‘তারু ছবিটায় আমার সিঁথেয় সিঁদুর দিতে বলিস তোর বউকে। আর তোলা উনুনটার শিকগুলো যেন ফেলে না দেয়। বলতে ভুলিস না। মনে থাকবে তো? কাশী মিত্তির ঘাট থেকে পাঁচ সিকি দিয়ে কিনেছিলুম।’
ফুলশয্যার রাতে রেণুকে বলেছিলাম মা-র ইচ্ছে ছিল ছেলের বউ তাঁর শাশুড়ির ছবিতে সিঁদুর দেয় যেন। রেণু ছবিটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে, ‘সতী সাবিত্রী ছিলেন তাই সিঁদুর বজায় রেখে চলে গেলেন।’ রেণুকে তছনছ করে যখন পিষতে শুরু করি একটা অদ্ভুত আওয়াজ ওর মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, শেষ দিকে যেভাবে যন্ত্রণায় মা কাতরাত। মনে পড়া মাত্রই বিরক্তি হয়-ছবিটা এ-ঘরে টাঙানো রয়েছে কেন? কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ছবির কথা ভুলে যাই। রেণুর মুখ থেকে গোঙানি শোনার ইচ্ছেটা তখন প্রবল বেগে শরীর তোলপাড় করছিল। পরের দিন মনে হয়েছিল, ছবি শুধুই ছবি। ওগুলো টাঙিয়ে রাখা হয় শুধু মন খচখচ করানোর জন্য। অতীতকে জীইয়ে রাখে ব্যর্থ লোকেরা। যদিও আমি এগারোজনের টিমে আসতে পারিনি তবু ছবি তোলার সময় ওদের সঙ্গে দাঁড়াবার সুযোগ পেয়েছিলাম। এ ছবি টাঙিয়ে রাখার মধ্যে গৌরব কোথায়?
সেদিন শেষরাতে বেশ শীত পড়েছিল, তাই বাবা যখন ঠেলে তুলল বিরক্তিতে লেপটা ছুড়ে ফেলে খিঁচিয়ে বলেছিলাম, ‘তা আমি কী করব?’
‘ডাক্তারবাবুকে ডেকে আন আর বলিস একটা ডেথ সার্টিফিকেটও যেন লিখে নিয়ে আসেন।’
বাবা এত আস্তে কথা বলতে পারে জানতাম না। কুয়াশায় আবছা রাস্তা দিয়ে ডাক্তারের বাড়ি যেতে যেতে মনে হয়েছিল এইবার টুয়েলফথ ম্যান সেজে দাঁড়িয়ে থাকার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি নেব। ভাবতেই শরীর গরম হয়ে এসেছিল। শীত করেনি আর। মা-র জন্যই পারিনি, এবার পারব। মারা গেলেই ছবিটা খুলে ফেলা যাবে, কেউ বারণ করার রইবে না।
অথচ আজও খোলা হয়নি! গড়িমসি ছাড়া আর কী। দোকানটার সামনে পায়চারি করতে করতে তারক আপনমনে বলল, বাধাটা কোথায়? তবে ঢুকে পড়ায় কেন গড়িমসি করছি! রোগটা যখন জানা হয়ে গেছে, শুধু তো ইঞ্জেকসান নেওয়ারই অপেক্ষা।
কিন্তু দোকানে বসা লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছে নিশ্চয় মিথ্যাবাদী আর পরশ্রীকাতর। বাসে টিকিট কাটে না। বাজারে ওজন নিয়ে ঝগড়া করে। বউ জানলায় দাঁড়ালেই খেঁকায়। রাস্তায় ঝিয়েদের জঞ্জাল ফেলার সময় হলে রকে এসে বসে-তারক এইসব অনুমান করতে করতে কয়েকবার ভিতরে তাকাল। একটিমাত্র খদ্দের কীসের একটা কৌটো কিনে চলে গেল। তারক ভাবল এইবার ঢুকলে কেমন হয়। এই সময় একটি বৃদ্ধাকে ঢুকতে দেখে সে আর এগোল না।
ঘড়ি দেখে, খানিকটা হাঁটল উত্তর দিকে। সিনেমা ভাঙা ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ধাক্কা খেল। আবার ফিরে এল দোকানটার সামনে। একটিও খদ্দের নেই। লোকটা গালে হাত দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে পা দোলাচ্ছে তাইতে থলথলে ভুঁড়িটা কাঁপছে। কড়ে আঙুল মুখে ঢুকিয়ে পানের কুচি বার করে আঙুলটা তুলে দেখল তারপর জিভ দিয়ে কুচিটা টুক করে তুলে আবার চিবোতে লাগল।
তারক ভাবল এইসব লোক কৌতূহলীও হয় খুব। যদি বলে বসে হয়েছে কী? ইন্দ্র ভটচাজ দাদ সারাতে কি পেনিসিলিন নিয়েছিল? যদি বলে ‘কই দাদটা দেখি?’ ডাক্তারি করার সুযোগ পেলে এই সব লোক ছাড়ে না। কুঁচকিতে ফোঁড়া হলে নিশ্চয়ই দেখানোর কথা উঠবে না। বলা যায় না, পা দোলাতে দোলাতে হয়তো বলবে, ‘তার জন্য তো কেউ পেনিসিলিন নেয় না।’ কুতকুতিয়ে তাকাবে আর মুচকে হাসবে। দরকার নেই, অন্য অনেক দোকানই তো রয়েছে।
তারক কিছুটা হেঁটে আর একটা ওষুধ দোকান পেল। কাউন্টারের বাইরে দুটো লোক চেয়ারে বসে। হয়তো মিকশ্চার তৈরি করতে দিয়েছে। কম্পাউন্ডারের মতো কাউকে দেখা যাচ্ছে না। যে লোকটা খাতা খুলে হিসেব মেলাচ্ছে বা কসছে সে নিশ্চয় মালিক। কে কীজন্য পেনিসিলিন নিচ্ছে তাই নিয়ে একদমই মাথা ঘামাবে না। শুধু চোখের সামনে নোট তুলে জলছাপ দেখে সিকি-আধুলি কাঠের উপর বাজিয়ে নিয়ে আবার হিসেব কষতে শুরু করবে। লোকটা নিশ্চয় ছেলেদের জন্য মাস্টার রেখেছে। ছেলেগুলো নির্ঘাত স্কুল পালিয়ে ট্রামের হ্যান্ডেল ধরে ঝোলে। বউ হপ্তায় তিন দিন ম্যাটিনি শোয়ে সিনেমা দেখে। কিন্তু কম্পাউন্ডারটা কোথায়? সুইং ডোরটার ওধারেই নিশ্চয়ই আছে। মিকশ্চার বানাতে কত সময় লাগে? ইচ্ছে করেই দেরি করে ওরা। কিন্তু লোকটা জানে না এই দেরি করার জন্যই একটা ইঞ্জেকসানের খদ্দের সে হারাতে চলেছে। একটা টাকা পেত। তাই দিয়ে আধ কিলো চাল কিনে কিংবা কোবরেজি কাটলেট খেয়ে আজ বাড়ি ফিরতে পারত।
তারক ঘড়ি দেখে আবার হাঁটতে শুরু করল। একটা দোকানে দেখল বেশ ভিড়। ডাক্তারকে ঘিরে অনেকগুলো মেয়ে-পুরুষ বসে। তারকের খুব পছন্দ হল কাউন্টারে বসা লোকটিকে। ময়লা শার্ট, কাঁচাপাকা চুল, চোয়ালটা ছড়ানো, গালভাঙা, গলাটা অসম্ভব সরু। বলামাত্র নিশ্চয় সিরিঞ্জটিরিঞ্জ বার করতে শুরু করবে। সে ঠিক করল এর কাছেই নেবে।
ঢোকবার আগে আশপাশ দেখে নিতে নিতে তারকের চোখে পড়ল অফিসের একটা লোক। নামটা মনে করতে পারল না তবে নীচের তলায় বসে। মুখচেনা। রাস্তায় উবু হয়ে ব্লাউজ পছন্দ করছে। ওষুধের দোকানটার সামনেও ফেরিওলা। নিশ্চয় এখানে এসেও উবু হবে, তারপর এধারেও তাকাবে। যেই দেখবে ইঞ্জেকশন নিচ্ছি অমনি একগাল হেসে নিশ্চয় বলবে, কী ব্যাপার, হল কী আপনার?
