একতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার আগে তোজু বলল, ‘এবার থেকে ওঠানামা করবে এইভাবে।’ সে বাবাকে দেখাবার জন্য দুটো ধাপ নিজে উঠে দেখাল। একধাপ উঠে দু-পা রেখে দাঁড়াল। পরের ধাপে উঠে আবার দু-পা রেখে দাঁড়াল। ‘নাও এবার ওঠো। এভাবে উঠলে হার্টের উপর চাপ কম পড়বে। থেমে থেমে উঠতে হবে।’
বিব্রত মুখে কানাইলাল বললেন, ‘তা তো বুঝলুম। কিন্তু দোতলায় পৌঁছতে পৌঁছতে যে বিকেল হয়ে যাবে।’
৭
সতেরো তারিখ বা তার আগে ভবেশ টাকা দেবেন বলেছিলেন। প্রতিশ্রুতি মনে করিয়ে দিতে কানাইলাল ফোন করলেন ষোলো তারিখে রাত আটটায় গদিতে। তিনি জানেন ওই সময় ভবেশ প্রতিদিন ওখানে আসেন। ফোন ভবেশই তুললেন।
‘আরে কানাইবাবু, কবে বাড়ি ফিরলেন? আমি একদম সময় করে উঠতে পারিনি আপনাকে দেখতে যাবার। হলদিয়ায় গেছলুম, গেস্ট হাউস করতে যে এত ঝঞ্ঝাট পোয়াতে হবে আগে জানতুম না, টাকার ছেরাদ্দ হচ্ছে। এর থেকে ফাইভ স্টার হোটেল বানানো অনেক সোজা কাজ। বলুন শরীর এখন কেমন, ডাক্তার কী বলছে?’
টাকা দেওয়ার ধারেকাছে যায় এমন কথার দিকে ভবেশ গেলেন না। কানাইলাল হালকা চালে বললেন, ‘যা বলে ডাক্তাররা, জোরে হাঁটবেন না জোরে কথা বলবেন না। আরে বাবা, আসরে মাইক থাকলেও চিৎকারের জায়গায় মুখ দিয়ে চিৎকার ঠিক বেরিয়ে আসবে। একগাদা ওষুধ লিখে গিয়েছে। যাকগে অসুখের কথা, কাল আসছেন টাকাটা নিয়ে?’
ভবেশ আকাশ থেকে পড়লেন, ‘টাকা! কীসের টাকা?’
‘যেটা আগাম দেবেন বলেছিলেন, একলাখ।’
‘ও হো হো, হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়ছে। কিন্তু কানাইবাবু এখন আমি একদম ভিখিরি, হাতে একটা আধলা নেই। হলদিয়া আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। কথা রাখতে পারছি না বলে লজ্জা করছে।’
কানাইলালের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। দপদপ করে উঠল রগ। অনেক ভরসা করেছিলেন ভবেশের প্রতিশ্রুতির উপর। চোখে অন্ধকার দেখলেন। ভাবলেন ওকে একটু ভয় দেখাই, ‘টাকাটার খুবই দরকার ছিল ভবেশবাবু, দেখি শক্তি কুণ্ডুর কাছে পাই কি না। মুশকিল হল উনি টাকা ঠিকই দেবেন কিন্তু একটা কড়ারে। ওর চৈতন্য অপেরায় নাম লেখাতে হবে। দু-বছর আগে ঝুলোঝুলি করেছিল, যাইনি। এখন তো আমাকে ভেবে দেখতে হবে।’
‘টাকা যদি পান তা হলে যাবেন না কেন, ভাবাভাবির কী আছে? আপনার মতো গুণী মানুষ বসে থাকবেন এটা তো হতে পারে না। শক্তিবাবু কেন আরও অনেকেই চাইবেন অবশ্য তারা যদি আপনার হার্টের খবর না রেখে থাকেন।’
কানাইলালের মনে হল ওধারে যেন একটা হাসির শব্দ হল। লোকটা টাকা দেবে না বুঝে গিয়ে তিনি রিসিভার রেখে দিলেন। ভবেশ করিতকর্মা লোক। সারা যাত্রাপাড়া জেনে যাবে বা জেনে গেছে কানাই সিংগির হার্টের রোগ হয়েছে। অন্নপূর্ণা ওকে ছাঁটাই করেছে।
কানাইলাল গুম হয়ে বসে রইলেন। ওকে দেখে কামিনী আঁচ করলেন খারাপ কিছু একটা ঘটেছে। একসময় জিজ্ঞাসাই করে ফেললেন, ‘কিছু কী হয়েছে? অমন মুখ করে রয়েছ?’
‘আমার যাত্রা করা শেষ হয়ে গেল, ভবেশ সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছে। যে ক-টা টাকা রয়েছে ভেবেচিন্তে এবার থেকে খরচ কোরো, অন্তত তোজু যতদিন না নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে ততদিন। মেয়েদের বলে দিয়ো নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা যেন তৈরি করে নেয়। ধীরাকেও বলে দিয়ো-।’ কানাইলাল থেমে গেলেন। যে কথাটা বলতে গিয়ে বলতে পারলেন না, তার মনে হল বললেই ভবেশ সাহা হয়ে যাবেন। ভবেশের মতোই কথা দিয়েছেন এখন ভবেশের মতো কথার খেলাপ করে পিছিয়ে যাওয়া যায় না। জয়দেব তো তার মতোই প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করছে। একবার ভবেশ আর একবার জয়দেব হতে হতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন।
‘যে ক-টা টাকা আছে থাকুক। তোমার শরীর যে আবার খারাপ হবে না এমন তো কোনো কথা নেই, জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করা হয়েছে। তার ওপর কাজকর্ম রোজগারও বন্ধ হয়ে গেল। এই ক-দিন দু-বেলা ছোটাছুটি করে তোজুর পরীক্ষার পড়ারও ক্ষতি হল।’ কামিনী মন্থর স্বরে কথাগুলো বললেন। ‘শরীরের কথা ভেবে তুমি কিন্তু সাবধানে থেকো। মেয়েদের বিয়ে দিতে হবে তোমাকেই। তোজুর ঘাড়ে সব চাপিয়ে দিয়ো না।’
বৃন্দাবন দাঁ যে সত্যি সত্যিই হাজির হবেন তাও সস্ত্রীক, কানাইলাল ভাবেনি। বিকেলে জানলায় দাঁড়িয়ে রাস্তায় ছেলেদের বল খেলা দেখছিলেন। একটা সাদা অ্যাম্বাসাডার তাদের সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়াতে তিনি কৌতূহলী হয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। দেখামাত্র চিনতে পারলেন। চেঁচিয়ে নীলাকে ডাকলেন, ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘তোর মাকে বল শক্তিগড়ের যাদের বাড়িতে খেয়েছিলুম, আসবে বলেছিল আমাদের বাড়িতে, তারা এসেছে, তুই ওদের ওপরে নিয়ে আয়, সম্পর্কে আত্মীয় হয়।’
নীচের থেকে মিহি গলার ডাক শোনা গেল, ‘কানাইবাবু বাড়ি আছেন নাকি?’
‘যাই-ই।’ সিঁড়ির মাথায় এসে কানাইলাল উত্তর দিলেন ‘ওপরে আসুন।’
বৃন্দাবন আর তার স্ত্রীকে দরদালানে বেতের চেয়ারে বসালেন।
‘কখন বেরিয়েছেন বাড়ি থেকে?’ কানাইলাল আলাপের যবনিকা তুললেন।
‘এগারোটায় দক্ষিণেশ্বর হয়ে সোজা এখানে। কী ভিড় কী ভিড়! গত বছরের থেকেও মনে হল এবার ভিড়টা বেশি। পুজো দিতে প্রায় একশো লোকের পিছনে দাঁড়াতে হল।’
ওরা উপরে পাশে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘর মেঝে কড়িকাঠ দেখতে লাগলেন। দাঁ গিন্নি বললেন, ‘কতদিনের পুরোনো বাড়ি?’
