হাত রেখে খামচে ধরল। ‘আহ, লাগে, কী হচ্ছে, চাঁদু এসে পড়বে।’
‘দেখলে তো, ঢিলে হয়ে গেছে বলেই ধরা গেল। এজন্যই তোমায় কাপড়ের বেল্ট পরতে হবে। লোক এনেছি, মাপ নিয়ে বেল্ট তৈরি করে দেবে।’
সরলা মাপ দিল, বেল্ট তৈরি হয়েও গেল। হাঁটু গেড়ে বসে লোকেশ সরলার তলপেটে বেল্ট জড়িয়ে বকলেসে লাগিয়ে টানল।
‘উহহ, লাগছে।’
‘লাগুক, সারাক্ষণ টাইট করে এটা পরে থাকতে হবে। শরীরের এত সুন্দর জায়গাটা নষ্ট হলে আমি….’ লোকেশ মুখ তুলে তাকাল। সরলা তখন কী যেন ওর চোখে দেখতে পায় যাতে সে রমণীজীবন সার্থক হয়েছে ভাবতে পেরেছিল। লোকেশ ওর তলপেটে মুখ চেপে ধরে অস্ফুট স্বরে বলেছিল, ‘তোমার এই শরীরটা পাওয়া মানে ভগবানের বর পাওয়া।’
শিবেন্দ্রর তাগিদেই বিটুর কোষ্ঠী করানো হয় যখন ওর এক বছর বয়স।
হলুদ রঙের পাকানো কাগজটা খুলে সরলার চোখের সামনে ধরে লোকেশ বলেছিল, পরে পড়ে নিয়ো আগে শোন কী ভবিষ্যদ্বাণী করছে…না থাক।’ কোষ্ঠীটা আবার পাকিয়ে সে সরলার কৌতূহলকে টানটান করে দিয়েছিল।
‘থাক কেন, কোনো অমঙ্গুলে কথা আছে নাকি? আয়ু কত হবে বলেছে?’
‘বলেছে, উনআশি বছর।’
‘সরলা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ‘মাত্তর!’
‘মাত্তর মানে এটা বেশিই তো! ইন্ডিয়ানদের গড় আয়ু কত জান? এখন বাহান্ন, বাবাদের আমলে ছিল পঁয়ত্রিশ। সেই তুলনায় উনআশি তো কলকাতা থেকে হেঁটে চাঁদে পৌঁছনোর মতো সময়। আমরা তো তখন মরে ভূত হয়ে যাব।’
