পরদিন সে শুনেছিল জগৎ নামে তাদের চাকরটিই ছিল সেই চোর। অল্পবয়সি, বলিষ্ঠ জগৎ খুব অমায়িক ও মৃদুভাষী ছিল। চালচলন কথাবার্তা ছিল লেখাপড়া জানা লোকের মতো। লোকেশ বাড়িতে তার বালবিধবা বছর চল্লিশ বয়সের ছোটো পিসিকেও দেখতে পায়নি। বড়দার মেয়ে তারই সমবয়সি অমিতা চুপিচুপি বলেছিল, ছাদের ঘরে দেখে আয় কে রয়েছে।’ লোকেশ জানতে চেয়েছিল, কে রয়েছে? অমিতা বলতে চায়নি। সে ছাদে গিয়ে ঘরের দরজা তালা বন্ধ দেখে মাকে তখন জিজ্ঞাসা করেছিল, ঘরে কে, কাকে তালা দিয়ে রাখা হয়েছে মা তার মুখে হাত চাপা দিয়ে বলেছিল, ‘যেই থাকুক না, এই নিয়ে কোনো কথা বলবি না। বাইরের কারোর সঙ্গে একদম নয়। বললে কিন্তু জ্যাঠামশাই মেরে হাড় গুঁড়িয়ে দেবে আর ছাদের সিঁড়ি একদম মাড়াবি না।’
চার দিন পর স্কুল থেকে ফিরে সে দেখে, তাদের বাড়িতে অ্যাম্বুলেন্স গাড়ি আর পুলিশ এসেছে। পাড়ার লোক ভিড় করে বাড়ির সামনে, মেয়েরা ছাদে বারান্দায়, সদরে দাঁড়িয়ে। ছোটোপিসি ছাদের ঘরে গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে। দত্ত বাড়িতে এরপর ছোকরা কি মাঝবয়সি চাকর আর কখনো রাখা হয়নি।
বছর দশেক পর, দিনরাতের ঝি রানীবালাকে সোনার চুড়ি চুরি করার দায়ে যখন পুলিশে দেবার ভয় দেখানো হচ্ছিল তখন সে গলা চড়িয়ে বলেছিল, ‘যান যান, আমাকে আর পুলিশ মুলিশ দেখাবেন না, আমিও তাহলে আপনাদের পুলিশ দেখিয়ে দেব। ছোটো পিসিমা কী করে মরল তা কি আমি জানি না? ওর গলায় ফাঁস কে দিয়েছিল তাও আমি জানি। জগতের বিছানা থেকে রাত্তিরে কে তাকে চুলের মুঠি ধরে তুলেছিল তাও আমি জানি।’
দশ মিনিটের মধ্যে রানীবালা তার বকেয়া মাইনে আদায় করে দপদপিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছল। ও চলে যাবার পর কোনোদিন কেউ আর রানীবালা নামটা মুখে আনেনি, যেন ওই নামের কেউ এ বাড়িতে কখনো কাজ করেনি। দত্তবাড়িতে জগৎ কাজে লেগেছিল চাঁদুর বয়সেই। তাই লোকেশের বুকের মধ্যে অসুনী ছায়া ভেসে এল যখন সরলা বলল, ‘আমারও তাই মনে হয়েছিল।’
‘কি মনে হয়েছিল, সিনেমার হিরো হবার মতো চেহারা?’
‘হ্যাঁ। ওকে কেউ চাকর বলে প্রথমে বুঝতে পারে না, ভাবে তোমার ভাই কী ভাইপো।’ সরলা মুচকি হাসল বলা শেষ করে। শুনেই লোকেশের মুখ কঠিন হয়ে উঠল। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘তোমার ছেলে বা মেয়ের কাকা বলে ভাববে এরপর। তখন শুনতে কেমন লাগবে?’
‘কেমন আবার লাগবে, বহু বাড়িতে পুরোনো চাকরদের তো দাদা কী কাকা বলে সে বাড়ির ছেলেমেয়েরা। কোনো বাড়িতে পুরোনো কাজের লোক থাকাটা তো সেই বাড়ির ইজ্জত বৃদ্ধি। লোকে বুঝতে পারে বাড়ির আচার-আচরণে ছ্যাঁচড়ামি নেই, ব্যবহারে ভদ্র, উদার নইলে লোক টিকে থাকত না। দেখ না অধিকাংশ বাড়িতে ঝি-চাকর আসছে আর চলে যাচ্ছে। কাজের লোকেদের পরিবারের একজন করে নিতে পারে না বলে তো।’ মুখে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে সরলার। সরু চোখ দুটি আরও সরু হয়ে প্রায় বুজে গেছে। ‘তুমি তাহলে শ্রীমান চন্দন গড়াইকে এই পরিবারের একজন করবে ঠিক করেছ।’ লোকেশ সরলার পাত থেকে এক টুকরো সর তুলে নিল।
‘আমি তো ওকে লিখতে পড়তে শেখাব ভাবছি। অশিক্ষিত লোক নিয়ে বড্ড অসুবিধে হয়।’
‘শেখাও।’ লোকেশ উঠে পড়ল হাত ধোবার জন্য। ‘তবে বাড়াবাড়ি করো না। ও পুরুষমানুষ এই হুঁশটা যেন তোমার থাকে।’
বারান্দার অন্য প্রান্তে প্লাস্টিকের ড্রামে জল রাখা। চাঁদু দু-বেলা নীচের থেকে জল তুলে ওটা ভরিয়ে রাখে। হাত ধুয়ে লোকেশ ফিরে না আসা পর্যন্ত সরলা টেবলে বসে রইল। লোকেশের শেষ বাক্যটির তাৎপর্য বোঝার জন্য সে ভাবছে।
‘হঠাৎ তুমি ওই কথাটা বললে কেন, চাঁদু পুরুষমানুষ আমি যেন হুঁশ রাখি? আমি কি জানিনা ও পুরুষমানুষ?’
‘নিশ্চয় জান। কিন্তু তুমি এটা কি জান তোমায় দেখলেই পুরুষমানুষরা মাখনের মতো গলে যেতে শুরু করে, যেমন গলেছি আমি। বলে লোকেশ ঝুঁকে সরলার ঠোঁটে আলতো চুমু খেয়েই ভয় পাবার ভান করে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ব্যাটা আবার লুকিয়ে দেখছে না তো!’
গম্ভীর মুখে সরলা চেয়ার থেকে উঠে এঁটো বাসন সাজিয়ে রাখতে শুরু করল। ‘একেবারে মোক্ষম সময়ে চাঁদুটা ডিস্টার্ব করল। তাড়াতাড়ি এসো।’ লোকেশ চপল গলায় কথাটা বলে ঘরের দিকে যাবার সময় সরলার নিতম্বে হাত বুলিয়ে নিল। ‘কাজটা ফিনিশ করতে হবো তো।’
সরলা ভ্রু তুলে শুকনো হাসল। নিজেকে অসুখী বোধ করার কোনো কারণ বিয়ের পর থেকে সে এখনও খুঁজে পায়নি। লোকেশ কত শান্তভাবে গর্ভসঞ্চারের খবর শুনল, মেনে নিল বুঝদার স্বামী। হ্যাঁ সে সুখীই।
সরলা নার্সিং হোমে যাবার বারো দিন আগে তপু লাইব্রেরিতে বই বদলিয়ে সোজা আসে তার কাছে। দু-চারটে কথার পর বলেছিল, ‘আমাদের বাঁশবেড়ের বাড়িটা বাবা দলিল করে দাদাকে দিয়ে দিয়েছে। এই বাড়িটায় আমার বা দাদার কোনোরকম দাবিদাওয়া আর রইল না, এটা পাবে সতাতো ভাইয়েরা। দাদাকে রেডিমেড জামাকাপড়েই দোকান করে দেবে চন্দননগরে। দাদা রাজি হয়েছে।’
‘আর তোর জন্য?’
‘আমার জন্য বিয়ের টাকা আর গয়না। মেয়েদের জীবনের লক্ষ্য তো বিয়ে করা, তাই।’
‘বাড়ির অংশ?’
‘পাব না। আমার নিজের মায়ের দশভরি সোনা আর চল্লিশ হাজার টাকা আমি বিয়ের জন্য পাব।’
