ফল হল এই, আজ আঠারো বছর ধরে সরলা নিজেকে সুখী ছাড়া আর কিছু ভাবার সুযোগ পায়নি। লোকেশ একাগ্র মনে পাঁচিল তোলার কাজ চালিয়ে গেছে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুরা ও প্রতিবেশীরা বলে সরলার সুখের সংসার। সে-ও বিশ্বাস করে তার সংসারে কোনো অপূর্ণতা নেই। একটা নিম্নবিত্ত ঘরের বাঙালি মেয়ের যা কিছু কাম্য। তার পাওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু একটা জিনিস সে জানত না, তার স্বামী আঠারো বছর ধরে কাঁটা হয়ে আছে একটি ব্যাপারে, কখন তার স্ত্রীর স্ফূরণ ঘটবে!
লোকেশ অপেক্ষা করে আছে, কখন ঘটনাটা ঘটবে!
বিয়েটা ধুমধাম করে হয়নি আবার নমো নমো করেও নয়।
লোকেশের নিমন্ত্রণ তালিকায় প্রথমেই ছিল দুই জ্যাঠামশাই অমৃতলাল ও নৃত্যলালের পরিবারবর্গ। শিবেন্দ্রলাল, মাথা, বুক ও পায়ের নানান ব্যধিতে জীর্ণ শরীর নিয়ে ছেলের বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে গেছলেন দাদাদের বাড়িতে। পাশাপাশি সদর। একটাই ছাদ তাতে দুটো পাঁচিল তুলে তিনটে ভাগ করা। অমৃতলালের বাড়িতে গিয়ে বউদি, দুই ভাইপো মহাদেব ও সুদেব, তাদের বউদের এবং যে ক-টি নাতি-নাতনিকে সামনে পেলেন যথাযোগ্য ভাবে বরযাত্রী হবার জন্য ও বউভাতে আসতে বললেন। নৃত্যলাল চারমেয়ের বাবা। চারজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। বুড়োবুড়ি স্বামী-স্ত্রীর এখানে সংসার। ওরা নিমন্ত্রণ পেয়ে খুশি হলেন।
সামনের বাড়িতে তিনঘর ভাড়াটে। বাড়িওলা বঙ্কুবিহারী ছাড়া আর কারোর সঙ্গে পরিচয় নেই। শিবেন্দ্র তাকে নিমন্ত্রণ করলেন। দুর্গাদাস মিত্র লেনে বহু ভাড়াটে, তাদের কাউকেই তিনি চেনেন না। সুতরাং নিমন্ত্রণ করার কথাই ওঠে না। শুধু পুরোনো চার-পাঁচ ঘর বাসিন্দাকে পত্র দিয়ে আসেন।
লোকেশ তার অফিসের কয়েকজন ছাড়া আর কাউকে বলেনি। পাড়ায় তার বন্ধুস্থানীয় কেউ নেই। আত্মীয়স্বজনদের অবশ্য সে নিজে গিয়ে বলে এসেছে। কাজের সূত্রে যেসব দোকানে বা ভাণ্ডারদের কাছে যেতে হয়, নার্সিং হোমে বা হাসপাতালে ঘুরতে হয় লোকেশ সযত্নে তাদের তালিকা তৈরি করে নিমন্ত্রণ করে ছিল। প্রায় দুশো লোক বউভাতে খেয়েছে, বরযাত্রী গেছল জনা কুড়ি।
মনোমালিন্য এবং চাপা নিন্দামন্দ যতই দুই বাড়ির মধ্যে থাকুক না কেন, লোকেশের বড়ো জেঠি-বিয়ের আচার অনুষ্ঠান ভার নিজ হাতে নিয়ে, বরণ করে বউ ঘরেও তুলেছিলেন এই বলে, ‘হাজার হোক লোকু দত্ত বংশেরই তো ছেলে।’ তবে বরযাত্রীতে জ্যাঠার বাড়ির বয়স্করা কেউ যায়নি। নতুন জুতো জামা আর প্যান্ট পরা চন্দন বরের টোপর হাতে নিয়ে মোটরে লোকেশের সঙ্গে কনের বাড়িতে গেছল।
‘সেলফ মেইড’ লোকেশ তার কথা রেখে ছিল। শ্বশুর বাড়ি থেকে সে একটি কুটোও নেয়নি। শিবেন্দ্র আট খানি নমস্কারি শাড়ি চাওয়ায় সে বলেছিল, ‘এসব সংস্কার বন্ধ হওয়া উচিত। সাধারণ গেরস্ত পরিবার, যদি একশো টাকা করেও এক-একটা শাড়ির দাম হয়, তাহলে আটশো টাকা, এতে ওদের উপর কতটা চাপ পড়বে তা কী বুঝতে পারছ?’
শিবেন্দ্র অসহায়ভাবে বলেছিলেন, ‘লোকু এটা মানমর্যদার ব্যাপার। ওরা ভাববে ভিখিরির ঘরে ছেলের বিয়ে দিয়েছি।’
ওরা মানে তার দুই দাদার পরিবার। লোকেশ আটটি তাঁতের শাড়ি কিনে এনে বাবার অথবা শ্বশুরবাড়ির মর্যাদা রক্ষা করে ছিল। হাজারখানেক টাকা এজন্য খরচ হলেও যে আত্মপ্রসাদ সে বোধ করে তারই জের ফুলশয্যায়ও আছড়ে পড়ে।
‘তুমি কি জান, তোমাকে প্রথম কীভাবে দেখেছিলুম?’
‘জানি, মলি বলেছে।’
‘তোমার গায়ে শাড়ি ছাড়া আর কিছু ছিল না।’
‘সেইজন্যই পছন্দ হল?’
‘এইট্টি পার্সেন্ট সেজন্য।’
সরলা তৃপ্ত হয়েছিল কথাটা শুনে। কিছুক্ষণ পর কথায় কথায় লোকেশ বলে, ‘পয়সাওলা ঘর থেকে অনেক সম্বন্ধ এসেছিল। অনেক কিছু দেবে বলেছিল।’
মিথ্যা কথাটা কেন যে বলল, লোকেশ পরে ভেবে দেখেছিল। মাথামুণ্ডু খুঁজে পায়নি। একটি মেয়ের কাছে নিজেকে মহৎ বীর করে তোলার জন্য ছেলেরা অনেক কিছু বানায়। কিন্তু এই ধরনের সাজানো বীরত্বে তার কোনো দরকার আছে কি?
সরলা বলেছিল, ‘তাহলে ওখানেই বিয়ে করলে না কেন?’
‘তোমাকে দেখার পর আর কাউকে বিয়ে করা যায় কি?’ জবাবটা ভালোই হয়েছিল কেননা পুলকিত সরলা তাহলে কোমরে চিমটি কাটত না। নিজেকে আর একধাপ তোলার জন্য তখন লোকেশ বলে, ‘আমি সাধারণ এক মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ, পৈতৃক বিষয়- সম্পত্তি বলতে এই বাড়িটা, বয়স একশো পেরিয়ে গেছে। জানলা দরজার অবস্থা দেখে বুঝতে পারছ টাকার অভাবে সারানো কি রংকরা হয়নি। তবু এই বিয়ের সব খরচ আমিই করেছি, তোমাদের কাছ থেকে কিছুই নিইনি। এমনকী নমস্কারি শাড়ি পর্যন্তও নয়।’
‘জানি।’ সরলা কৃতজ্ঞতা জানাতে লোকেশের বুকে মাথা রাখে। ‘সবাই বলেছে আমার ভাগ্যটা খুব ভালো, নইলে কী এমন স্বামী পায়! আমিও চেয়েছিলাম এমন একজনকে যে খুব উদার হবে, আধুনিক হবে।’
‘শুধুই এই?’ লোকেশ তার উচ্ছ্বাস দমন করতে গিয়ে শ্বাসকষ্টে পড়ে গেছল।
‘এখন পর্যন্ত এই, তারপর তো আস্তে আস্তে আরও জানতে পারব।’
‘কী কী জানার আছে?’
‘অনেক কিছু। এসব তো টোয়েন্টি পারসেন্ট, বাকি এইট্টি হল আমার মতো একটা পাঁচপাঁচি দেখতে মেয়েকে কেমন ভালোবাসো, কদ্দিন ভালোবাসো সেটাই।’
‘ভালো শুধু আমিই বাসব আর তুমি শুধু ভালোবাসা নেবে, দেবে না?’
