রাতের খাবার শোয়ার ঘরের টেবলে বসে খান। লুচি আর ছেঁচকির সঙ্গে থালার একধারে লেবুর আচার দেখে কানাইলাল বললেন, ‘দারুণ, অনেকদিন লেবুর আচার খাইনি!’
কামিনী ঠোঁট টিপে বললেন, ‘এটাও কিন্তু এই শেষবারের মতো। আর কিন্তু চাইলে পাবে না।’ তিনি দাঁড়িয়ে স্বামীর খাওয়া দেখতে লাগলেন। এক এক গ্রাসে এক-একটা লুচি শেষ করে কানাইলাল তাকালেন কামিনীর দিকে।
‘আরও চাই?’ ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে কামিনী বললেন, ‘আর কিন্তু চাইলেও পাবে না। শেষবার বলে তাই দিচ্ছি।’
খাওয়ার পর দালানে পায়চারি করে কানাইলাল বিছানায় শুলেন। একটু পরে কামিনী এলেন।
‘মেয়েরা শুয়েছে? তোজু?’
কামিনী বললেন, ‘হুঁ। তোমার একটা ওষুধের বড়ি আর দুটো মাত্র আছে, কালকেই আনিয়ে নিয়ো। আলো জ্বালা থাকবে না নিভিয়ে দোব?’
‘থাক জ্বালা। বইটা পড়ব। তুমি শুয়ে পড়ো।’
কামিনী আলো থেকে মুখ বিপরীতে রেখে কানাইলালের পাশে শুলেন। কানাইলাল মাইকেল রচনাসম্ভার বইটি বুকের ওপর তুলে নিলেন। পাতা খুলে অক্ষরের দিকে তাকিয়ে রইলেন বটে কিন্তু চোখের তারা স্থির। তিনি ভাবতে শুরু করেছেন। কামিনীর অভ্যাস, বিছানায় শুলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তে পারেন এবং অভ্যাস বজায় রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন।
বই বন্ধ করে কানাইলাল বার দুয়েক মুখ ফিরিয়ে স্ত্রীকে দেখে নিশ্চিত হলেন ঘুমিয়ে পড়েছে। খাট থেকে নেমে টেবল ল্যাম্প জ্বেলে তিনি নিভিয়ে দিলেন ঘরের আলো। লেখার প্যাড আর ডটপেন নিয়ে চেয়ারে বসে সামনের দেওয়ালে তাকিয়ে চোখ বুঁজে ভাবতে শুরু করলেন কলমটা কপালে ঠেকিয়ে। কিছুক্ষণ পর উঠে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে বিড়বিড় করে কথা বলতে লাগলেন। চোয়াল চেপে রাখার জন্য গালের পেশি শক্ত হয়ে ডেলা বেঁধে উঠেছে। দপদপ করল রগের শিরা, পায়চারি থামিয়ে চেয়ারে বসে কলমটা প্যাডে ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ বিড়বিড় করে কার সঙ্গে যেন তর্ক জুড়লেন। আবার উঠে পড়লেন। এবার তার পদক্ষেপ দ্রুত এবং নিঃশব্দ। জানলায় দাঁড়িয়ে নির্জন রাস্তায় একটা কুকুর দেখতে পেলেন, পেটটা ফুলে রয়েছে, বাচ্চচা হবে। মুখ তুললেন। পরিষ্কার আকাশ তারায় ভরা।
কানাইলাল জানলা থেকে ফিরে এসে চেয়ারে বসলেন। টেবল থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে কলমটা তুলে ঝুঁকে লিখতে শুরু করলেন।
‘প্রাণাধিকেষু তোজু,
ভেবে দেখলুম আমার চলে যাওয়া দরকার। এ কথাটা একমাত্র তোকেই বলা যায় অন্যদের বললে তারা বুঝবে না। আমি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় চলে যাব কারণ আমি তোদের মানে এই পরিবারকে কিছু আর দিতে পারব তো নাই-ই বরং অনেক কিছু থেকে তোদের বঞ্চিতই করতে থাকব। সেটা করলে স্বার্থপরতা হবে। দরদহীনের মতো আচরণ হবে। ধীরা আজ আমার মধ্যে একটা প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, একদিকে একজন অন্যদিকে অনেকজন, কোনদিকে যাব? একদিকে আমি, আমার অসুখ আর তার চিকিৎসার জন্য টাকা, মেয়েদের বিয়ে, জয়দেবকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখা, এসবের সমাধান হতে পারে, যদি অনেক টাকা পাওয়া যায়। সেই টাকাটা পাওয়ার একটা উপায় দেখা দিয়েছে। যদি তুই শক্তিগড়ের মেয়েটাকে বিয়ে করিস তা হলে এইসব সমস্যার সমাধান হতে পারে, কিন্তু তা করলে তোর জীবনটা শেষ হয়ে যাবে। জীবন একটা অমূল্য জিনিস, মানুষের কাছে এর থেকে মহার্ঘ আর কিছু নেই। সেই জীবন শেষ করে দে একথা আমায় তোকে বলতে হবে। এমনই কথা বলে গেল ধীরা। বুঝতেই পারছিস কথাটা ওর একার নয়, তোর মা-বোনেদের ইচ্ছাটা ধীরার মুখ দিয়ে বেরিয়েছে।
‘তোজু, প্রত্যেক মানুষেরই তো অধিকার আছে নিজের জীবনকে রক্ষা করার। পৃথিবীতে এমন কোনো ব্যাপার নেই যেটা জীবনের থেকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তা হলে আমি কোন মুখে বলব এই পরিবারটাকে বাঁচাবার জন্য তুই এই বিয়েটা করে মরে যা। একদিকে তুই আর একদিকে আমরা সবাই। ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না, একদিকে একজন অন্যদিকে অনেকজন। এক্ষেত্রে তো অনেকজনের পক্ষ নেওয়াই উচিত। কিন্তু নিতে পারছি না, কোথায় যেন বাধছে। তোর জীবনটা তো তুই-ই তৈরি করেছিস। নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে যেটা করলে জীবন ঠিকভাবে গড়ে উঠবে সেইসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো তো তুই নিজেই নিয়েছিস। আমি এখন কেন নাক গলাতে যাব তোর জীবনে? তা হলে কি তুই আর আমাকে সম্মান করবি, মর্যাদা দিবি? তোর চোখে চোখ রেখে আমি তো আর তাকাতেই পারব না।
‘এই বিয়েটা করা না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায় তোর উপরেই ছেড়ে দিলুম। যদি বলি করিসনি তা হলে সারাজীবন অভিশাপ কুড়োতে হবে এই পরিবারের। যদি বলি বিয়েটা করে ফেল তা হলে বিবেক আজীবন আমাকে কুরে কুরে খাবে। তোজু তুই নিজেই ঠিক কর কী করবি, আমাকে রেহাই দে। আমি চললাম। ইতি তোর হতভাগ্য বাবা।’
প্যাড থেকে কাগজটা খুলে ভাঁজ করার আগে কানাইলাল চিঠিটা পড়ল। তার মনে হল ‘মহার্ঘ’ শব্দটার বানানে বোধহয় একটা ‘য’ ফলা বসবে। ঘরে অভিধান নেই। থাকগে,তোজুকে জাগিয়ে তুলে অভিধান চাওয়ার মানে হয় না। তিনপাট করে চিঠিটা ভাঁজ করে তাতে বড়ো অক্ষরে লিখলেন, শ্রীমান তেজেশচন্দ্র সিংহ। টেবলের মাঝখানে চিঠিটা রেখে, ময়লা গেঞ্জিটা খুলে সাদা পাঞ্জাবি আলমারি থেকে বার করে পরলেন। চিরুনি দিয়ে চুলের পাট ঠিক করলেন। টেবল ল্যাম্প নিভিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদের সিঁড়ি ধরলেন।
