সরলা খুবই অবাক হয়ে গেছল। তপু তার বাপের বাড়ির পাড়ার মেয়ে, ছোটোবোন অমলার বন্ধু। মাঝে মাঝে তাদের বাড়িতে আসত। তপুর বাবার রেডিমেড জামাকাপড়ের দোকান আছে নিউমার্কেটে। মধ্য বয়সে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আবার বিয়ে করেন। প্রথমপক্ষের এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়েটি তপু। বিয়ের পর বাড়ি বিক্রি করে অন্যত্র কোথায় বাড়ি কিনে তপুরা পাড়া ছেড়ে চলে যায় পাঁচ বছর আগে। সরলা তারপর আর তপুকে দেখেনি এবং ওকে মনেও রাখেনি।
সরলার মনে হল, পাঁচ বছরে মেয়েটা অনেক বড়ো হয়ে গেছে তো বটেই মুখও কিছুটা বদলেছে। তপু বেশ সুন্দরই হয়েছে। ওকে শাড়ি পরা এই প্রথম দেখল।
‘তপু তুই এখানে?’
‘আমরা তো এখানেই থাকি, সমাজপতি রোডে চব্বিশের বি বাড়িতে। তুমি এখানে?’ বলতে বলতেই তপুর চোখ পড়ল সরলার সিঁথিতে। ‘তোমার বিয়ে হয়ে গেছে?’
‘আমার শ্বশুরবাড়ি দুর্গাদাস মিত্র লেনে, আঠারোর এক।’
অনেক লোক দাঁড়িয়ে তালিকা দেখতে চাইছে। ওরা দুজন সরে এল জায়গা ছেড়ে দিয়ে।
‘কবে তোমার বিয়ে হল?’
‘একমাসও হয়নি। তুই আয় না। আমাদের বাড়িতে লোক এত কম যে হাঁফ ধরে যায়। আমরা কত্তা-গিন্নি, শ্বশুর আর একটা কাজের ছেলে। তুই এখন কী করছিস, স্কুলে না কলেজে?’
‘স্কুলে। ইলেভেনে পড়ছি। একটা বছর পড়া বন্ধ ছিল।’
‘কেন?’
‘সে অনেক ব্যাপার। একদিন যাব তোমাদের বাড়ি, আঠারোর-এক তো? জামাইবাবুর নাম কী?’
‘লোকেশ দত্ত। এলে বিকেলে আসিস। সকালে খুব ব্যস্ত থাকি, কত্তার অফিস, আমার কলেজ, বুড়ো শ্বশুরকে দেখা।’
দু-দিন পর তপু এল। পুরোনো দিনের গল্প কিছুক্ষণ করার পর সরলা বলল, ‘তোর একবছর পড়া বন্ধ ছিল বললি, কেন?’
‘বাড়ি থেকে বেরোন বন্ধ ছিল বলে।’
‘কেন?’
‘মায়ের হুকুম। আমি নাকি খারাপ হয়ে গেছি, আমার জন্য ছোটোভাই-বোনেরা খারাপ হয়ে যাবে, তাই আমাকে ভালো করতে বন্দি রাখার ব্যবস্থা হয়।’
‘কী করেছিলি?’
‘প্রেম।’ তপু স্বচ্ছন্দে বলল সরলার চোখে চোখ রেখে। বরং সরলাই অস্বস্তিতে পড়ল। হাজার হোক সে ওর বন্ধুর দিদি, এসব কথা মুখের উপর বলে দেওয়াটা আশোভন তাই, বড়োদের সম্মান নষ্ট হয়। মনে মনে ক্ষুণ্ণ হলেও সে কৌতূহল ধরে রাখতে পারল না।’
‘কে?’
‘একটা ছেলে ছাড়া আবার কে?’ তপু ঝরঝর হেসে উঠল।
চা নিয়ে এল চাঁদু। হাফ প্যান্ট আর বুশ শার্ট পরা, গৌরবর্ণ, সুদর্শন কিশোরটির দিকে তপু কৌতুকভরে তাকিয়ে বলল, ‘আমি নীচে জিজ্ঞেস করলুম এখানে লোকেশ দত্ত থাকেন? ও খুব গম্ভীর মুখে বলল, ‘হ্যাঁ, আপনার কি দরকার তাকে?’ বললুম, তার বউয়ের সঙ্গে দরকার। বলল, ‘বউদি কলেজ থেকে এসে বিশ্রাম নিচ্ছেন।’ বললুম, শুয়ে আছেন? বলল, ‘না পাশের বাড়ির বউয়ের সঙ্গে গল্প করছেন জানালায় দাঁড়িয়ে।’ বোঝ সরলাদি এই হল তোমার বিশ্রাম নেওয়া! আমার এত হাসি পেল জ্যাঠামশায়ের মতো ওর বলার ধরন দেখে।’
সরলাও হাসল। ‘চাঁদু বয়সের তুলনায় একটু পাকা, তাই না রে চাঁদু?’
মুখ গম্ভীর করে চাঁদু বলল, ‘দাদার জন্য খই আনতে হবে, পয়সা দাও।’
সরলা হাত ব্যাগ থেকে ওকে টাকা দিল। যাবার সময় বিরক্ত চোখে চাঁদু তার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘গল্প করাটা বিশ্রাম না তো কি?’
জোরে হেসে উঠে তপু বলেছিল, ‘সরলাদি ওকে প্রথম দেখে মনে করেছিলুম তোমার দ্যাওর ট্যাওর হবে। ভদ্দরলোকের ছেলের মতোই দেখতে। পেলে কোত্থেকে?’
‘তোর জামাইবাবুই জোগাড় করেছে, এসেছে মাস ছয়েক, তারকেশ্বরের দিকে বাড়ি ষাট টাকা মাইনে। আমার সঙ্গেও জ্যাঠামো করে কথা বলে তবে একদমই গবেট, মাথায় বুদ্ধি বলে কিসসু নেই।’
‘একদিক দিয়ে ভালোই, চালাকচতুর হলে তো এতদিন থাকত না।’
‘খাওয়ার লোভ নেই, টাকাকড়ির ব্যাপারেও হাতটান নেই।’
‘এ তো সোনায় সোহাগা! একটু তোয়াজে রেখো।’
‘তোর জামাইবাবুও এই কথা বলে। কী যে তোয়াজ করব, আমি তো ভেবে পাই না। এই পাশের বাড়ির বউ রঞ্জনা, বছর তিন বিয়ে হয়েছে, একটা বাচ্চচা, বলছিল একটা দিনরাতের ঝি দেখে দিতে।’ যে ছিল সে বেশি মাইনেতে কাজ পেয়ে চলে গেছে। তবে শাশুড়ি ননদরা আছে বলে আসুবিধে হচ্ছে না।’
‘তোমার কি অসুবিধে হবে।’
সরলার লাজুক হাসি যোগ দিল তপুর মিটমিট চোখের সঙ্গে। ‘আমার এখন ওসব হবে টবে না। অন্তত বি এ পরীক্ষার আগে তো নয়ই।’
‘পিল খাচ্ছ?’
সরলা থতমত এবং ক্ষুণ্ণ হল। তপু তার বয়স এবং সম্পর্কের এলাকার বাইরে এসে সখীর মতো হতে চাইছে। মলিকে তার মনে পড়ল। এসব কথা ওর সঙ্গেই বলা যায় কিন্তু মলি আসব বলে একদিনও আসেনি।
তপুর প্রশ্নটা এড়াবার জন্য সে বলল, ‘কাল কেক কিনে এনেছে দাঁড়া তোকে দিই।’
তাড়াতাড়ি সরলা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। লোকেশ শ্বশুর চাঁদু, কলেজ আর সংসার চব্বিশ ঘণ্টা ভরিয়ে রাখার পক্ষে যথেষ্ট। তাহলে অনেকগুলো ফাঁক থেকে যায়। রঞ্জনা বাইরে থেকে মাত্র তিন বছর বউ হয়ে এই পাড়ায় এলেও, বহু বাড়ির হাঁড়ির এবং শোবার ঘরের খবর রাখে। সে একটা ফাঁক ভরাট করে দেয়। কিন্তু ওর কাছে মন খুলে নিজের প্রাণের খবর দেওয়া যায় না। দিলেই পাড়ায় চাউর হয়ে যাবে। কিন্তু মলির সঙ্গে সব কথা বলা যায়।
কেক-এর প্লেট তপুর হাতে দিয়ে সরলা বলে, ‘তোরা তো এক ভাই এক বোন?’
‘ছিলাম। এখন আরও দুই অর্থাৎ, টোটাল চার এবং এটার সঙ্গে আরও যোগ হবে। আমার এই সৎমা-টি একখানা চিজ। ফিল্মে যেরকম সৎমা দেখা যায় ইনি ঠিক তাই। দাদাকে আর আমাকে যতরকমে পারে হেনস্থা করে। আমরা বাইরের লোকের মতো বাড়িতে থাকি। খাওয়া-পরার মতো ছোটোখাটো তুচ্ছ ব্যাপারেও এত নীচতা দেখায় যে, মাঝে-মাঝে ইচ্ছে করে বাড়ি ছেড়ে কোথাও চলে যাই।’
