সরলা চুপ করে থাকে।
‘কী হল, বললে না তো ভালোবাসবে কিনা?’
অকস্মাৎ সরলা নিজেকে লোকেশের দেহের উপর তুলে উপুড় হয়ে ছড়িয়ে দিয়ে, দু-হাতে মুখটি ধরে তীব্র আবেগে তাকে চুমু খেতে শুরু করে। ব্যাপারটা অপ্রত্যাশিত ছিল। লোকেশের কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল সরলার কাছ থেকে প্রথম চুম্বন পাওয়ার সুখ অনুভব করার জন্য।
ধীর, আপাত শীতল, নম্র স্বভাবের সরলার এহেন তপ্ত আবেগ তাকে মাদকতা এনে দেয়। কিন্তু চুম্বনের ধরনটিতে কেন জানি তার মনে হল, সরলার এটিই প্রথম চুম্বন নয়। যেভাবে তার মুখগহ্বরের মধ্যে জিভটা ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেভাবে ওষ্ঠ এবং অধর কামড়ে ধরছে, লোকেশ তাতে অভিজ্ঞতার ছোঁয়া পায়। অন্তত তার তখন মনে হয় প্রথমবারের জড়তা, আড়ষ্টতা এতে নেই।
লোকেশের মাথার মধ্যে টিকটিক করে একটা সন্দেহের কাঁটা ঘুরতে শুরু করা মাত্রই সে থামিয়ে দিয়েছিল। এখন অন্য কোনো চিন্তা নয়। একটি সুগঠিত কোমল দেহ তার শরীর ঢেকে ছড়িয়ে রয়েছে, একে যথাযোগ্যভাবে উপভোগ করার জন্য নিজের মধ্যে আবেগ সঞ্চার করানো দরকার। কুটিল সন্দেহের ঘড়িটা চালিয়ে রেখে একশো ভাগ সুখ সংগ্রহ করা যায় না। সুতরাং লোকেশ তাদের প্রথম রাতটিকে রমণীয় করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে।
দু-সপ্তাহ পর, সরলা তখন সংসারে গৃহিণীরূপে অধিষ্ঠ হয়ে গেছে, সকালে তাড়াতাড়ি স্নান সেরে উঠে আসতেই লোকেশ জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়।
‘আজ কলেজ যাব।’
লোকেশ ভ্রূ কুঁচকে বলে, ‘আর ক-টা দিন যাক না।’
‘দুপুরে একা একা ভালো লাগছে না।’
‘এতদিন কলেজ কামাই করলে-‘
‘এত তাড়াহুড়োর কি আছে? বি এ পাশ না করলেও কিছু আসে যায় না। চাকরি তো আর করতে হবে না। কয়েকটা দিন বরং চাঁদুর সঙ্গে ক্যারম খেল কিংবা পাড়ার লাইব্রেরির মেম্বার হয়ে যাও।’
‘বই পড়ে কি সময় কাটে? বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা বলা, ক্লাস করা আর চাঁদুর মতো বোকা নিরেটের সঙ্গে বসে ক্যারাম খেলে সময় কাটানো কি এক হল?’
লোকেশ আর কথা না বলে গালে জল মাখিয়ে শেভিং ক্রিম লাগাতে ব্যস্ত হয়। বন্ধুবান্ধবী না বলে বন্ধুবান্ধব বলল কেন? একবারের জন্য তার মনে প্রশ্নটা ভেসে উঠেই ডুবে যায়। সঠিক বললে, জোর করে সে ডুবিয়েই দিল। তখন সে নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বলেছিল, একটা বদঅভ্যাস দেখছি আমার মধ্যে তৈরি হচ্ছে। আজেবাজে সন্দেহ করাটা বাতিক হয়ে উঠলে তো জীবনে শান্তি পাওয়া যাবে না! লোকেশের অনুশোচনা প্রকাশ পেল তার কথায়, ‘কলেজ থেকে কিন্তু তাড়াতাড়ি ফিরবে।’
সরলা উদ্ভাসিত মুখে মাথা কাত করে ‘হ্যাঁ ফিরব’ বলেই জানতে চাইল, ‘এ পাড়ায় লাইব্রেরি আছে নাকি? মেম্বার করিয়ে দিয়ো তো।’
‘খুব পুরোনো লাইব্রেরি, জ্যাঠামশাইরা যখন স্কুলে পড়ত তখন পাড়ার ক-জন ছেলে মিলে শুরু করে আমাদেরই এই নীচের ঘরটায়।’ একতলায় রাস্তার উপর ঘরটায় কোচিং চালাচ্ছেন এক স্কুল শিক্ষক। ভাড়া দেন দেড়শো টাকা।
ব্রাশ ঘষে গালে ফেনা তৈরি করতে করতে লোকেশ বলল। ‘বাড়ি পার্টিশানের সময় ওটা উঠিয়ে নিয়ে যায় সমাজপতি রোডে, দুলাল স্যাকরার একতলার দুটো ঘরে। তখনই প্রায় হাজার দুয়েক বই। এখন কত হয়েছে কে জানে, হাজার আট-দশ হয়তো হবে।’
‘তুমি মেম্বার হওনি কখনো?’
ছিলুম। স্বপনকুমার পড়তুম। উপন্যাস গল্প ভালো লাগে না, ভ্রমণ কাহিনি পড়তে ভালো লাগে। তোমাকে বিয়েতে কে যেন ইংরিজি একটা বই দিয়েছে, মনে হল সমুদ্রে নৌকোয় অভিযানের ব্যাপার নিয়ে লেখা।’
বইটা ভালো করে দেখিনি এখনও। ইংরেজি পড়তে অসুবিধে হয়, সব কথার মানেও বুঝি না। কেন যে দিল। ষাট টাকা দাম।’
‘কে দিয়েছে?’ বাঁ হাতটা মাথার উপর দিয়ে ঘুরিয়ে ঝুলফিতে আঙুল চেপে লোকেশ সেফটি রেজারের প্রথম টানটা দিল।’
‘প্রণব। আমাদের সঙ্গেই পড়ে।’
লোকেশ দ্বিতীয় টান দিতে গিয়ে থেমে গেল। ‘তোমার বন্ধু?’
‘হ্যাঁ। ওর সঙ্গে রেখার প্রেম, মাস ছয়েক হল। রেখাও এসেছিল। ও একটা পেতলের অ্যাসট্রে দিয়েছে।’
লোকেশ দ্বিতীয় টান দিয়ে বলল, ‘ধরেই নিয়েছে আমি সিগারেট খাই।’
‘বাইরের লোকজনের জন্য দরকার হবে।’
‘হ্যাঁ। এবার তো একটা বাইরের ঘর দরকার হবে। শঙ্করবাবুকে বলতে হবে কোচিংটা এবার অন্য কোথায় সরিয়ে নেবার ব্যবস্থা করুন।’
‘বললেই কি ঘর জোগাড় করতে পারবে?’
‘আহা, চেষ্টা শুরু করুক। এখন থেকে করলে ছ-মাসের মধ্যে কি পাবে না? আর মানুষটাও খুব ভদ্র। যাকগে এসব, তুমি দেখ চাঁদুটা রান্নাঘরে কী করছে।’
লোকেশ আঠারো বছর আগে সরলাকে অরুণোদয় পাঠাগারের মেম্বার করে দিয়ে ছিল। আর সেখানেই তার দেখা হয় তপুর, তপতীর সঙ্গে।
বই, লেখককে নাম ও সংখ্যা লেখা ছাপা ক্যাটালগটা একটা দড়ি দিয়ে ‘কাউন্টারের কাঠের গরাদে বাঁধা। ক্যাটালগ যারা কেনেনি তারা এটা দেখেই বই বাছাই করে রিকুইজিশান স্লিপে লেখে। নতুন বইয়ের নামের তালিকা কাগজে লিখে দেয়ালে সেঁটে দেওয়া হয়। সরলা মুখ তুলে নতুন বইয়ের নাম পড়ছিল। তার পাশে আরও কয়েকজন যাদের সে লক্ষ করেনি। তখন প্রায় ফিসফিস করে তার ঠিক পিছনেই একজন বলে ওঠে, ‘সরলাদি না!’
সে চমকে পিছনে তাকায়। এ পাড়ায় কে তাকে সরলাদি বলল? কয়েক সেকেন্ড মুখটার দিকে তাকিয়ে সে বলেছিল, ‘তপু না?’
