বিয়ের আগে সরলা একবার মাত্র লোকেশকে দেখেছিল। এই দেখিয়ে দেওয়ার কাজটি করেছিল মলি। দেশবন্ধু পার্কের পশ্চিম ফটকে ব্যাগ হাতে লোকেশ অপেক্ষা করেছিল, সরলাকে কলেজ থেকে নিয়ে আসে মলি। যখন দূর থেকে তাকে হেঁটে আসতে দেখল লোকেশ তখন বুকের কাছে টাইটা আঁকড়ে ধরে টানতে থাকে। বিহ্বলতা বা মুগ্ধতা নয়, সে মাথার মধ্যে জ্বলুনি বোধ করছিল। তাকে অপছন্দ করবে এমন অযোগ্য সে নয়, এই ধারণাটা অবশ্য লোকেশের ছিল, কিন্তু ওর কোনো প্রেমিক তো থাকতে পারে! হয়তো সরলা নামক এই ফুলটি অনাঘ্রাত নয়!
লোকেশ ব্যাগটা জমিতে রেখে নমস্কার করে তার সাজানো দাঁতগুলো ঝলসে দিতেই সরলা থতমত হয়ে কোনোরকমে দুই মুঠি বুকের কাছে জড়ো করে। ভাবী স্বামীর সঙ্গে মৌখিক পরিচয় এবং দর্শন করিয়ে দেবে, এই বলেই মলি ওকে এনেছে। সুতরাং আচমকা সাক্ষাৎ নয়। লোকেশের ভ্রু একবার কুঁচকে উঠেছিল সরলার এই প্রতিক্রিয়ায়। এইরকম সময় বহু মেয়েই নার্ভাস হয় ঠিকই, কিন্তু যদি ওর কোনো প্রেমিক থাকে, তা হলে এই থতমতানিটাকে নার্ভাসনেস বলা যাবে না। লোকেশ এইরকম চিন্তা মাথায় নিয়ে আবার হেসে বলেছিল, ‘আমার নাম লোকেশ দত্ত, এটা নিশ্চয় জানেন। আপনার নামও আমি জানি। চলুন পার্কে কোথাও বসা যাক।’
তারা বেঞ্চে নয়, লোক চলাচল কম অঞ্চল, পার্কের পুব দিকে ঘাসের উপর বসেছিল। এইরকম পরিস্থিতিতে কীভাবে, কী বিষয় নিয়ে কে কথাবার্তা শুরু করে প্রাথমিক জড়তাটা কাটিয়ে তুলবে, সেটাই হয়ে ওঠে আসল কাজ। মলি যেহেতু তৃতীয় পক্ষ, সরলার সখি স্থানীয়া, কথা বলতে এবং হাসিতে খুশিতে থাকতে ভালোবাসে তাই কাজটা সে-ই নিল।
‘আপনারা চুপচাপ কেন, কথা বলুন? যার যা প্রশ্ন করার আছে করুন। আমি বরং একটু ততক্ষণ ঘুরেটুরে বেড়াই।’ মলি উঠে পড়ার উদ্যোগ করল।
‘না, না, বোস।’ সরলা হাত টেনে ধরল।
‘না কেন?’ মলি ধমকে উঠল। ‘কী সব জিজ্ঞেস করবি বলেছিলি, কর।’
‘হ্যাঁ করুন না।’ লোকেশ বলল খুবই সহৃদয় ভরসা দিয়ে। ‘বিয়ে হবে কি হবে না, এখনও সেটা পাকা নয়। মানে, এখনও আপনি আমায় অপচ্ছন্দ করে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।’
সরলার বিব্রত মুখে ঘাম এবং রক্তচাপ দেখা গেল। মুখ নামিয়ে সে ঘাস ছিঁড়ল। মলি ওর কানে কানে বলল, ‘কেমন দেখছিস? পছন্দ হয়েছে?’
‘অসভ্যতা করিস না।’ চাপা গলায় সরলা ধমকায়।
‘তা হলে বলে দিই পছন্দ হয়েছে?’ মলি এবার একটু জোরেই বলল লোকেশকে শুনিয়ে। পুলকিত লোকেশ তখন না শোনার ভান করে মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে রইল দূরের বাড়িগুলোর দিকে।
‘লোকশদা, সরি বলছিল’, মলি সেকেন্ড পাঁচেক নীরব থেকে আবার বলল, ‘আপনি ক-টা ছেলেমেয়ের বাবা হতে চান?’
সরলা হতভম্বের মতো দুজনের দিকে তাকিয়ে তারপর মলির বাহুতে প্রচণ্ড চিমটি কেটে বলে, ‘কী হচ্ছে তোর, এইসব কথা কখন আমি বললুম তোকে?’
‘মাস দুই আগেই তো বলেছিলি।’ মলি এবার লোকেশকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘ওদের বাসনমাজার ঝি আরতির মা-র আটটি ছেলেমেয়ে, আবার একটা হবে। সরিই আমাকে বলেছিল-বাব্বা পারে কী করে! আমি হলে তো মরেই যেতুম। স্বামীটার কি মায়াদয়া নেই? একটা কি দুটোর বেশি কিছুতেই আমি হতে দেব না। … তা হলে বলুন আমি কি অন্যায় কিছু জানতে চেয়েছি?’
কথাটা এমন একটা বিষয় নিয়ে লোকেশের তাতে মজাই লাগল। অচেনা তরুণীর সঙ্গে আদিরস ঘেঁষা কথাবার্তায় মন্দ কী, বিশেষত বিয়ে যখন হবেই। হ্যাঁ, লোকেশ বুঝে গেছে সরলার তাকে প্রথম দর্শনেই ভালো লেগেছে।
‘এটা তো জানতে চাওয়া স্বাভাবিকই।’ লোকেশ হালকা স্বরে সমর্থন করল মলিকে। ‘আমিও তো এই প্রশ্নটাই করতুম, অবশ্য ওনার এ বিষয়ে আলোচনায় আপত্তি থাকতে পারে।’
‘কেন?’ মলির জিজ্ঞাসা।
‘বাহ, আমি তো সম্পূর্ণই বাইরের লোক। এই সব ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার কথা উনি আমার সঙ্গে কইবেন কেন?’
‘কেন কইবে না? কলেজে পড়ে, টিউশনি করে, ট্রামে বাসে চড়ে, বাইরের লোকেদের সঙ্গে কথা বলার অভ্যেস আছে।’
‘কিন্তু তাদের সঙ্গে ক-টা ছেলেপুলে চান, এই ধরনের কথা কি উনি বলেন?’
‘তারা আর আপনি কি ওর কাছে সমান?’
‘কেন নয়? আমি তো এখনও জানিই না, টোপর পরার অনুমতি পাব কি না! তারপর তো বাবা হওয়ার প্রশ্ন উঠবে।’ লোকেশ মিটমিট হাসতে লাগল সরলার দিকে তাকিয়ে।
‘আপনার পছন্দ হয়েছে সরিকে?’
লোকেশ সোজা সরলার মুখের উপর চোখ রাখল। ঘাড় নীচু করে সরলা ঘাসে হাত বুলোচ্ছিল। হাতটা এবার অনড় হয়ে গেল। উত্তর শোনার জন্য ওর মনপ্রাণ নিবদ্ধ হয়ে রয়েছে বুঝতে পেরে লোকেশ চুপ করে নিঃশব্দ হাসিতে মুখ ভরিয়ে ফেলল। সে প্রত্যাশা করছে, উত্তর না পাওয়ার কারণ জানতে সরলা মুখ তুলে একবার তার দিকে তাকাবে। তাকাবেই।
এবং তাকিয়েছিল। এখনও, আঠারো বছর পরও সেই সভয় উৎকণ্ঠা আর আকুলতা মেশানো সরলার চকিত চাহনিটা ছবির মতো তার স্মৃতিতে টাঙানো রয়েছে। অতীতের বহু ঘটনা ধুলো জমে অন্তরালে চলে গেছে। বহু কথা নীরব হয়ে গেছে। কিন্তু তার দিকে প্রার্থনার মতো তাকানো সরলার মুখ, জীবনে সেই প্রথম লোকেশকে ভালোবাসায় অবগাহন করিয়ে দেয়।
মলি আবার বলেছিল, ‘পছন্দ হয়েছে কি না বলুন না।’
‘তোমায় বলব কেন? যার শোনার, তাকে বলা হয়ে গেছে।’ লোকেশ তার গলায় আবেগ ও রহস্য মিশিয়ে ছিল।
