‘অত জোরে মারলে!’ সরলা খাটে উঠে বসল।
‘মুখ ফাটিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। অতবড়ো দামড়া তেরো-চোদ্দো বছরের ছেলে তার কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিনা দেখছে! একটা সাধারণ বোধবুদ্ধির ব্যাপার।’
‘ওর বুদ্ধিটা খুবই কম।’
‘থাক ওর হয়ে আর তোমায় কিছু বলতে হবে না। আমি অনেকদিন দেখেছি তুমি আমি ঘরে থাকলেই নানা ছুতোয় ও ঘরে চলে আসে। লক্ষ করেছ ও তোমাকে কীভাবে দেখে? বয়সটা খারাপ, মেয়েদের অ্যানাটমি দেখার আগ্রহ তো এই বয়সেই শুরু হয়। ‘তাই বলে এভাবে মারবে? বুঝিয়ে বলতে পারতে।’
এইভাবেই ওদের বোঝাতে হয়। যাদের যা দাওয়াই তাই দেওয়া উচিত।’
‘এখন ও যদি কাজ ছেড়ে চলে যায়?’
লোকেশ কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল। তার রাগ অন্ধত্ব ত্যাগ করে ধীরে ধীরে স্বচ্ছ দৃষ্টি ফিরে পাচ্ছে। চাঁদুর মতো কাজের ছেলে যদি চলে যায় তাহলে সংসারে বিশৃঙ্খলা তো তৈরি হবেই তার এবং সরলারও খাটুনি বাড়বে। নানান মানসিক চাপ আসবে, আরাম ও শান্তি নষ্ট হবে। ঝি বা চাকর টাকা ফেললেই মেলে না। এটা স্রেফ বরাতের উপর নির্ভর করে। চাঁদুকে সে বরাত জোরেই পেয়ে গেছল।
‘যাবে কোথায় এমন সুখের চাকরি ছেড়ে দিয়ে?’ লোকেশের গলার স্বরে কিন্তু প্রত্যয় নেই। সে বুঝে গেছে চড় মারাটা ভুল হয়েছে।
‘ও হেসেখেলে যেকোনো মাড়োয়ারির বাড়িতে দেড়শো টাকা পাবে। ভাংচি দিয়ে ভাগিয়ে নেবার লোকের তো অভাব নেই। তখন তো আমাকেই কাপড়কাচা, রান্না করা আর দোকান যাওয়ার কাজগুলো করতে হবে।’ সরলা বিরক্তি দেখাতে কার্পণ্য করেনি।
লোকেশ ঘর থেকে নীরবে বেরিয়ে চাঁদুকে দোতলায় খুঁজে একতলায় গেল। রান্নাঘরে রুটি বেলছিল। মুখ তুলে লোকেশের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। চোখে আশঙ্কা।
‘উঠে আয়’।
কুণ্ঠিত ভাবে চাঁদু উঠে দাঁড়াল। লোকেশ এই প্রথম কাছের থেকে ওর মুখ খুঁটিয়ে নজর করল। রীতিমতো আকর্ষণীয় চোখ নাক, কপাল, ঠোঁট। প্রকৃত হ্যান্ডসাম, সিনেমার হিরো হতে পারবে বারো চোদ্দো বছর পর। ওর বুদ্ধিশুদ্ধি যে মোটা দাগের মুখে কিছু তার কোনো প্রতিফলন নেই। গালে লালচে ছোপ পড়ে গেছে।
লোকেশ আলতো আঙুল চাঁদুর গালে বুলিয়ে স্নেহমাখা স্বরে বলল, ‘খুব লেগেছে?’
‘না।’
‘না কি? আমার হাত জ্বলছে আর বলছিস লাগেনি? আসলে হয়েছে কি….।’ লোকেশ আড়ষ্ট হয়ে পড়ল। কেন চড়টা মেরেছে, সেটা ব্যাখ্যা করে বোঝাতে হলে চাঁদুকে যা বলতে হয় সেটা তাকে লজ্জায় ফেলে দিল।
চাঁদুকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে সে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘তোর বউদি আমাকে খুব বকল। তুই কিছু মনে করিস না, কেমন। আজ আমরা সবাই রাবড়ি খাব, যা চট করে সত্যনারায়ণ থেকে কিনে নিয়ায়।’
‘রুটি বেলে নিয়ে যাচ্ছি।’ চাঁদুকে উৎসাহিত দেখাল।
‘না না, এখুনি যা, বউদি বেলে নেবে।’
রাত্রে সরলা আর লোকেশ খাবার সময় চাঁদু দাঁড়িয়ে ছিল টেবলের কাছে। দুজনের থালায় রাবড়ি তুলে সরলা বেশিরভাগটা ভাঁড়ে রেখে বলল, চাঁদু তুই এবার খেয়ে নে, রাত হয়ে গেছে, ভাঁড়টা নিয়ে যা।’
‘তোমরা আরও নাও।’ চাঁদু নিমন্ত্রণ কর্তার ঢঙে বলল।
‘এটা তোর জন্যই আনা, আমরা তাই থেকে ভাগ বসালুম। যা নিয়ে যা। লোকেশ মিষ্টি গলায় হুকুম দিল। চাঁদু নীচে চলে যেতেই সরলা বলল, ‘ছেলেটার স্বভাবটা খুব ভালো।’
‘দেখতেও ভালো।’
‘হ্যাঁ।’
লোকেশের ভ্রু তার অজান্তেই নড়ে উঠল। চাঁদুর বয়স খুবই কম। তাহলেও…..।
‘তুমি ভালো করে ওর মুখটা দেখেছ? আমি আজ দেখলাম সিনেমায় নামিয়ে দেওয়া যায়।’
‘আশ্চর্য, আমারও একবার তাই মনে হয়েছিল।’
লোকেশ চট করে সরলার মুখ দেখে নিল। সহজ, অজটিল মুখভাব। কোনো গোপন ইচ্ছার বীজ বোনা হয়েছে কিনা তা বোঝা যাচ্ছে না। নিজেকে নিয়ে কিঞ্চিৎ অপ্রতিভ হল। এই বাতিকটা, সরলা ভ্রষ্টা হতে পারে ভাবাটা কীভাবে কেন যে মাথায় মাঝে মাঝে টিকটিক করে উঠে এখনও সে তা বুঝে উঠতে পারছে না।
ছোটোবেলা থেকে দেখেছে এই বাড়ির বউ-মেয়েরা পর্দানশীন। জেঠিমা এখনও রিকশার সামনে পিছনে পর্দা না দিয়ে চড়েন না। লেডিজ সিটে ছাড়া সিনেমা দেখে না মেয়েরা। ছোটোবেলায় অবিভক্ত বাড়িতে সে দেখেছে, বিয়ের পর জ্যাঠার বড়োছেলে মহাদেব বউ নিয়ে চৌরঙ্গিতে চীনে দোকানে খেতে গিয়ে ফিরে এসেছিল কেবিনে জায়গা না পেয়ে। পরপুরুষদের চোখের সামনে বউ খাবে এটা তিনি বরদাস্ত করতে পারেন না। রাস্তার দিকে বারান্দায় মেয়েদের পা রাখা, পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে বয়স না হলে সেটা বেহায়াপনা গণ্য হয়। আশ্চর্যের কথা, এগুলো কখনো কাউকে বলে দেওয়া হয় না, নিজের থেকেই বুঝে নেয়।
কড়াকড়ি সত্ত্বেও কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা ঘটে ছিল। লোকেশের তখন সাত বছর বয়স। একদিন মাঝরাত্রে চাপা শোরগোলে ঘুম ভেঙে দেখে ঘরে কেউ নেই। গুটি গুটি ঘর থেকে বেরিয়ে অন্ধকার বারান্দায় আসে। সারা বাড়িতে আলো জ্বলছে শুধু সিঁড়িতে আর তিনতলার ছাদের ঘর ছাড়া।
একতলায় সিঁড়ির গোড়ায় কাকে যেন মারা হচ্ছিল। ছেলেমেয়ে বউয়েরা বারান্দায় চুপ করে দাঁড়িয়ে। মেজোবউদিকে সে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করেছিল কারণটা। ‘চোর, চুরি করতে এসে ধরা পড়েছে। যা সরে যা, ছোটোদের এসব দেখতে নেই।’ মেজোবউদি তাকে ঠেলে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
