কিন্তু এনে দেবে কে? তার সঙ্গে একটি মেয়েরও প্রণয় হয়নি। না পাড়ায়, না কলেজে কোনো মেয়ে তার প্রতি হৃদয় সম্পর্কিত দুর্বলতা দেখায়নি। লোকেশকে এই ব্যাপারটা বহুদিন বিস্মিত রেখেছিল। কবিতা না লিখলেও সে ভালো কথা বলতে পারে, গায়ক বা খেলোয়াড় না হলেও সুদর্শন তবু একটি মেয়েও তার সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক পাতাতে ঔৎসুক্য দেখায়নি। সে ভেবেছিল, নিশ্চয় তার মধ্যে একটা কোনো গোলমাল রয়েছে যেজন্য এগোরার বয়সি মেয়েরাও তার দিকে এগোল না।
যাক গে, বলে লোকেশ এই নিয়ে আর মাথা ঘামায়নি। প্রেম সবার জন্য নয়, এটা কপালের ব্যাপার এমন সিদ্ধান্ত পৌঁছে সে জ্যাঠার কাছে চাকরিতে ঢুকে পড়েছিল। তারপর সে শুধু আর্থিক উন্নতির চেষ্টাই করে গেছে। দিনে ষোলো ঘণ্টা পরিশ্রম করে তার নিজের কাজের অন্ধিসন্ধি বুঝতে চেষ্টা করেছে এবং উন্নতিও করেছে।
তার গর্ব সে ‘সেল্ফ মেইড ম্যান’। এটা সে প্রায়ই বলে বিশেষ করে বিটুর সামনে। কিন্তু বিয়ের জন্য পাত্রী সংগ্রহে নেমে সে বুঝতে পারে ‘সেল্ফ মেইড’ কোনো কাজে আসছে না। এসব ব্যাপার মা-বাবা, কিংবা মাসি-পিসি, কাকি-জ্যেঠিরাই করে থাকেন। মা নেই, বাবা অশক্ত, তা ছাড়া ওঁর বোধবুদ্ধির উপরও তার ভরসা নেই। মাসিদের সঙ্গে সম্পর্কটা এমন নয় যে, তাদের বলা যায় ‘বিয়ে করব, একটা মেয়ে দেখে দাও’। পাশের বাড়ির কাউকে অর্থাৎ দুটি জ্যেঠি বা জ্যাঠাদের তো বলার কথাই ওঠে না!
তখন এক একসময় লোকেশের মনে হত, পশ্চিমবাংলা কেন, এই কলকাতাতেই কয়েক হাজার মেয়ে বর পাবার জন্য দিন গুণে চলেছে আর সে কিনা বউ জোগাড় করতে পারছে না! ওদের আত্মীয়স্বজনরা যদি একবার জানতে পারত কলকাতায় নিজের বাড়ি, একমাত্র ছেলে আর বাবার সংসার, শিক্ষিত, দেড় হাজারের উপর রোজগেরে একটা পাত্র বউ পাবার জন্য কি মুশকিলেই না পড়েছে, তা হলে আঠোরোর-এক দুর্গাদাস মিত্র লেনের দরজায় লাইন পড়ে যেত। ভেবেচিন্তে সে ঠিক করল, তার মুশকিলের কথাটা দেশবাসীকে জানাবে। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেবে।
কলেজের সহপাঠী গোবর্ধন ওরফে গোবরা চাকরি করে আনন্দবাজারের বিজ্ঞাপন বিভাগে। লোকেশ তার সঙ্গে দেখা করতে গেছিল। সে শুনেছে, ভিতরে লোক থাকলে বিজ্ঞাপনটা চোখে পড়ার মতো ভালো জায়গায় বেরোবার ব্যবস্থা নাকি করা যায়। গোবরার টেবলে পৌঁছে দেখল মানব বসে রয়েছে। ওকে দেখেই লোকেশের মনে হল, ব্যাপার কী, মানবও বিয়ের জন্য বিজ্ঞাপন দিতে এসেছে না কি!
লোকেশ প্রথমে ইতস্তত করেছিল। তারপর গোবরাকে বলেই ফেলে, ‘একটা ব্যাপারে তোর একটু সাহায্য চাই। একটা বিয়ের বিজ্ঞাপন দেব।’
‘কার বিয়ে?’
‘আমারই। বাড়িতে এমন একটা অবস্থা যে, কোনো মেয়েছেলে নেই, খুব অসুবিধে হচ্ছে।’
লোকেশের গলায় কৈফিয়ত দেবার সুর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার লজ্জাও করছিল। বিজ্ঞাপনের বয়ান লেখা কাগজটা ব্যাগ থেকে বার করছে তখন মানব বলল, ‘তুই বিয়ে করবি?’
‘হ্যাঁ।’
‘পাত্রীর জন্য বিজ্ঞাপন দিতে এসেছিস?’
‘হ্যাঁ।’
‘দিতে হবে না। আমার হাতে ভালো মেয়ে আছে।’
লোকেশের প্রথমেই মনে হল, মানব বোধহয় নিজের বোনের কথা বলবে। তা হলে তাকে খুবই অস্বস্তিতে পড়তে হবে। কেননা মলি যদিও খুব ভালো মেয়ে কিন্তু বেঁটে এবং বেঢপ। যত প্রয়োজনই থাক লোকেশ ওকে বিয়ে করতে পারবে না। সুতরাং সে কাঠ হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল মানবের পরের কথা শোনার জন্য।
‘ছোটোবেলা থেকেই দেখছি, পিছনের বাড়ির, মলির খুব বন্ধু। বি এ সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে। আমাদের বাড়িতে রোজই আসে। আর বেশ লম্বা, ফর্সাও, মজবুত স্বাস্থ্য।’ মানব ‘বন্ধুগণ’ বলে বক্তৃতা শুরু করার আদলে কথাগুলো বলল।
‘তা হলে তো ল্যাঠা চুকেই গেল।’ গোবরা চোখেমুখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচার মতো ভাব ফুটিয়ে বলল, ‘বাপের অবস্থা কেমন?’
‘ভালো নয় খুব। চার মেয়ে দুই ছেলে। বড়োছেলে স্কুল মাস্টারি করে বাইরে, অন্যটি রেলে ঢুকেছে। ভদ্রলোক ট্রামে ক্যাশিয়ার। দুটি মেয়েকে পার করতে গিয়ে হাত খালি হয়ে গেছে।’
‘তার মানে কিছু দিতে পারবেন না।’ গোবরা বরকর্তার ভূমিকা নিয়ে ফেলেছে।
লোকেশ প্রতিবাদ করে ঈষৎ উত্তেজিত স্বরে বলে, ‘দিতে পারবেন না মানে? আমি কি ভিখিরি নাকি যে, খাট, বিছানা, ঘড়ি, আংটি, বাসনকোসন কী সোফা, আলমারি, ফ্রিজ, টিভি দিতে বলব?’
‘আহা, তুই রাগছিস কেন। সমাজে এসব চলে আসছে, চলছে, বলেই বললুম।’ গোবরা কিঞ্চিৎ অপ্রভিত হয়ে গলা নামিয়ে বোঝাল সে ভুল করে ফেলেছে।
‘না, না, রাগ আমি করিনি। আমার বাবা-জ্যাঠারাও তো বিয়েতে প্রচুর নিয়েছে। দিলে কে আর ছাড়ে! কিন্তু আমি পুরুষ মানুষ, সেল্ফ মেইড ম্যান, এতে আমি কালি লাগতে দেব না। শ্বশুরের দেওয়া খাটে শোব, শ্বশুরের দেওয়া ঘড়ি পরব, অসম্ভব! বউয়ের শ্রদ্ধাও তো স্বামীরা চায়, তাই না?’
‘তা হলে একটা ঝামেলা চুকে গেল, এবার নেক্সট এবং আসল গাঁট, মেয়ে পছন্দ।’ মানবকে অনেকটা নিশ্চিত দেখাল। ‘কবে মেয়ে দেখবি বল, কালকেই?’
‘আমি ওই সাজগোজ করানো সামনে ঘাড় হেঁট করে বসে থাকা পুতুল দেখতে রাজি নই। ঘরে রোজ স্বাভাবিক অবস্থায় যেভাবে থাকে, চলাফেরা করে, তেমনভাবে দেখতে চাই।’
‘বেশ সেইভাবেই দেখাব।’
