‘বিয়ে তো আর এখনই হচ্ছে না। পড়াশুনোটা তো চালিয়ে যাবি।’
‘যাব। তবে বাবার বাড়িতে থেকে নয়। আমি আর দাদা এই মাসেই বাঁশবেড়েতে চলে যাচ্ছি। ওখান থেকেই কলকাতায় যাতায়াত করে পড়ব।’
‘কষ্ট হবে খুব।’
‘হোক। এম এ পাশ করার আগে বিয়ে নয় নিজে রোজগার না করতে পারলে সরলাদি, ঘরে বাইরে কোথাওই জোর নিয়ে দাঁড়ানো যায় না। আমার মাকে দেখেছি তো, সারাজীবনই বাবার ঝি হয়ে কাটিয়েছে। আচ্ছা সরলাদি, বিয়ে করতেই হবে এমন কোনো মাথার দিব্যি কি মেয়েদের দেওয়া আছে?’
সরলা শুধু স্মিতমুখে কথাগুলো শুনে গেল। রোজগার করতে না পারা বা ঝি হয়ে জীবন কাটানো ইত্যাদি কথাগুলোর খোঁচা তার মনে কিছুটা বিঁধেছে। এক সময় সেও এইভাবে কথা বলেছে, ভেবেছে। বি এ পাশ এবং চাকরি দুটোই কিন্তু আর করা হল না। মনের কলকবজাগুলো নিশ্চিন্তি আর সুখ পেয়ে জং ধরে যায় এটা সে এখন বুঝতে পারছে। তপুর ঝাঁঝ যে তার গায়েও লাগছে মেয়েটা তা বুঝতে পারছে না। প্রসঙ্গ ঘোরাবার জন্য সে বলল, ‘বাঁশবেড়ে চলে গেলে আর তো তোর সঙ্গে দেখা হবে না।’
‘হবে না কেন? কলকাতায় তো রেগুলার আসা যাওয়া করতেই হবে। তোমার বাচ্চচা হওয়ার আগে আমি যাচ্ছি না।’
ডাক্তারের আনুমানিক তারিখেই বিটু জন্মেছে। সরলার মা চেয়েছিলেন নার্সিং হোম থেকেই মেয়েকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যেতে। লোকেশ রাজি হয়নি। আবার কেন শ্বশুরের টাকা খরচ করানো! অনভিজ্ঞ নতুন মায়ের পক্ষে বাচ্চচা নাড়ানাড়ি করায় অসুবিধা হবে ভেবে সে নিজেই শাশুড়িকে বলেছিল, ‘আপনি বরং কয়েকটা দিন এসে থাকুন।’ তিনি রাজি হয়ে চারদিন মেয়ের বাড়ি ছিলেন।
তপু নার্সিং হোমে আসতে পারেনি। বিটুর জন্মের আগের দিন সে আর তার দাদা অজয় বাঁশবেড়ের বাড়িতে চলে যায়। দিন সাতেক পরে সে সরলাকে দেখতে আসে, প্লাস্টিকের ঝুমঝুমি হাতে নিয়ে। সরলা খুব খুশি হয়েছিল ওকে দেখে। তপু বেশিক্ষণ থাকেনি ট্রেন ধরার তাড়া থাকায়। যাবার সময় ঝুমঝুমিটা বিটুর মুখের কাছে নাড়িয়ে সে বলেছিল, ‘বুঝলে সরলাদি এখন একেবারে নতুন জীবন। মুক্ত স্বাধীন বলতে যা বোঝায় এখন আমি ঠিক তাই। অধীনতা শুধু এই ট্রেনের কাছে, ওর সময় ধরে এখন চলতে হচ্ছে।’
‘আমারও এবার শুরু হবে আর একটা জীবন। তবে তোর মতো মুক্ত স্বাধীন নয়।’
‘কী নাম রাখবে ছেলের?’
‘নাম ওর বাবা রাখবে, আমি এ ব্যাপারে নেই।’
‘আমাকে যদি বলো তাহলে আমি রাখব ধ্যানেশ, লোকেশের সঙ্গে মিলিয়ে।’
বিটুর নাম ধ্যানেশই রাখা হয়। তপুর দেওয়া নামটা সরলার কাছে শুনে লোকেশ বলেছিল, ‘বাহ, চমৎকার নামটা তো! আমি তো ভাবছিলুম গণেশ কি প্রাণেশ রাখব। তাহলে এটাই থাক।’
বিটুকে দেখতে জ্যাঠাইমা ও তার বড়োবউ এসেছিলেন। দুটো ফ্রক আর একশো টাকা দিয়ে ছেলের মুখ দেখলেন। দ্যাওর শিবেন্দ্রর সঙ্গে দু-চার কথা বলে, চলে যাবার আগে সরলাকে বললেন, ‘এবার একজন দিনরাতের ঝি রাখ। কলেজের পড়া আর বাচ্চচা মানুষ করা একসঙ্গে হয় না।’
‘আমিও তাই ভাবছি।’
এই সময় নীচের থেকে বালতিতে জল নিয়ে চাঁদু উঠে এল। তোমার লোক বলতে তো ওই ছেলেটা।’ জেঠিমা চোখ কুঁচকে চাঁদুকে জরিপ করে বললেন ‘ওকে তো আর বেশিদিন রাখতে পারবে না, আর তো ছোটো নেই! বাচ্চচাকে নাওয়ানো, খাওয়ানো, মোতানো, এসব কাজ বাপু বড্ড ঝামেলার, খুব নজর রাখতে হয়। তুমি একটা মেয়েছেলে রাখার কথা লোকুকে বলো।’
জেঠিমার কথা শেষ হবার পরই তার পুত্রবধূ পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সি সরযূ, বললেন, ‘আমাদের বাড়িতে বাপু অল্পবয়সি চাকর রাখার নিয়ম নেই।’
‘নিয়ম নেই মানে’, জেঠিমা তাড়াতাড়ি এর কারণ দর্শালেন, ‘বড্ড হাত টান হয় এই ছোঁড়াদের, যেমন ফাঁকি দেয় তেমনি মুখের ওপর তক্কোও করে। তা ছাড়া পাড়ার ঝিয়েদের সঙ্গে এমন সব কাণ্ড করে যে লজ্জায় পড়ে যেতে হয়। তাই ছেলেছোকরা রাখার চল নেই। তুমিই বলো বাইরের একটা মদ্দো ঘোরাফেরা করলে বউঝিদের অসুবিধে হয় না? কাপড়চোপড় গায়ে কখন ঠিক থাকে না থাকে তা কি বলা যায়?
শাশুড়ির কথা শেষ হতেই সরযূ যোগ করলেন, ‘তুমি বাপু রাস্তা দিয়ে চলার সময় ঘোমটা দাওনা এটা আমি লক্ষ করেছি। মাথায় কাপড় না দিয়ে আমরা বারান্দাতেও বেরোই না।’
‘যা বললুম, লোকুকে কিন্তু ঝি রাখার কথা বলো।’
সরলা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ল। ‘আপনার ছেলে এলেই আমি বলব।’
সরলা অবশ্য লোকেশকে কিছুই বলেনি। এরপর এক দুপুরে এল রঞ্জনা। দুটো কাঁথা আর দুটো কোলোট উপহার দিল বিটুকে। জিনিস দুটো দরকারী, সরলা খুশি হয়ে বলল, ‘এতবার ভিজেছে যে কেচে রোদ্দুরে দিতে দিতেই আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত। তোর এগুলো খুব কাজে লাগবে।’
‘নিজে করিস কেন, বাসনাকে বল মাসে দশটা টাকা বেশি দেব কাঁথাটাথাগুলো দু-বেলা কেচে দেবে।’
‘বলব। তবে চাঁদুও আমাকে খুব সাহায্য করে।’
‘তোর ভাগ্যি ভালো তাই অমন একটা চাকর পেয়েছিস। এত কাজ করে যে, আমরা তো বলাবলি করি, চাঁদু চলে গেলে তোরা খুব বিপদে পড়বি।’
সরলা হাসল। মাথানেড়ে বলল, ‘চাঁদু এ বাড়ি ছেড়ে যাবে না, কখনো যাবে না। ও নিজেই বলেছে। ওর বাপ-মা কেউ নেই। আমি দেখেছি, একটু মিষ্টি কথা, একটু স্নেহ, একটু আত্মীয়ের মতো আপন করা ব্যবহার পেলে বর্তে যায়।’
