দু-মিনিট পর রাস্তায় বিশ্রী একটা ভারী কিছু পড়ার শব্দ হল। আর ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল আতঙ্কিত একটা কুকুর।
সরলা
সরলার সংসার খুবই সুখের। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুরা ও প্রতিবেশীরা তাইই মনে করে। করার কারণও আছে।
সরলা নিজে দেখতে শুনতে ভালো। মুখের গড়নটি ডিমের মতো। গায়ের রং কাঁচা হলুদের বা দুধেআলতা, এমনকী পাকা সোনার মতো না হলেও গৌরবরণই তবে ফ্যাকাসে নয়। নাকটা টিকোলো হলে মুখের গড়নের সঙ্গে মানাত না, তাই টিকোলো নয়। মধ্যিখানটা ঈষৎ বসা। কপালটা ঢালু না হয়ে সামান্য উঁচু হওয়ায় দেখতে ভালোই লাগে। চোখদুটি হরিণের মতো নয় বরং লেপচা-ভুটিয়াদের আদলে পেস্তাচেরা। ওর মুখমণ্ডলে এই একটিই খুঁত কিন্তু এটিও মানিয়ে গেছে। চিবুক থেকে গলাটা নেমেছে সরু থেকে চওড়া হয়ে ছড়িয়ে পড়া ফুলদানির গলার মতো। কাঁধের বিস্তার বাহুতে ঢলে পড়ার সময় চর্বি বা মাংসের অনাবশ্যক ঢিপি তৈরি করেনি। ঝুলে থাকা হাতটার আঙুলের ডগা পর্যন্ত চমৎকার সামঞ্জস্য রেখেছে পাশের দীর্ঘ, মেদহীন দেহকাণ্ডটির সঙ্গে। বক্ষ, কটি ও নিতম্বের সমন্বয়ে ওই দেহটি যে ছন্দ তৈরি করেছে সেটি সে বজায় রেখেছে এবং আজও তাইতে লোকেশ মুগ্ধ রয়েছে, বিবাহের আঠারো বছর পরও। সুতরাং সরলা সুখী।
লোকেশের মতো শিক্ষিত, যথেষ্ট সচ্ছল, মিশুকে, সুদর্শন এবং মোটামুটি স্বাস্থ্যের স্বামী পেলে সরলা কেনই বা সুখী হবে না? লোকেশ তাকে দেখার জন্য মলিদের বাড়িতে এসেছিল। তার বাল্যবন্ধু মলির অর্থাৎ মালবিকাদের বাড়ি আর সরলার বাপের বাড়ি, সামনে আর পিছনে।
সরলার বাবা ট্রাম কোম্পানিতে ক্যাশিয়ার ছিলেন। চার মেয়ে, দুই ছেলের বাবা। ছয়জনের মধ্যে সরলা পঞ্চম এবং তৃতীয়া কন্যা। তখন কমলা ও রমলা, বড়ো দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা দুই ছেলেকে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘লেখাপড়া শিখিয়ে তোমাদের মানুষ করেছি। দুজনেই চাকরিতে ঢুকেছ। এবার তোমরা বাকি দুই বোনের বিয়ে দাও। আমার যা কিছু ছিল সবই তোমাদের জন্য আর দুই মেয়ের বিয়ে দিতে শেষ হয়ে গেছে।’
সমীর আর সনৎ গভীর প্রকৃতির। তারা স্বীকার করে বাকি দুই বোনের বিয়ের দায় তাদেরই নেওয়া উচিত। তারা সরলার জন্য পাত্র খোঁজার চেষ্টা করে বটে তবে ব্যস্ততা নিয়ে নয়। সরলা তখন একুশ বছরে, বি এ দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে। মেয়েদের বিয়ে তো তেইশ-চব্বিশেও হচ্ছে, সুতরাং আরও দু-তিন বছর দেখা যেতে পারে। তা ছাড়া তাদের বোন দেখতে তো খারাপ নয়। ডানাকাটা পরি না হলেও, একবার-দু’বার ফিরে তাকাতে হয়।
তার বিয়ের কথা ভাবা হচ্ছে সরলা তা জানে। বন্ধু মলিকেও সে বলেছে। মলি তার বাড়ির লোকেদের কাছে কথায় কথায় বলেছি, ‘সরির জন্য ছেলে দেখা হচ্ছে। কাকিমা বলল, তোর দাদার সঙ্গে তো অনেকের চেনা, একটু বলিস না, ভালো ছেলের সন্ধানটন্ধান যদি পায়।’
মলির দাদা মানব রাজনীতিতে তখন দিনের দুই-তৃতীয়াংশ সময় দিয়ে পৌর প্রতিনিধির জন্য নমিনেশন পাবার মতো জায়গায় প্রায় এসে গেছে। খুবই ব্যস্ত মানুষ কিন্তু তার মধ্যেই সে লোকেশকে চিহ্নিত করে, বোনের বন্ধু ও পিছনের বাড়ির মেয়ে সরলার জন্য পাত্র হিসাবে। তার সঙ্গে লোকেশ কলেজে পড়েছে, বি এসসি পাশ করে বেরোনোর পরও যোগাযোগ আছে।
ওষুধের ডিলারশিপের পৈতৃক ব্যবসায়ে লোকেশ সাধারণ কর্মচারীর মতনই কাজ করত। ব্যবসার কর্তা ছিলেন জ্যাঠামশাই। দাম্ভিক, রাশভারী অমৃতলাল দত্তই আশি ভাগের মালিক। বছর ছয়েক কাজ করার পর তার সঙ্গে জ্যাঠার খিটিমিটি শুরু হতে থাকে। মনোমালিন্যের বীজ বহু বছর ধরেই দুই পরিবারে বোনা হয়ে ছিল। লোকেশের ধারণা তার বাবাকে ব্যবসায় হিস্যা থেকে ঠেকিয়ে জ্যাঠা বঞ্চিত করেছে। রাগ অবশেষে ঝগড়ায় এবং জ্যাঠার কাছে কর্মচারী হয়ে থাকার সম্পর্কটা ঘুচিয়ে ফেলায় পৌঁছয়। তবে মুখ দেখাদেখি বন্ধ হওয়ার মতো পর্যায়ে যায়নি। জ্যাঠার পৌত্রের অন্নপ্রাশনে লোকেশ নিমন্ত্রণ খেয়ে এসেছে।
একশো দশ বছরের দরদালান দেওয়া বাড়িটা লোকেশের বাবা জীবিত থাকতেই ভাগ হয়ে গেছিল। উঠোনে পাঁচিল তোলার পর তাদের অংশে পড়েছিল যতটুকু, তাইতে রাস্তার উপর একটা সদর দরজা আর দোতলা ও তিনতলার সিঁড়ি তৈরি করে নিতে হয়। একতলায় একফালি উঠোন, দুটো বৃহদাকার ঘর আর কল-পায়খানা। দোতলায়ও দুটি ঘর এবং রাস্তার উপর ছোটো বারান্দা। বিটুর আট বছর বয়সে দুটি ঘরকে সে তিনটি করে নিয়েছে। ছেলেকে নিয়ে এক বিছানায় রাত্রে শোয়া, যখন সবকিছু বুঝতে শেখার বয়স হচ্ছে, অতএব আর উচিত নয় বিধায় লোকেশ একটি ঘরকে খণ্ড করে। বিটু তখন থেকেই নিজের ঘরে বাস করছে। বাকি খণ্ডের ঘরটি তার পড়ার এবং বাইরের কেউ এলে বসানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
এই সংসারে সরলা বউ হয়ে, পা দেয় একেবারে গৃহিণী হয়েই। মা মারা যাবার পর সংসারের আর একমাত্র ব্যক্তি প্রায় অথর্ব বাবার জন্যই লোকেশ নিজের বিয়ের কথা ভাবছিল। তখন সে হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে ক্লার্ক ট্যালবট ওষুধ কোম্পানির মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ হয়ে ওষুধের দোকানে দোকানে, হাসপাতালে, ডাক্তারদের চেম্বারে ঘুরে বেড়ায়। ঠিক ঝি এবং তেরো বছরের চন্দন রান্না সমেত বাড়ির সব কাজ করলেও কোনো কাজের মধ্যে শৃঙ্খলা বা পারিপাট্য ছিল না। লোকেশ বুঝতে পারে ঘরের কাজ মেয়েদের জন্যই অতএব বউ আনা দরকার।
