‘বলা হয়ে গেছে! কখন? যাচ্চচলে, আমি তো শুনতেই পেলুম না!’ মলি অবাকই হয়ে গেছিল। ‘এই সরি, বলেছে?’ জবাব না দিয়ে সরলা মুখ ঘুরিয়ে থুতনিটা ডানকাঁধে রেখে শুধু হেসেছিল।
‘আমারও জানতে ইচ্ছে করছে, ওনার পছন্দ হয়েছে কিনা।’ কথাটা বলে লোকেশ কৌতুকভরে সরলার দিকে তাকায়। সেকেন্ড দশেক নৈঃশব্দ বিরাজ করে তিনজনকে ঘিরে। তারপর মুখটা ধীরে ধীরে বাঁদিকে ঘুরিয়ে গভীরভাবে লোকেশের চোখে চোখ রেখে সরলা হেসেছিল। বিয়ের পর একদিন কথায় কথায় লোকেশ বলেছিল, ‘হাসিটা ছিল অনেকটা মোনালিসার মতো। কিছুই বোঝা যায় না।’
কিন্তু লোকেশের সেদিন মনে হয়েছিল শুধু পছন্দই নয় সরলা ইতিমধ্যে ভালোওবেসে ফেলেছে। মনে হওয়াটার মধ্যে অবশ্যই বাড়াবাড়ি ঘটে গেছল, কেননা প্রথম দেখার কয়েক মিনিটের মধ্যে ভালোবেসে ফেলা, একটি সাবালিকার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু তখন লোকেশের মানসিক অবস্থা যেমন হয়ে রয়েছিল তাতে সে ওইরকমই কিছু চেয়েছিল। হয়তো অল্পবয়সে বাংলা ফিল্ম প্রচুর দেখার বা একধরনের পুজো সংখ্যার উপন্যাস বিস্তর পড়ে ফেলার জন্য তার মধ্যে ভালোবাসা বিষয়ে লঘু ধারণা তৈরি হয়েছিল। তবে আঠাশ বছর বয়সি উন্নতি অভিলাষী, পরিশ্রমী লোকেশের মতো যুবক যদি মনে করে শ্রীময়ী কোন যুবতী তাকে দেখামাত্রই ভালোবেসে ফেলবে তাহলে তাকে মাপ করে দিয়ে শুধু বলা যায়, বাপু হে একটু রয়ে সয়ে, ভালোবাসা ছেলের হাতের মোয়া নয়।
সেদিন লোকেশ মলির সপ্রশ্ন দৃষ্টির জবাবে বলেছিল, ‘আমিও উত্তর পেয়ে গেছি।’
‘কীভাবে?’ মলি উত্তর পাবার জন্য আগ্রহ দেখাল। কিন্তু সে দুজনের চাহনি ও হাসি লক্ষ করে বুঝে ফেলেছে, বিয়েটা হচ্ছেই।
লোকেশ অর্থপূর্ণ হেসে প্রসঙ্গ বদলায়। ‘বিয়ের পর মেয়েরা লেখাপড়া চালিয়ে গেলে আমার আপত্তি নেই।’
সরলা তখন বলেছিল, ‘যদি চাকরি করতে চায়? করবে। তবে স্বামী যদি ভালো আয় করে, বাচ্চচাকাচ্চচা যদি থাকে, তাহলে চাকরির দরকার কী? আমার তো মনে হয়, ঘরসংসারটাই ভালো করে মেয়েদের করা উচিত। ওটাই তো আসল জায়গা যেখান থেকে সুখ আর দুঃখ তৈরি হয়। তা ছাড়া চাকুরে মেয়েদের দেখেছি কেমন যেন নীরস, শুকনো দেখায়, ইমোশান কমে যায়, রোমান্টিক মন আর থাকে না, বাস্তববাদী হয়ে পড়ে। বউ এমন হয়ে যাক এটা আমি চাইব না।’
‘এত মেয়ে চাকরি করছে, সবাই কি এমন হয়ে যায়?’
সরলার মৃদুস্বরের মধ্যে তর্কের ইচ্ছা নেই, ছিল যুক্তির জন্য আবেদন। লোকেশ চুপ করে গেছিল কিছুক্ষণ। তার মনে হয়েছিল, সরলার শুধু মনই নয় একটা মাথাও আছে আর সেটাকে ব্যবহারও করে। তার আরও মনে হয়েছিল, তাদের দুজনের চিন্তা বহু ব্যাপারে হয়তো মিলবে না।
লোকেশ তখন সরলার জিজ্ঞাসা এড়িয়ে হালকা গলায় বলেছিল, ‘একটা দরকারী কথা জানিয়ে দেবার আছে, আমি জীবনে কখনো কোনো মেয়ের সঙ্গে প্রেম করিনি, আমার কোনো প্রেমিকা ট্রেমিকা নেই।’
কথাটা বলে সে মুখ টিপে হাসতে থাকে আর অপেক্ষা করে। এইবার সরলাও তাহলে বলবে-আমারও কোনো ছেলের সঙ্গে কখনো প্রেম হয়নি, প্রেমিক ট্রেমিক নেই। কিন্তু সরলা কিছুই বলল না, শুধু একটু হাসল মাত্র। লোকেশ বুঝতে পারছে না, হাসিটাকে সে কীভাবে নেবে। না প্রেমিক নেই, ছিল কিন্তু এখন নেই, আছে কিন্তু সিরিয়াস কিছু নয়, গভীরই তবে লোকেশের মতো স্বামী পেলে ভুলে যেতে রাজি। কিন্তু সে এই একটা ব্যাপারে আপোস করতে রাজি নয়, সরলাকে তার যতই ভালো লাগুক না কেন। সে ওর কাছ থেকে স্পষ্ট শুনতে চায়, কখনো প্রেম করেছে বা এখনও করছে কি না? শতকরা একশো ভাগ বিশুদ্ধ টাটকা প্রথম প্রণয়ের শরিক সে হতে চায়।
‘কী ব্যাপার, আপনি চুপ করে রইলেন যে?
‘কী বলব? একটা মেয়ে স্কুল কলেজে পড়লে, রাস্তা দিয়ে হাঁটাচলা করলে অনেকেই তো তার সঙ্গে কথা বলতে, মিশতে চাইবেই।’
‘মিশেছেন?’
‘না।’ লোকেশ আশ্বস্ত বোধ করলেও মনের মধ্যে একটা অস্বস্তির কাঁটা ফুটে গেল। সত্যি বলল কি? এই ব্যাপারে কখনো কি কেউ সত্যিকথা বলে? এই রকম প্রশ্ন করাটাই তো বোকামি। হাজার হাজার মেয়ে প্রেম করার পর বাপ-মার ধরে দেওয়া পাত্রকে বিয়ে করেছে, স্বামীকে সুখী করেছে, সুন্দরভাবে ঘরসংসারও করেছে। এতে কারুরই তো কোনো ক্ষতি হয় না।
তখন এইসব ভেবেই লোকেশ নিজেকে প্রবোধ দিয়েছিল বা সামলাবার চেষ্টা করে ছিল। কিন্তু তার চেতনার গভীরে ঘড়ির মতো কী যেন একটা টিকটিক করে চলে আসছে আজ আঠারো বছর ধরে। সন্দেহ? ঈর্ষা? অন্য কিছু? লোকেশের মাঝে মাঝে মনে হয়েছে সরলার মতো আকর্ষণীয়া দেহের মেয়েকে তার বিয়ে করা উচিত হয়নি। ও যদি মানবের বোন মলির মতো বেঁটে বা মোটা হত, একবার দেখেই চোখ ফিরিয়ে নেবার মতো মেয়ে হত, তাহলে সে নিশ্চিত হতে পারত, তাহলে মনের অনিশ্চিত এই টিকটিকানিটা বন্ধ থাকত।
আসলে লোকেশ ভয় করে সরলার দেহের মাদকতাকে। সে নিজে যখন মত্ততা বোধ করেছে, তার দৃঢ় ধারণা অন্য পুরুষরাও তাই করবে। তারা চাইবে ওর মন জয় করে দেহটা অধিকার করতে। তা যদি হয় তাহলে সেটা তার পৌরুষত্বের পক্ষে বিরাট হার বলে গণ্য হবে। তার মনে হয়েছিল, এক্ষেত্রে উচিত সরলার মনের চারধারে একটা পাঁচিল তুলে দেওয়া। ওকে সুখে শান্তিতে স্বস্তিতে রাখলে, ওর ইচ্ছা অনিচ্ছাকে মান্য করলে, আবদার অভিমানকে প্রশ্রয় দিলে এবং হৃদয়ে অধিষ্ঠিত একমাত্র রমণী এই ধারণাটি অবিরত ওর কাছে পৌঁছে দিলে পাঁচিলটা তৈরি হয়ে যাবে। তাতে এমন কোনো ছিদ্র থাকবে না যার মধ্যে দিয়ে কোনো পরপুরুষ গলে আসতে পারবে কিংবা সরলা উঁকিঝুঁকি দিয়ে বাইরে তাকাবার সুযোগ পাবে।
