‘যদি না হেলপ করেন, তাহলে সুইসাইড ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। তারকদা আপনিই বাঁচাতে পারেন আমাকে।’
তারকের মনে হল, দামড়াটাকে একটা লাথি কসাই। আমায় কী মা-ঠাকুমা পেয়েছে যে মরার ভয় দেখাচ্ছে! নকশা করার আর লোক পেল না। কালকেই ক্যান্টিনে বোসদার ‘নকশা’ কথাটা শুনে তার ভালো লেগেছিল। কথাটা যে এত শিগগিরি ব্যবহার করতে পারবে, ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। মনে মনে ভাবার সঙ্গে চেঁচিয়ে বলায় আর তফাত কী!
‘আমার মনে হয় তোমার বিয়ে করাই উচিত। এই সব রিস্কি কাজ না করাই ভালো।’ তারক প্রায় বলে ফেলেছিল, পেট খসানোর মতো পাপ কাজ আর নেই। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে কথাটা খুব অশ্লীল শোনাবে বলে তার মনে হল।
‘তা ছাড়া প্রেম করছ, বিয়ে করবে বলেই তো?’
শেষে এইটুকু জুড়ে দিয়ে তারক ঘাড় নীচু করে সলিলের দিকে তাকাল। চাঁদির কাছে চুল পাতলা হয়ে এসেছে, বোধ হয় ওর টাক পড়বে। মেয়েটা এটা নীচে বসে এখন নিশ্চয় ভাবছে-রাজি হয় যেন হে ভগবান, রাজি হয় যেন। ওর ভগবান-তারকের মনে হল-এখন তারক সিংহ ছাড়া আর কেউ নয়।
সিঁড়িতে পায়ের শব্দ হচ্ছে। তারক ধাক্কা দিল সলিলের কাঁধে। ‘উঠে দাঁড়াও, কে আসছে যেন।’
ধড়মড়িয়ে সলিল দাঁড়াল। দরজায় দেবাশিসকে দেখে তারক চায়ের কৌটোটা এগিয়ে ধরে বলল, ‘চটপট চা করে দাও। উনুন যদি না ধরে থাকে তো স্টোভে কর।’
‘আপনি রাতে খাবেন তো?’
‘না না এখনি বেরোব, খেয়েই ফিরব।’
দেবাশিস যাওয়া মাত্র তারক বলল, ‘এসব খুব রিস্কি ব্যাপার, লাইফ নিয়ে টানাটানি হতে পারে, খরচও অনেক।’
‘আমার ছশো টাকা ব্যাঙ্কে আছে।’
তারক লক্ষ্য না করে পারল না, টানাটানির প্রসঙ্গটায় সলিলের মুখে উদবেগ বা শঙ্কা ফুটল না।
‘ডাক্তার, রাজি হবে কি না, তাও বলা যায় না।’
তারক ঘড়ি দেখল। এদের চা খাইয়ে বিদেয় করতে আরও আধঘণ্টা। তাহলেও ন-টা বাজতে অনেক বাকি থাকে। আশ্বস্ত হয়ে সে আলগাভাবেই বলে ফেলল, ‘তুমি ঠিক জানো কি, ওর পেট হয়েছে?’
‘ও যা যা বলেছে, তার সঙ্গে বই মিলিয়ে দেখেছি, তা ছাড়া বাড়িতেও তো বউদিকে দেখেছি।’ তারপর ইতস্তত করে সলিল বলল, ‘ওর ইউরিন টেস্টও করিয়েছি।’
‘ও কী বলে?’
‘কীসের?’
‘এই অ্যাবোরশন করানো সম্পর্কে?’
তারক সাবধান হল এবার। ‘পেট’ শব্দটা কেমন যেন মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। বোসদা ‘চুচি’ বলায় একবার সলিল ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে গেছল। পরে বলেছিল, ‘স্তনকে এমন কদর্য ভাষায় বলার কী যে কারণ, বুঝি না।’
‘কী আবার বলবে, সব কিছু আমার ভরসায় ছেড়ে দিয়েছে। এখন আপনি ছাড়া আর আমাকে বাঁচানোর কেউ নেই তারকদা।’
সলিলকে এগোতে দেখে তারক পিছিয়ে এল। আবার বোধ হয় পায়ে পড়বে। একটি যুবা দেহকে এই ভঙ্গিতে দেখার মতো কদর্যদৃশ্য আর কী হতে পারে। তাই তারক বলল, ‘নীচে চলো, ও অনেকক্ষণ একা বসে আছে।’
বলেই সে সলিলের পাশ কাটিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
ওদের দেখেই অনীতা সিধে হয়ে বসল। চোখে প্রভূত জিজ্ঞাসা। উপরে দু-জনের কী নিয়ে কথা হচ্ছিল তা নিশ্চয় জানে। তারক ভাবল, এইটুকু তো মেয়ে এতবড়ো একটা ব্যাপার যখন ঘটেছে নিশ্চয়ই কাঁটা হয়ে আছে উদবিগ্ন চিন্তায়। ওকে কিছু একটা বলে আশ্বস্ত করা দরকার। কিন্তু কীভাবে শুরু করা যায়!
‘তোমার বউদি এলে অনীতাকে নিয়ে একদিন আসবে, কেমন? নেমন্তন্ন করে রাখলুম।’
তারক সহজভঙ্গিতে, লঘু স্বরে সলিলের দিকে তাকিয়ে বলল এবং অনীতার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, ‘আসবে তো?’
ঘাড় নাড়ার আগে অনীতা অনুমোদনের জন্য সলিলের দিকে তাকাল। ভাসাভাসা চোখ, হাত, গলা, ঠোঁট, চিবুক-সবমিলিয়ে করুণার উদ্রেক করে। গুহ যে কী দেখে মজল তারক ভেবে পাচ্ছে না। শাড়ির বদলে হাফ প্যান্ট আর সার্ট পরে যদি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়, কেউ তো ফিরেও তাকাবে না।
‘আসব।’
‘তুমি কী খেতে ভালোবাসো?’
তারকের মনে হল, এই ধরনের কথাবার্তায় নেহাত বাচ্চচাদের মন থেকেই গুরুভার নামানো যায়। কলেজ ছাত্রীর জন্য অন্য ধরনের আলাপের ভাষা দরকার, সেটা যে একদমই জানে না। তবে একটা ব্যাপার অবশ্য ভালোভাবেই সে জানে কোনোদিনই ওদের নেমন্তন্ন করা হবে না।
‘যা পাই তাই খাই।’
এমনভাবে বলল যেন এইসব কথার কী উত্তর দিতে হবে ওর, জানা আছে। ওর স্বরে ক্লান্তি ফুটে উঠে যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে, এখন ধানাই-পানাই করে নষ্ট করার মতো মনের অবস্থা নেই। তারক ঘড়ি দেখতে দেখতে ভাবল চা করতে দেবুর এত দেরি হয় কেন?
‘তারকদা তাহলে কাল আপনার সঙ্গে কখন দেখা করব?’
‘অফিসেই তো দেখা হবে।’
‘ভাবছি, ক-দিন ছুটি নেব।’
‘আমার বন্ধু প্রণবের সঙ্গে কাল সকালে দেখা করে, তবেই তোমায় বলতে পারব। তুমি বরং দুপুরে একবার ফোন করো।’
চা নিয়ে দেবাশিস ঘরে ঢুকছে। তারক ভাবল, আবার একটা বেগার খাটার কাজ ঘাড়ে চাপল। গুহ যদি ওকে বিয়ে করে ফেলে বা বিষ-টিষ খেয়ে দু-জনের কেউ মরেও যায়, তাহলেই তো ল্যাঠা চোকে। কিন্তু এইভাবে কথাগুলো মনে হওয়ামাত্র তারক বিরক্তবোধ করল নিজের সম্পর্কেই। টুয়েলফথ ম্যানের মতো ভাবা হল যেন। খেলার আগের দিন ঠিক এইরকম একটা ভাবনা কিছুক্ষণের জন্য তার মাথায় ঝিলিক দিয়েছিল-ধ্রুব মুখুজ্যের কী বরেন মিত্তিরের যদি এখন দারুণ অ্যাকসিডেন্ট হয়! তাহলে আমি টিমে এসে যাব। চায়ে চুমুক দিতে দিতে তারক আড়চোখে ওদের দেখল। এদের কেউ বিষ-টিষ খেলে, সে ভাবল, আমি কোনো টিমের ভেতর চলে আসব? টিম কোথায়!
চার
খাট আলমারি দেওয়াল জানলা সব কিছুই যেন চেটে চেটে খাচ্ছিল। ঠেলে বেরিয়ে এসেছিল চোখ দুটো। তখনই মনে হয়েছিল মা এইবার মরবে।
