বিজ্ঞাপন দেওয়া আর হয়নি। বেরিয়ে আসার সময় গোবরা বলেছিল, ‘বিয়েতে নেমন্তন্ন করিস।’
এরপর কফি হাউসে বসে লোকেশ জিজ্ঞাসা করেছিল মানবকে, ‘গোবরার কাছে তুই কেন এসেছিলি?’
‘ধরাধরির ব্যাপার। একটা ছোট্ট খবর দিয়েছিলাম, আমাদের পাড়ায় রক্তদান শিবিরের উদ্বোধন করেছি, চল্লিশজন রক্ত দিয়েছে। দশদিন হয়ে গেল এখনও বেরয়নি। তাই গোবরাকে ধরতে এসেছি, ও যদি চিফ রিপোর্টার কী আর কাউকে বলে দু-লাইন বার করাতে পারে। বিজ্ঞাপনে থাকলেও ওদিকে চেনাজানা তো থাকতে পারে।’
‘এইসব খবর বের হলে তার কোনো লাভ হয়?’
‘হয়। শুধু তো পাবলিকেরই নয়, নেতাদেরও চোখে পড়ে। রাস্তায় রাস্তায় বক্তৃতা করে জীবন শেষ করার জন্য তো আর রাজনীতিতে আসিনি। নিজের ঢাক নিজে না পেটালে কেউ আমার দিকে তাকাবে না। উপরে উঠতে হলে অনেক কিছু করতে হয়। যাকগে এসব কথা, তুল কাল-পরশুই চলে আয়।’
‘যাব। একটা কথা জানা হয়নি, সোনার বেনে তো?’
‘তা না হলে তোর জন্য বলব কেন! ওরা মল্লিক।’
লোকেশ দু-দিন পর হাজির হয়েছিল। তখন সকাল এগারোটা। মানব বাড়ি ছিল না। মলি বলল, ‘তাতে কী হয়েছে, আমিই আপনাকে মেয়ে দেখিয়ে দেব। লুকিয়ে দেখবেন তো ছাদে চলুন আর কাছের থেকে দেখতে চান যদি তা হলে ডেকে আনছি। না না সরিকে কিছু জানাব না।’
প্রথমে দূর থেকে দেখাই ভালো, এক ঝলকেই যদি পছন্দ না হয়, তা হলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সৌন্দর্য আবিষ্কার করেও কোনো লাভ নেই। এই সিদ্ধান্তে এসে লোকেশ ছাদের থেকে দেখাই সমীচীন বোধ করল।
ছাদের একধারে তারে শাড়ি শুকোচ্ছে। লোকেশ তার আড়ালে শুধু চোখ দুটি বার করে দাঁড়াল। মলি অন্য ধারের পাঁচিল থেকে চেঁচিয়ে ডাকতেই উত্তর এল, ‘দিদি, কলঘরে কাপড় কাচছে।’ লোকেশ উঠোনে একটি তরুণীকে দেখতে পাচ্ছে। অবশ্যই সরলার বোন, না হলে দিদি বলবে কেন!
মেয়েটি মোটামুটির থেকে অনেক উপরে, প্রায়-সুন্দরীর পর্যায়ে। প্রত্যাশায় টানটান হয়ে উঠল তার স্নায়ু।
‘খুব দরকার রে রুমি, সরিকে একবার উঠোনে আসতে বল না রে।’
কলঘর থেকে সরলা বেরিয়ে এল। দেহে আবরণ বলতে শুধু শাড়িটি। হাঁটুর নীচে জবজবে ভিজে। দু-হাতে সাবানের ফেনা মাখা। তালুর উলটো পিঠ দিয়ে কপাল থেকে চুল সরাতে সরাতে সে উপরে মুখ তুলল। সায়া, ব্লাউজ, ব্রেসিয়ার ছাড়া পাত্রী দেখার সৌভাগ্য অনেকেরই হয়, তাতে অনেকেই হর্ষ-রোমাঞ্চ বোধ করে, অনেকে মুহূর্তেই বিয়েতে সম্মত হয়ে যায়। লোকেশ নিজের ইন্দ্রিয়সমূহের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার উপর ভরসা রাখতে পাচ্ছে না। চোরাবালির মতো ডুবিয়েও তো দিতে পারে।
‘সরি, কখন কলেজ যাবি রে, আমার একটা জিনিস তোকে কিনতে দিতাম।’
‘কী জিনিস?’
গলা চড়িয়ে বললেও কণ্ঠস্বরটি লোকেশের ভালো লাগল।
‘শাড়ির ফলস।’
‘সাড়ে বারোটায় বেরোব, তখন নিয়ে নেব।’
সরলা কলঘরে ফিরে গেল। মিনিট খানেকের দর্শন তাতেই লোকেশের কপালে ঘাম দেখা দিয়েছিল।
‘আপনি কি কাছের থেকে দেখবেন, তা হলে একটু বসে যান।’
লোকেশ বসেনি, ঘণ্টা দেড়েক দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছিল বাসস্টপে, সরলাকে দেখার জন্য। সে দেখল চার মিটার দূরত্ব থেকে। সরলা অপেক্ষমাণদের উপর একবার চোখ ফেলেছিল, তাদের মধ্যে লোকেশও ছিল। মিনিট তিনেক পর বাস আসে, ওই সময়টুকুর মধ্যে দু-বার স্থানবদল করে সে সোজা মুখের উপর ও আড়চোখে দেহের উপর চোখ ফেলে সরলার পা থেকে মাথা পর্যন্ত কয়েকবার দ্রুত দেখে নেয়।
এই দেখার সময়ই সে ওই দেহটিতে আসক্ত হতে থাকে। প্রবল একটা আকর্ষণ, যেভাবে গ্রহদের টেনে রেখেছে সূর্য, সরলার দেহও লোকেশকে তার কামনার কক্ষপথে স্থাপন করে সেইভাবে আকর্ষিত করল।
সে সরলার সঙ্গেই বাসে উঠল। পুরুষদের জন্য বসার জায়গা নেই। লেডিস সিটে’বসা সরলার সামনে সে দাঁড়াল কিন্তু পূর্ণদৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নিল না। কেননা ইতিমধ্যে সে স্থির করে ফেলেছে, ওই দেহটি আজীবন দখলে রাখার, স্বত্বাধিকারী হওয়ার সুখ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবে না। তার চেনাজানা লোকেদের মধ্যে একজনের বউয়েরও এমন আকর্ষণীয় গড়ন নেই।
একটা ঘোর তার চেতনায় কুয়াশার মতো ছড়িয়ে যাচ্ছিল। ঝাপসা দৃষ্টিতে সে বাসের যাত্রীদের দিকে তাকাল এমন একটা ভাব নিয়ে যেন বলতে চায়, মশাইরা কেমন লাগছে আমার সামনের এই মেয়েটিকে? ও কিন্তু আমার বউ, আর কিছুদিন পরেই হবে। আমার পছন্দটা কেমন বলুন তো? আমিই এই ফুলটির শোভা দেখব, সুবাস নেব, আপনারা নন। শুধুই আমি।
সরলার পিছু পিছুই সে বাস থেকে নেমেছিল। সরলা চলেছে আর এধার সেধার দাঁড়ানো কলেজের ছেলেরা তার দিকে তাকাচ্ছে। লোকেশ বাস থেকে নেমে আর এগোয়নি। কলেজের ফটক পর্যন্ত সে চোখ দিয়ে সরলাকে অনুসরণ করতে করতে একটা জ্বলুনি বোধ করল। জীবনে এমন জ্বালা এই প্রথম। সবাই তাকাচ্ছে ওর দিকে। ঝালমুড়িওলা, চায়ের দোকানের ছোকরটা পর্যন্ত! কেন? সবাই কি ওকে চায়?
তিন সপ্তাহ পর বিয়ে হয়ে যায়।
সরলার ছোড়দা সনতকে ডাকিয়ে এনে মানব বিয়ের কথা পাড়ে। পাত্র সম্পর্কে যতটুকু জানে সেটা জানিয়ে দিয়ে বলে, ‘তোমরাও খোঁজ নাও। তবে এটুকু বলতে পারি, স্বভাবচরিত্রে, চেহারায়, বংশমর্যাদায় এমন ছেলে চট করে পাবে না। বন্ধু বলেই ভেব না, এ কথা বলছি। সবথেকে বড়ো সুবিধে কী জান, একেবারে নির্ঝঞ্ঝাট সংসার। আর বি এ পরীক্ষা? সে হয়ে যাবে’খন। প্রচুর বিবাহিতা মেয়ে কলেজে পড়ছে, সরিও পড়বে।’
