‘কী উদ্দেশ্য?’
‘মেয়ের সঙ্গে তোর বিয়ে দেবে।’
তোজু ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। ‘পরীক্ষা আর ক-দিন পর, মরার সময় নেই। পাশ করেই চাকরির জন্য হাঁটাহাঁটি শুরু করতে হবে। এর মধ্যে বিয়ের চিন্তা আসে কী করে?’
‘এই মেয়েকে বিয়ে করলে সব চিন্তা ঘুচে যাবে। কম করে দশ লাখ টাকা খরচ করবে, আমেরিকাতেও পড়তে পাঠাবে।’
‘শুনে তো বেলুনের মতো আমার ইগো ফুলে উঠছে, এবার পিনটা ফুটিয়ে দাও। মেয়েটি কেমন?’
কামিনী একচোট হেসে নিয়ে বললেন, ‘তোর বাবা দেখেছে, বলল হুঁতকো ইডিয়ট অশিক্ষিত তার ওপর গলার স্বর খোনা। টাকার টোপ দিয়ে ছেলে ধরতে চায়।’
‘তোমরা কী বললে?’
‘কিছু বলিনি শুধু শুনে গেছি। ওনার হাবভাব দেখে মনে হল এমন একটা প্রস্তাব আমরা হাতছাড়া করতেই পারব না। সত্যিই তো এত টাকা কোন মূর্খ ছেড়ে দেবে! ওদের শখ লেখাপড়া জানা সুন্দর দেখতে জামাই লোককে দেখানো।’
তোজু মুখ নামিয়ে ফাইল খুলে কাগজ ওলটাতে শুরু করল। কামিনী বললেন, ‘ওরা ফোন নম্বর দিয়ে গেছে, আমাদেরটাও নিয়ে গেছে।’ ছেলে মুখ তুলল না দেখে তিনি পায়ে পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
দু-দিনের মধ্যে মেয়েরাও জেনে গেল ব্যাপারটা। বিশাল টাকা দিয়ে তোজুকে জামাই করার প্রস্তাব দিয়ে গেছে সেদিনের অতিথিরা। প্রথমে কেউ বিশ্বাসই করতে পারেনি। তাই এক সন্ধ্যায় ধীরাই সাহস করে বাবাকে জিজ্ঞাসা করল। ‘এটা কি সত্যি?’
কানাইলাল চশমা খুলে মেয়ের দিকে তাকালেন, ‘কোন সত্যির কথা বলছিস? তোজুর বিয়ের ব্যাপারটা? হ্যাঁ সত্যি।’
‘দিয়ে দাওনা বিয়ে। অতগুলো টাকা ছেড়ে দেবে!’
‘বলছিস কী!’ হাতের খবরের কাগজ ভাঁজ করে তিনি সোজা হয়ে বসলেন। ‘তোজুর একটা জীবন আছে। টাকার জন্য সেটা নষ্ট করতে বলছিস?’
ধীরার চাহনি ধীরে ধীরে বদলে গেল। করুণ আতুর চোখদুটো ঘন কালো হয়ে উঠল। তাতে বিদ্যুৎ চমকাল। তাতে হিংস্রতার ঝলক দপ করে উঠে স্তিমিত হয়ে গেল।
‘ওর জীবন নষ্ট কেন হবে। বউকে সরিয়ে দেবে।’
‘কোথায়?’
‘এই পৃথিবী থেকে।’
শুনেই থরথর কাঁপতে শুরু করলেন কানাইলাল। এলিয়ে পড়লেন বালিশের উপর।
‘তোমাকে বাইপাস করতে বলেছে ডাক্তার। দেড় লাখ টাকা লাগবে। তোমার জামাইকে দু-লাখ টাকা দেবে বলেও দাওনি। সে আজ হাঘরে ভিখিরি হয়ে গেছে, আমি বাপের বাড়িতে পড়ে আছি। পোস্টাপিস থেকে সার্টিফিকেট ভাঙিয়ে টাকা তুমি পেয়েছ, ব্যাঙ্কেও টাকা আছে। এসব লুকিয়েছ আমার কাছে, পাছে কথা রাখার জন্য জামাইকে টাকা দিতে হয়, ঠিক কি না?’
‘হ্যাঁ ঠিক। আমাকে জবাব দিয়েছে অন্নপূর্ণা, ভবেশ সাহা আর আমাকে চায় না। এই হার্টের রোগীকে নিয়ে ওরা কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। আমার অনেক রকম খরচের ব্যাপার রয়েছে। মাসে মাসে ওষুধ কেনার টাকা চাই, তোর বোনেদের বিয়ে- বাইপাস সার্জারির কথা বাদই দিচ্ছি।’ কানাইলালের স্বর কাতর হয়ে আসছে। ‘জয়দেব তো একজন, আমরা অনেকে। কোনদিকে আমি যাব বলে দে।’
‘তোজুও তো একজন। আমরা অনেকে, কোনদিকে যেতে হবে আমি জানি। ও তোমার বাধ্য পিতৃভক্ত, তুমি যা বলবে তাই করবে, ওকে এই মেয়েটাকে বিয়ে করতে বলো। তোমার বাইপাস হবে, ওষুধ কেনার টাকাও পাবে, সবার বিয়েও দেওয়া যাবে, আমিও শ্বশুরবাড়ি ফিরে যেতে পারব।’
‘অসম্ভব!’ কানাইলাল চিৎকার করে সটান হয়ে উঠে বসলেন। ‘জীবন জীবনই। তা একজনের হোক আর দশজনেরই হোক। আমি পারব না, ওকে বলতে পারব না।’
‘বাবা তুমি বোকা স্বার্থপর। অনেক সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারতে যদি দরদ থাকত।’
বুকের বাঁদিকে পিন ফোটানোর মতো ব্যথা অনুভব করলেন কানাইলাল। হাত নেড়ে ধীরাকে চলে যেতে ইশারা করলেন। ধীরা মুখ বিকৃত করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কানাইলাল একটু পরে ছাদে গেলেন। পায়চারি করতে করতে পাঁচিলের ধারে একটা জায়গায় দাঁড়ালেন। ঘুড়ি ধরতে ঠিক এই জায়গাটা থেকে মজু পাঁচিল থেকে উলটে গিয়ে রাস্তায় পড়েছিল। তিনি ঝুঁকে রাস্তা দেখলেন, অনেকটা নীচে রাস্তা। ব্যথা লেগেছিল মজুর। কতটা! আন্দাজ করার জন্য মাথা নীচু করে ঠুকলেন পাঁচিলে। ব্যথা একটা লাগল কিন্তু খুব বেশি নয়। ইচ্ছে করে ঠুকলে ব্যথা কম লাগে। মজু ইচ্ছে করে পড়েনি। ব্যথা লেগেছিল। এক সেকেন্ড কি দু-সেকেন্ড, তারপরই সব ব্যথার ওধারে চলে যায়। তিনি আবার পায়চারি শুরু করলেন।
ছাদ থেকে নেমে এসে চোখেমুখে জল দিয়ে রান্নাঘরের দরজায় এসে কানাইলাল দাঁড়ালেন। কামিনী আটা মাখছেন, মুখ তুলে বললেন, ‘কী ব্যাপার আবার চা চাই নাকি?’
‘লুচি খেতে ইচ্ছে করছে, অনেকদিন খাইনি।’ কানাইলালের গলায় বাচ্চচাছেলের মতো আবদার।
‘লুচি খাওয়া তোমার বারণ। হার্টের রুগিদের ভাজাভুজি খেতে নেই।’কামিনী ছোট্ট করে ধমক দিলেন।
‘আজই শেষ, আর চাইব না।’ কানাইলাল মিনতি করলেন, ‘একবার ক-টা লুচি খেলে হার্টের এমনকিছু সর্বনাশ হবে না। একটু-আধটু অনিয়ম সবাই করে। প্লিজ আজ লুচি খাওয়াও আলু ছেঁচকি দিয়ে।’
কামিনী কয়েক সেকেন্ড মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘এই শেষবার কিন্তু, মনে থাকে যেন।’
দরদালানের একপ্রান্তে বসে মেয়েরা বাংলা সিরিয়াল দেখছে টিভিতে। কানাইলাল তাদের পাশ দিয়ে ঘরে ফিরে এলেন, কেউ তার দিকে তাকাল না।
