‘জামাইবাবুকেই বল না।’
‘ওরে বাবা, শুনলে নির্ঘাত খেপে উঠবে। আমার ভুলেই তো হয়েছে, কাউকে আমি এ ব্যাপারে বলতে পারব না। তোকে বিশ্বাস করি, তুই আর কাউকে বলবি না তাও জানি।’
‘সরলাদি আমার জানাশোনা ডাক্তার তো কেউ নেই তবে খোঁজ নেব। গাইনি কিনা জানি না, এক ডাক্তারের মেয়ে আমাদের সঙ্গে পড়ে কিন্তু তাকে তো কথাটা খুলে বলতেই হবে।’ অবশ্য ওরা থাকে বেলগাছিয়ায়, এখান থেকে অনেক দূরে।’
‘তোর জামাইবাবুর অনেক ডাক্তারের সঙ্গেই চেনা আছে যদি এর সঙ্গেও চেনা থাকে?’
‘অত ভাবলে চলে না। দাঁড়াও আগে আমি মেয়েটাকে বলে দেখি, এত ব্যস্ত হবার কী আছে? তুমি যা ভাবছ তাতো না-ও হতে পারে, এরকম ভুল শুনেছি অনেকের ক্ষেত্রে ঘটেছে।’
তিনদিন পর তপু খবর নিয়ে এল। এই তিনদিন সরলা কাঁটা হয়ে কাটিয়েছে। তার জীবনে এমন সংকট এই প্রথম।
‘বিকেল পাঁচটা থেকে সাতটা পর্যন্ত বসেন শ্যামবাজারে, সুদর্শন মেডিক্যাল হল নামে একটা ওষুধের দোকানে। গাইনিকলজিস্টই, কুড়ি টাকা ফী। তারপর যান বরানগরে সেখানে সাড়ে সাতটা থেকে….’
‘দরকার নেই বরানগর। তুই কিন্তু আমার সঙ্গে যাবি, যাবি তো?’ কাকুতি জানাল তপুর হাত ধরে।
‘যাব। আমি কিন্তু বলেছি তুমি আমার বউদি।’
‘ভালো করেছিস, নামটাও অন্য কিছু বলতে হবে।’
‘শান্তিসুধা…..আমার সৎমায়ের নাম।’ বলেই তপু জোরে হেসে ওঠে। ‘ওরও বাচ্চচা হবে।’
সরলা পরদিন পাঁচটার আগেই কলেজ থেকে বেরিয়ে সুদর্শন মেডিক্যাল হলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। বুক ঢিবঢিব অবশ্যই করছিল, যদি লোকেশ ট্রামে বা বাসে এখান দিয়ে যেতে যেতে তাকে দেখে ফেলে? একটা মিথ্যাকিছু বানাবার চেষ্টা করছিল তখনই তপু স্কুল থেকে এসে পড়ে।
ভিড় ছিল কিন্তু ডাক্তারবাবু সরলাকেই আগে ডেকে নেন। সৌম্য দর্শন, প্রৌঢ়, ছিপছিপে, দুই চোখে হাসি, সরলার ভরসা জেগেছিল দেখা মাত্র।
‘আমার মেয়ের কাছে কিছুটা শুনেছি, কিন্তু মা তুমি অ্যাবোর্শন চাইছ কেন সেটা আমার কাছে খুব পরিষ্কার নয়। পরীক্ষা দিতে অসুবিধে হবে?’ ডাক্তারবাবুকে চিন্তিত দেখাল। যেন সমস্যাটা তারই। সরলা এবং তপু যেসব যুক্তি দিয়েছিল ডাক্তারবাবু শুনতে শুনতে মাথা নাড়ছিলেন। ‘না মা, এগুলো কোনো কথা নয়। এত ভালো স্বাস্থ্য, বাচ্চচার মা হবার পক্ষে আদর্শ বয়েস, টাকাকড়িরও অভাব নেই। স্বামীকে বুঝিয়ে বলো। কী করেন উনি?’
সরলার আগেই তপু বলে ওঠে, ‘এঞ্জিনিয়ার। দাদা দুর্গাপুরে চাকরি করেন।’
‘শিক্ষিত, নিশ্চয় বুঝবেন। তুমি বরং ওকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলো।’
‘বলব।’ সরলা মাথা নামিয়ে বলেছিল। ‘তোমরা মা হতে এত অনিচ্ছুক হও কেন? লেখাপড়ার জন্য তো সারাজীবনই পড়ে রয়েছে। এখন তাজা শরীর, তাজা মন, ছেলেমেয়েকে গড়ে তোলার জন্য পরিশ্রমের এটাইতো বয়স।’ কথাগুলো বলার সঙ্গেসঙ্গে ডাক্তারবাবু তার নাম লেখা প্যাডের কাগজে খসখস করে কী সব লিখছিলেন। ‘তোমার নাম?’
তপু কিছু বলার আগেই সরলা বলল, ‘আমার নাম, সরলা দত্ত। তপু ক্ষণিকের জন্য অবাক হয়ে, মাথা হেলিয়ে অনুমোদন জানায়।
এরপর ডাক্তারবাবু কাগজটা হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ইউরিন পরীক্ষার রিপোর্টটা তাকে দেখাতে তিনি ফী নিতে অস্বীকার করেন।
ফিরে আসার সময় তপু বলে, ‘ডাক্তারবাবুর সঙ্গে আমি কিন্তু একমত।’
সরলা কথা বলেনি। তার মনে হচ্ছিল, জীবনের একটা অধ্যায় আজ শেষ হল। বিয়ের দিনও যা মনে হয়নি আজ সেটাই মনে হল, বউ হওয়ার থেকে মা হওয়া অনেক বড়ো ব্যাপার। বড়ো হওয়াই তার পছন্দ।
সেদিন রাতেই সে লোকেশকে জানিয়ে দিল। অবাক হয়ে কয়েক সেকেন্ড সরলার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে নীচু গলায় সে বলে, ‘তুমি নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল মারলে। আমার কিছু বলার নেই।’
‘এক্সটার্নাল হয়ে পরীক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করব।’
‘দেখ।’
সরলার মনে হল, এখন থেকে তাদের মধ্যে আগের সর্ম্পকটা বোধহয় থাকবে না। লোকেশ যদি এখন ঠান্ডা মেজাজে, বিরক্ত না হয়ে ব্যাপারটা গ্রহণ না করত তাহলে সে স্বস্তি পেত।
‘তুমি যদি না চাও তাহলে কোনো নার্সিং হোমে ব্যবস্থা করে তো চুকিয়ে ফেলা যায়।’
খাটে আধশোয়া লোকেশ খবরের কাগজটা চোখের সামনে তুলে পড়তে শুরু করে। সরলাকে উত্তর দেয়নি। তার মন এখন হালকা, ভারমুক্ত, শিথিল। সরলার কলেজ যাওয়া বন্ধ হবে, এটাই তাকে প্রসন্নতায় ভরিয়ে দিচ্ছে। সে কখনোই চায়নি তার বউ একা বাড়ির বাইরে যাক এবং অজস্র পুরুষের চোখের দ্বারা ধর্ষিতা হয়ে ফিরে আসুক। যা দিনকাল পড়েছে, কে বলতে পারি সত্যি সত্যি তা ঘটে যাবে না?
খবরের কাগজটা নামিয়ে সে দেখল, সরলা ছলছল চোখে তার দিকে তাকিয়ে পায়ের কাছে বসে রয়েছে। সে হেসে, ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে সরলাকে টেনে বুকের কাছে এনে বলল, ‘এসে পড়েছেই যখন তাহলে আসুক। ফিরিয়ে দিলেও তো পরে আবার আসবে।’ মিনিট দুই পর সরলা বলল, দরজাটা আগে বন্ধ করে দাও।
লোকেশ উঠতে গিয়ে দেখল দরজায় চাঁদু দাঁড়িয়ে। এইমাত্র এসে পড়েছে বলে তার মনে হল না। নিশ্চয় এতক্ষণ ধরে দেখছিল। সরলার উরু থেকে সায়া নামিয়ে দিতে দিতে লোকেশের মাথায় রক্ত চড়ে গেল। দ্রুত এগিয়ে গেল এবং চাঁদুর গালে প্রচণ্ড চড় কষাল। টলে গিয়ে চাঁদু দেয়ালে ধাক্কা খেল। ‘হারামজাদা’। দাঁত চেপে লোকেশ বলল এবং দরজার পাল্লা সশব্দে ভেজিয়ে দিল। ‘দিল মেজাজটা নষ্ট করে।’
