‘বেশি পুরোনো নয়, একশো বছরের একটু বেশি। আমাদের এই অঞ্চলে বহু দেড়শো বছরের বাড়ি আছে, এ বাড়ি ঠাকুরদা করেছেন যখন তিনি অল্পবয়সি, তখন মোহনবাগান ক্লাব তৈরি হয়, উনি প্রথম কয়েকটা বছর খেলেছেন।’
বৃন্দাবন বললেন, ‘আপনি খেলেছেন?’
‘না। খেলা দেখতুম। শৈলেন মান্না রিটায়ার করল আমিও মাঠে যাওয়া ছাড়লুম। তারপর সিনেমায় তারপর যাত্রায়। এবার যাত্রাও ছাড়ব।’
দাঁ গিন্নি জানাতে চাইলেন, ‘ছেড়ে কোথায় যাবেন?’
ডানহাতের তর্জনী সিলিংয়ের দিকে তুলে কানাইলাল হাসতে হাসতে বললেন, ‘চিরযাত্রায় যাব!’
‘বালাই ষাট। আপনি একশো বছর বাঁচুন।’
ভিতর থেকে কামিনী, তার সঙ্গে চার মেয়ে বেরিয়ে এল। কানাইলাল দেখলেন কামিনী শাড়ি পালটেছে, চুল আঁচড়েছে, এক হাতে সোনার বালা, যেটা দশ মিনিট আগেও হাতে ছিল না। পঞ্চাশ পেরোনো কামিনীকে বেমানান লাগছে না মেয়েদের পাশে।
নমস্কার বিনিময় শেষ হতেই কানাইলাল বললেন, ‘এদের কথা তো তোমায় বলেছি। কী খাওয়াটাই না খাইয়েছিলেন। মাংসটা অসাধারণ রান্না হয়েছিল।’
‘এরা সবাই আপনার মেয়ে?’ দাঁ গিন্নি কথা ঘোরালেন।
‘হ্যাঁ এটি বড়ো, বিয়ে হয়েছে। বাকিরা কলেজে স্কুলে পড়ছে।’
‘জামাই কী করে?’
‘ব্যবসা। নিউমার্কেটে দোকান আছে। আপনার ক-টি ছেলেমেয়ে?’
‘ছয় মেয়ে এক ছেলে। প্রথম দুটির বিয়ে হয়ে গেছে। একজনের কাটোয়ায় আর একজনের মেমারিতে। ইচ্ছে আছে সেজোটির বিয়ে দেব কলকাতায়। ছেলে খুঁজছি। ছেলেটি ভাইবোনের মধ্যে ছোটো। ক্লাস এইটে পড়ে। আপনারও তো এক ছেলে। সে কি বাড়ি আছে?’
নীলা বলল, ‘দাদা ওর বন্ধুর সঙ্গে ঘরে পড়ছে। সামনেই পরীক্ষা।’
বৃন্দাবন ও কানাইলাল চুপ করে শুনে যাচ্ছেন দুই গৃহিণীর আলাপ।
কামিনী বললেন, ‘ধীরা চায়ের জল বসা।’
ধীরার সঙ্গে বাকি তিনজন অন্তর্হিত হল। দাঁ গিন্নি বললেন, ‘পুরোনো বাড়ি দেখতে বেশ লাগে।’
কামিনী বললেন, ‘আসুন না। আগে ঘরগুলো তারপর ছাদটাও দেখবেন।’
ওরা দু-জন উঠে যেতে কানাইলাল বলল, ‘বৃন্দাবনবাবু, চেয়ারে বেশিক্ষণ বসে থাকলে কোমরে ব্যথা করে, চলুন ঘরে গিয়ে খাটে বালিশ নিয়ে বসা যাক।’
ওঁরা প্রায় দেড়ঘণ্টা রইলেন। ছোটোমেয়ে সুরমা পাড়ার দোকান থেকে শিঙাড়া রসগোল্লা কিনে আনে, দাঁ দম্পতি চায়ের সঙ্গে সেগুলি খান। তাদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য বারবার সনির্বন্ধ অনুরোধ জানিয়ে শক্তিগড় থেকে ভাড়া করে আসা প্রাইভেট ট্যাক্সিতে চড়ে ফিরে যান। ওরা চলে যাওয়ার পর কামিনী কানাইলালকে ঘরে ডেকে বললেন, ‘কেন এসেছিল জানো? তোজুকে দেখতে। ওর ঘরে ঢুকে অনেকক্ষণ ধরে দেখে বলল আপনার ছেলেটি বেশ দেখতে।’
‘কথা বলল?’
”কী কথা বলবে? অপরিচিত একটা ছেলের সঙ্গে হঠাৎ আলাপ করা যায় নাকি? আর মায়ের বয়সি অচেনা কারোর সঙ্গে তোজুই বা কী কথা বলবে? একবার মুখ ঘুরিয়ে দেখে নিয়ে আবার সোমনাথের সঙ্গে কথা বলতে লাগল। আরে শোনো না, ছাদে গেছি তখন উনি বললেন, ওদের বাড়িতে সেদিন তুমি বলেছিলে ছেলে এম এসসি পড়ে তখনই ওদের মাথায় ঢুকে যায় তোজুকে জামাই করার চিন্তাটা, ওকে না দেখেই। আজ দেখার পর তো মাথা ঘুরে গেছে।’
উত্তেজিত হয়ে কানাইলাল গলা চড়িয়ে বললেন, ‘কী সাহস! তুমি দেখনি আমি দেখেছি। তোমায় তো বলেছি সেদিন মেয়েটা কী কথা অত লোকের মাঝে বলেছিল। একেবারে ইডিয়ট জড়বুদ্ধি। আর বুদ্ধিমতী যদি হয়ও ওই শাঁকচুন্নির মতো খোনা গলার স্বর! অসম্ভব, ভাবা যায় না। অন্ধকারে যদি হঠাৎ কথা বলে ওঠে শুনে তোমার ধাত ছেড়ে যাবে। ওদের কি কাণ্ডজ্ঞান নেই? কার দিকে হাত বাড়াচ্ছে সেটাও কি বোঝে না? একটা হুঁতকো রুচিহীন জড়বুদ্ধি অশিক্ষিত, তার ওপর খোনা। তোজুকে কিংবা মেয়েদের কাছে এই নিয়ে কিছু বোলো না।’
‘পাগল। বলা যায় নাকি! ভদ্রমহিলা তারপর কি টোপ দিলেন জানো? রাজকন্যার সঙ্গে অর্ধেক রাজত্ব। মোটর গাড়ি, চল্লিশ ভরি সোনা, পাঁচ বিঘে ধানি জমি, নগদ এক লাখ টাকা, তা ছাড়া সাজিয়ে দেবে ঘর। শুনতে শুনতে হাত-পা কাঁপছিল। এ তো ছেলে কেনা। আবার বলল আমেরিকায় যদি পড়তে চায় তারও খরচ দেবে।’
‘শুনে আমারও হাত-পা কাঁপছে। এমন একটা প্রস্তাব দিতে পারে যারা তারা কী ভয়ংকর লোক ভাবতে পারো? এ তো পিশাচের মতো প্রস্তাব। আমার মনে হয় মেয়েটাকে ওদের মেরে ফেলা উচিত।’
‘এ কী কথা বলছ! তোমার কথাটাও তো পিশাচের মতো।’
‘হতে পারে। টাকার লোভ দেখিয়ে কার্যোদ্ধার একটা নোংরা ব্যাপার। নোংরা মানে মেয়েটাকে প্রচুর টাকার যৌতুক দিয়ে একটা পিশাচের হাতে তুলে দেওয়া, যে বিয়ে করে মেয়েটার গায়ে আগুন লাগাবে বা গলা টিপে মেরে ঝুলিয়ে দিয়ে বলবে আত্মহত্যা। এইসব পাপ কাজ বাবা-মা করার সুযোগ পাবে না যদি তার আগেই মেয়েকে মেরে ফেলে একটা ছেলেকে করাপ্ট হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেয়। ভেবে দেখো যে প্রস্তাব ভদ্রমহিলা তোমায় দিলেন, যেহেতু তুমি লোভটা সামলাতে পারলে ছেলের মঙ্গল চেয়ে কিন্তু সেটা অন্য কাউকে দিলে তারা লোভ নাও সামলাতে পারে। মনে রেখো গরিব অশিক্ষিত লোভীদের দেশ এটা।’
৮
কামিনী বলেছিলেন বটে ছেলে বা মেয়েদের কাউকে বলবেন না। কিন্তু বলে ফেললেন তোজুকে। ছেলের বিছানার চাদর বদলাবার সময় কথা বলতে বলতে বললেন, ‘জানিস সেদিন যে মহিলাটি এসেছিলেন, ঘরে ঢুকে তোকে দেখলেন তার কী উদ্দেশ্য ছিল?’
