‘বাবাকে বলিস না?’
‘হুঁউউ।’ তপু নাক দিয়ে বাতাস ঝেড়ে দিল মুখটা অবজ্ঞায় বেঁকিয়ে। ‘আমার সৎমা-র বয়স এখন বছর তিরিশ, একটা গতরও আছে। তোমার মতোই সেক্সি।’
সরলা সন্ত্রস্ত বোধ করল। এমন কথা লোকেশের মুখে শুনলে একরকম লাগে কিন্তু তপুর মুখ থেকে একদমই রোমাঞ্চ লাগবে না।
‘গতরটা তিনি সারাদিন খাটান সংসারে। আর রাতে বাবা কাছে।’ তপুর মুখভাব বদলে গেছে। অনেক দিনের জমানো ক্রোধ বার করার চেষ্টায় মুখে হিংস্রতা ফুটে উঠেছে।
‘বাবা সম্পর্কে এভাবে বলতে নেই তপু।’
‘খুব আছে। আমাকে বলে কিনা নোংরা চরিত্রের? আমি প্রেম করেছি তো কারোর ক্ষতি করে নয়? বাচ্চচা বাচ্চচা ভাইবোনেরা নাকি খারাপ হয়ে যাবে, কী বোঝে ওরা? বাবা যেমন অশিক্ষিত, আনকালচার্ড, তার থেকেও বেশি এই মেয়েমানুষটা। ক অক্ষর গোমাংস, বাপটা মুদির দোকানে কাজ করে। জানো সরলাদি, বাবাকে দিয়ে আমাকে মার খাইয়েছে!’
‘স্কুলে পড়া বন্ধ করে দিয়েছিল?’
‘হ্যাঁ। শেষকালে দাদার সঙ্গে বাবার কথা হয়। সম্পত্তির অংশ আমাদের দেবে না তবে দাদাকে একটা দোকান করে আলাদা করে দেবে আর আমার বিয়ের খরচ দেবে। ওই বাড়ির সঙ্গে আমাদের দুজনের চিরকালের মতো কোনো সম্পর্ক থাকবে না। দাদাও বলে, তপুকে স্কুলে পড়তে দিতে হবে, বাড়ির বাইরে যেতে দিতে হবে। আমিও লিখে দিয়েছি, হ্যাঁ লিখে দিয়েছি কখনো কোনো ছেলের সঙ্গে মিশব না যতদিন বাবার বাড়িতে থাকব।’
তপুর কথাগুলো শেষের দিকে মন্থর ও ক্ষীণ হয়ে আসছিল। সরলা দেখল ওর দু-চোখে জল টলটল করছে।
‘তা সেই ছেলেটি এখন কী বলছে? তুই একেই বিয়ে করবি তো? বয়স কত, কী করে?’
তপু নিঃশব্দে হাসতে শুরু করল। ‘সরলাদি তুমি সত্যিই সরলা। স্কুলের দু-তিনজনের কাছে শুনলাম, সে এখন একটা মেয়ের সঙ্গে ঘুরছে। কয়েকমাস আমায় দেখেনি তো! বি এ পাশ, রেডিয়োয় রবীন্দ্রসংগীত গায়, দেখতে ভালোই তাই প্রেমে পড়েছিলুম। মাধ্যমিকে কোনোরকমে সেকেন্ড ডিভিশন হয়েছে তবে এখন আমি পড়াশুনোয় মন দিয়েছি। এম এ পাশ করতেই হবে।’
‘তোর কথা শুনে প্রথমে মনেই হচ্ছিল না যে, তুই এত সিরিয়াস।’
‘তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল আমাকে তুমি অন্য কিছু ধরে নিয়েছ, বাজে টাইপের, তাই না?’
সরলা হেসেছিল, অকপটেই সে বলে, ‘তুই অমুর বন্ধু তো তাই পিল টিল নিয়ে তোর সঙ্গে কথা বলাটা উচিত মনে হয়নি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তুই অনেক ম্যাচিওরড। তুই যদি রোজ আসিস আমার খুব ভালো লাগবে। ওর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব, দেখবি, তোরও খুব ভালো লাগবে। ও খুব উদার আর মডার্ন।’
সেদিন রাত্রে সরলা খেতে খেতে লোকেশকে তপুর কথা বলেছিল। লোকেশ মন্তব্য করে ছিল, ‘বার্থ কন্ট্রোলের মতো ব্যাপারগুলো খুবই পার্সোনাল, প্রাইভেট। এসব নিয়ে বাইরের লোকের সঙ্গে আলোচনা কেউ করে না।’
সরলা অপ্রতিভ হয়ে যায়। বলে, ‘আমি অবশ্য কিছুই বলিনি। শুধু বলেছি, বি এ পাশ করার আগে জনসংখ্যা বৃদ্ধি করব না।’
লোকেশ পাতলা হেসে বলেছিল, ‘মনে থাকে যেন।’
এর তিন মাস পরই সরলা জানাল সে সন্তানসম্ভবা। ভয়ে সে সিঁটিয়ে ছিল কয়েক দিন। লোকেশকে খবরটা জানাতে ভরসা পায়নি। সে হিসেব করে দেখেছে, বি এ ফাইনাল পরীক্ষার পাঁচমাস আগে তাকে মা হতে হবে। পরীক্ষার জন্য তৈরিই বা হবে কী করে? কলেজে যাওয়াও তো বন্ধ করতে হবে শেষের কয়েকটা মাস। বাচ্চচা সামলে পড়ার কাজ ঝঞ্ঝাটের মধ্যে তখন করে ওঠা যাবে না। ফেল করতেই হবে। এর থেকে লজ্জার আর কি হতে পারে! পাশের রঞ্জনাদের বা জ্যাঠামশাইদের বাড়িতে তার কলেজে যাওয়া নিয়ে যে ঠোঁট বাঁকিয়ে কথাবার্তা হয় সেটা তার কানে এসেছে ঠিকে ঝি বাসনা মারফত। এই পাড়ায় কলেজে যাওয়া বউ একজনও নেই।
সরলা খুবই মুষড়ে পড়ে ছিল। ভুলটা নিশ্চয় তারই। প্রত্যেক সন্ধ্যায় সে বড়ি খায়। নিশ্চয় কোনোদিন সে ভুলে গেছল। তার মনে হল, যেদিন অ্যাকাডেমিতে থিয়েটার দেখতে যাবার জন্য তাড়াহুড়ো করে বিকেলে বেরিয়েছিল সেইদিন খাওয়া হয়নি। এই ভুলের কথা শুনলে লোকেশ যে কী প্রচণ্ড রাগবে!
সে তপুকে বলে, ‘তোর চেনাজানা কোনো ডাক্তার আছে, লেডি ডাক্তার?’
‘কেন, কী হয়েছে তোমার?’
‘একবার দেখাতাম। কীরকম যেন লাগছে। মনে হচ্ছে…….।’
তপুর উদবিগ্ন মুখে অতঃপর হাসি ছড়িয়ে পড়ে। ফিসফিস করে বলে, ‘নতুন মানুষ আসার গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছ?’
‘ঠাট্টা করিস না, আমার অনেক কিছু নির্ভর করছে এর উপর। এখন আমার বাচ্চচা হলে খুব ক্ষতি হবে। তোর জামাইবাবু তো চায়ইনা, আমিও চাই না। আছে তোর জানাশোনা কেউ?
কী করবে? অ্যাবোর্শন?’
শব্দটা ধাক্কা দিয়েছিল সরলাকে। কেমন একটা অনৈতিক লজ্জাকর অপরাধের ছোপ লাগানো রয়েছে।
জন্ম থেকে সে শুনে এসেছে : ‘এসব কাজ যারা করে তাদের চরিত্রের ঠিক নেই। ভদ্দরঘরের মেয়েরা পেট খসায় না।’ কিন্তু যে বিড়ম্বনায় এখন সে পড়েছে তাই থেকে রেহাই পেতে হলে আর কী পথ খোলা আছে?
‘আর কী করতে পারি?’
‘দরকার কী? হোক না বাচ্চচা’ তপুর স্বরে প্রচ্ছন্ন মিনতি ছিল।
‘না, না, এখন এসব নয়। আমার বি এ পরীক্ষা তাহলে আর দেওয়া হবে না। একবার ড্রপ করলে জীবনে আর আমার বি এ পাশ করা হবে না। দ্যাখ না রে তোর কেউ চেনা ডাক্তার আছে কি না।’
