দু-দিন পরই সার্টিফিকেট ভাঙানোর টাকা দিয়ে গেল প্রণবেন্দু। এক লাখ তিয়াত্তর হাজার টাকা। হাঁপ ছেড়ে বাঁচল সিংহি বাড়ি। টাকাগুলো গুনে পলিব্যাগে ভরে কামিনী সিন্দুকে রেখে দিলেন। ইতিমধ্যে কোথা থেকে খবর পেয়ে ভবেশ সাহা হাসপাতালে কানাইলালকে দেখতে যান। ডাক্তারদের সঙ্গেও কথা বলেন। এবং তখনই স্থির করে ফেলেন অন্নপূর্ণা অপেরায় কানাইলাল সিংহকে রাখার আর কোনো দরকার নেই, অতএব লাখ টাকা অগ্রিমটাও তিনি দেবেন না। দিলে টাকাটা যে উশুল করা যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই, কেননা কানাইলাল ভালো হয়ে উঠলেও যাত্রা করার ধকল এবার আর সামলাতে পারবেন না, টাকা জলে যাবে।
কানাইলাল যখন হাসপাতালে তখনই ধীরা সকালে হাজির হল বাবার বাড়িতে। কপালে ব্যান্ডেজ, হাতে ও কাঁধে থলি, তাতে জামাকাপড়। মায়ের কাছে কান্নায় ভেঙে পড়ে জানাল, আর সে শ্বশুরবাড়িতে থাকতে পারবে না। দেওররা উঠতে বসতে অপমান করছে, এবার গায়েও হাত তুলেছে। জনার্দন পেটাচ্ছিল তার দাদাকে, সে ঝাঁপিয়ে পড়ে থামাতে গেছিল দেওর তার ঘাড় ধরে দেওয়ালে মাথা ঠুকে এই অবস্থা করেছে বলে ব্যান্ডেজটা দেখাল।
‘মা আমাকে এখানে থাকতে দাও নয়তো গলায় দড়ি দিয়ে মরব।’ ধীরা হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। ‘দোকানের জন্য বাবা যে টাকা দেবে বলেছিল তার কী হল? সেই টাকা না দেখালে দেওররা বলেছে দাদাকে আর দোকানে ঢুকতে দেবে না, তিনদিন হল ঢুকতে দিচ্ছেও না। শ্বশুর-শাশুড়ি দুই ছেলের ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে। তোমার জামাই বলল এখন মা-র কাছে গিয়ে থাকো। বাবা টাকাটা দিলে ভাইয়েরা অন্তত বিশ্বাস করবে আমি বাজে কথা বলিনি। এদিকে যে কোম্পানির মাল দোকানে রেখে বিক্রি করার কথা হয়েছে সেই কোম্পানি দোকানের মালিকদের মধ্যে ঝগড়া-মামলা দেখে এখন দোনোমনা করছে। বোধ হয় তারা এগ্রিমেন্ট করার জন্য আর এগোবে না। তা হলে ওর অবস্থাটা কী দাঁড়াবে!’
সব শুনে কামিনী শুকনো মুখে বললেন, ‘তোর বাবার শরীরের এখন-তখন অবস্থা দেখে হাসপাতালে দিতে হল, ঠিক সময়ে ইঞ্জেকশনটা পড়ায় বেঁচে গেছে। সাতদিন থাকতে হবে। ইঞ্জেকশনটার দামই পড়ল পাঁচ হাজার টাকা। একটা কী পরীক্ষা যেন করতে হবে তাতে লাগবে পনেরো হাজার টাকা। যাত্রার একটা মেয়ের কাছে ধার পেলুম পাঁচ হাজার। এখন বাকি টাকা কোথা থেকে পাব নারায়ণই জানেন।’
নারায়ণের মতো ধীরা অন্তর্যামী নয়। তা যদি হত তা হলে সে জেনে যেত মায়ের সিন্দুকে তখন প্রায় পৌনে দু-লক্ষ টাকা রয়েছে। মায়ের কথা শুনতে শুনতে ফ্যাকাশে হয়ে গেল ধীরার মুখ। বিড়বিড় করে বলল, ‘তা হলে টাকাটা পাওয়া যাবে না! আমি তো শুনেছিলুম বাবা পোস্টাপিস আর ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে ওকে দেবে বলেছিল।’
‘আমাকে তো সেসব কিছু বলেনি।’ কামিনী স্বর নামিয়ে বললেন, ‘উনি আসুক তখন জিজ্ঞেস করিস। আমার এখানে থাকবি তো থাক না।’ কামিনীর গলা আন্তরিক, ‘ব্যবস্থা কিছু একটা হয়ে যাবে, জয়দেব আর কোথাও চেষ্টা করেনি? ওর মামারা তো শুনেছি খুব পয়সাওলা।’
ধীরা বলল, ‘মামাদের কাছে ও হাত পাতবে না।’
বাবাকে দেখতে তোজু রোজই বিকেলে হাসপাতালে যায়, সঙ্গে যান কামিনী। সেদিন ধীরাও তাদের সঙ্গী হল। কামিনী তাকে বলে দিয়েছিলেন, ‘ডাক্তার বলেছেন এখন ওকে হালকা মন মেজাজে থাকতে হবে। টেনশন হয় এমন কোনো কথা একদম ওকে বলবেন না। তোর কপালের ব্যান্ডেজটা কেন জিজ্ঞেস করলে বলবি কলতলায় পিছলে পড়ে মাথা ঠুকে গেছে। টাকার কথা একদম তুলবি না তা হলেই টেনশন হবে।’
মা যা বলে দিয়েছিল ধীরা তাই বলল বাবাকে। কানাইলাল জিজ্ঞাসা করলেন, ‘জয়দেব দোকানে গিয়ে বসছে? ওর ভাইয়েরা ওকে নাকি খুব হেনস্থা করে। একবার বাড়ি যাই টাকার ব্যবস্থা করে দোব। ভবেশ সাহা অর্ধেক দেবে বাকি অর্ধেক আমি দেব। তুই চিন্তা করিসনি।’
শুনে স্বস্তির হাসি ফুটল ধীরার মুখে। কামিনীর মুখে কোনো ভাবের সঞ্চার ঘটল না। কানাইলাল সাতদিন পর সকালে বাড়ি ফিরলেন। তোজু আগের দিন জেনে গিয়েছিল কত টাকা চিকিৎসাবাবদ হাসপাতালকে দিতে হবে। বাড়ি ফিরেই সে মাকে জানায়, ‘বিল হয়েছে একচল্লিশ হাজার টাকার। শুনে তো আমার চক্ষু চড়ক গাছ। এই পরীক্ষা সেই পরীক্ষা এই ওষুধ তাই ওষুধ কত রকমের খরচ। কী এক্সপেন্সিভ হয়ে গেছে মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট। শুধু বড়োলোকরাই বেঁচে থাকবে। বাবা ভাগ্যিস সার্টিফিকেটগুলো ভাঙাতে দিয়েছিল নয়তো-।’
কামিনী ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ করার জন্য ইশারা করলেন।
‘আস্তে কথা বল ও ঘরে ধীরা রয়েছে। এ টাকা জয়দেবকে দেবার জন্য পোস্টাপিস থেকে তোলা হয়েছে, ওনার প্রাণ বাঁচানোর জন্য কাজে লেগে গেল। নারায়ণ যা করেন মঙ্গলের জন্য। আগে প্রাণ তারপর মান।’
বাড়িতে আসার সময় কানাইলাল ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হসপিটালের টাকাটা কোথায় পেলি? প্রণবেন্দু দিয়ে গেছে?’
‘হ্যাঁ। একলাখ তিয়াত্তর হাজার টাকা।’
‘তার থেকে একচল্লিশ হাজার চলে গেল। রইল একলাখ বত্রিশ। ভবেশ দেবে একলাখ। ওহহো সতেরো তারিখে দেবে বলেছিল মনে করিয়ে দিতে হবে সময় বুঝে। ভবেশ টাকা দেওয়ার কথা ভুলে যায়। ওর একলাখটা পেলে জয়দেবকে দু-লাখ দিয়ে দিতে পারব।’ কানাইলালকে প্রফুল্ল দেখাল।
