‘আমেরিকায় যাক না।’ রাণুর মা পরামর্শ দিলেন।
‘হ্যাঁ, কানাইদা একবার আমেরিকাটা ঘুরে আসুক।’ এতক্ষণে বিভূতি কথা বলার সুযোগ পেলেন।
‘ইচ্ছে করলেই কি যাওয়া যায়? আমেরিকা যাওয়া কি শক্তিগড়ে যাওয়া? টাকা লাগে নয়তো পরীক্ষার রেজাল্ট লাগে। নাও এবার ওঠো। কলকাতা পৌঁছতে পৌঁছতে দেখবে লোকে থলে হাতে বাজার যাচ্ছে।’
মোটরে ফেরার সময় কানাইলাল জিজ্ঞাসা করলেন আলপনাকে,’আলু, কেমন মনে হল রে? এই বৃন্দাবন আর তার গোপীটিকে?’
আলপনা বলল, ‘ভাবছিলুম মেয়েটাকে অন্নপূর্ণা অপেরায় নিয়ে নিলে কেমন হয়। অমন স্বর নিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ কি যাত্রা করেছে কানাইদা?’
‘করেছে কি না কী করে বলব, যেটা রয়ে গেছে বার কর।’
আলপনা তার কাঁধে ঝোলাবার চামড়ার থলিটা থেকে হুইস্কির পাঁইটটা বার করল।
‘আর একটা ছিল আসার সময় পুরোটা খাইনি।’
‘ওটুকু তরুণকে দিয়ে দিয়েছি, নতুন খেতে শিখেছে।’
‘বিভূতি একটা হাঁড়ি তুলে দিয়েছে, ওটা তুই নিয়ে নিস। ওতে ল্যাংচা আছে। তখন কী যেন জানতে চাইলি? নাকি স্বর নিয়ে যাত্রা? মেয়েরা আর ক-বছরই বা যাত্রায় এসেছে? আমি তো তেত্রিশ বছর এই লাইনে রয়েছি, এমন শাঁকচুন্নি মার্কা গলা শুনিনি। তুই একবার ভাব বাপমায়ের অবস্থাটা, এই মেয়েকে বিয়ে দেবে কী করে! শুধু তো গলা নয়, মাথাটাও! কীভাবে মাকে, পুরো ফ্যামিলিটাকে বসিয়ে দিল একটা সেনটেন্সে।’
দমদম চিড়িয়ামোড় ছাড়িয়ে গাড়ি যখন টালা ব্রিজে উঠছে কানাইলাল খালি বোতলটা রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, ‘গাড়ি থেকে যখন নামব তুই নামবি না। আমি একা দোতলায় উঠব দেওয়ালে হাত না ছুঁইয়ে।’
সেইভাবেই উঠলেন কানাইলাল। শোবার ঘরের দরজা পর্যন্ত গেলেন তারপরই সোজা অবস্থায় মেঝেয় আছড়ে পড়লেন।
৬
ডাক্তার রায়কে ঘুম থেকে তুলে আনল তোজু। তিনি কানাইলালকে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করে বললেন এখুনি হাসপাতালে নিয়ে যান, সল্টলেকের নামি ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান প্রাইভেট হসপিটালের সঙ্গে তিনি যুক্ত। সেখানেই নিয়ে যেতে বললেন। যাবার আগে তোজু মাকে বলল, ‘কিছু টাকা দাও। ওখানে দরকার পড়বে।’
কামিনী কুড়িয়ে কাড়িয়ে ছশো টাকা পেলেন। তাই নিয়েই তোজু রওনা হল ট্যাক্সিতে। কানাইলালের অবস্থা দেখে অক্সিজেন নল নাকে লাগিয়ে ই এম হসপিটালের ডাক্তার কাগজে ইঞ্জেকশনের নাম লিখে বললেন, ‘এখুনি এটা এনে দিন।’
ওষুধের দোকান কাছেই, তোজু ছুটে গেল। দোকানি জানাল ইঞ্জেকশনটার দাম পাঁচ হাজার টাকা। শুনে স্তম্ভিত তোজুর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল একটি শব্দ ‘অ্যাতওও’, সে দোকান থেকেই বাড়িতে টেলিফোন করল, ‘মা, পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়ে দাও নীলার হাত দিয়ে, একটা ইঞ্জেকশন কিনতে হবে।’
কামিনী বললেন, ‘টাকা পাব কোথায়!’
জোতু বলল ‘যেখান থেকে পার ধারধোর করে নয়তো গয়না বাঁধা দিয়ে। দেরি কোরো না। আমি ই এম হাসপাতালের রিসেপশন রুমে অপেক্ষা করছি, নীলা ট্যাক্সি নিয়ে চলে আসুক।’ বলার পর তার মনে পড়ল ভবেশ সাহার কথা। ‘মা, তুমি ভবেশ সাহার কাছে ফোন করে টাকা চেয়ে দেখো একবার।’
এরপর তোজু হাসপাতালে ফিরে এসে অপেক্ষা করতে থাকে। কামিনী ফোন নম্বর লেখা নোটবই থেকে ভবেশ সাহার নম্বর বার করে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলেন। দু-মিনিট ধরে ফোন বেজেই গেল কেউ রিসিভার তুলল না। নীলাও ডায়াল করল। একইভাবে বেজে চলল।
‘মা, ফোনটা বোধহয় আউট অফ অর্ডার হয়ে আছে।’
নোটবইয়ে একটা নাম দেখে কামিনী কয়েক সেকেন্ড ভাবলেন। আলপনা দত্ত, যাত্রার সেই মেয়েটাই হবে। দেখি একটা চেষ্টা করে। নম্বর দেখে নিয়ে ডায়াল করলেন, দু-বার রিং হবার পর রিসিভার উঠল।
‘কে বলছেন?’ পুরুষ গলা বলল।
‘আমি কানাইলাল সিংহের বউ, আলপনা আছে?’
‘ঘুমোচ্ছে, আপনি ধরুন ডেকে দিচ্ছি।’
কামিনী আঁচলে মুখ মুছে নার্ভাস চোখে নীলার দিকে তাকালেন। তিন মিনিট পর ফোনে বলে উঠলেন, ‘কে আলপনা? বউদি বলছি, ভীষণ বিপদে পড়ে গেছি। তোমার দাদা এখন হাসপাতালে। একটা ইঞ্জেকশন কিনতে হবে, আমার হাতে একটা পয়সা নেই, তুমি ধার দিতে পার? এক্ষুনি, পাঁচ হাজার টাকা।’
ঘুম জড়ানো গলায় আলপনা বলল, ‘কানাইদা কোন হাসপাতালে রয়েছেন?’
‘সল্টলেকে ই এম হাসপাতালে। দেবে টাকা?’
‘বউদি, আমাকে হাতে ধরে কানাইদা অভিনয় শিখিয়েছেন। গর্তে পড়া থেকে বাঁচিয়েছেন তাই আজ আমি আলপনা হতে পেরেছি। হাসপাতালে দাদার সঙ্গে কেউ কি আছেন? আমার চেনা এক ভদ্রলোক সল্টলেকে থাকেন তাকে ফোন করছি, দশ মিনিটের মধ্যে টাকা নিয়ে তিনি হাজির হবেন।’ আলপনার স্বরে নিশ্চিত প্রত্যয়ে ‘দশ মিনিট’ শব্দ দুটি বেজে উঠল।
‘ওখানে অপেক্ষা করছে আমার ছেলে তেজেশ।’
দুপুরে বাড়ি ফিরে এল তোজু। সে জানাল, বাবা এখন ভালো আছে। কয়েকটা পরীক্ষা ওরা করেছে আরও করবে। টাকা নিয়ে এক ভদ্রলোক এসেছিলেন কিন্তু আরও টাকা চাই। দিন সাতেক অবজার্ভেশনে ওরা রাখবে। অ্যাঞ্জিয়োগ্রাফ করাতে হবে তাতেই পনেরো হাজার টাকা পড়বে।’
কামিনী ভীত স্বরে বললেন, ‘সাতদিনে কত পড়বে?’
‘ঠিক করে বলতে পারল না। বলল ‘পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকার মতন হবে।’
‘এত টাকা সাতদিনে জোগাড় করব কী করে তোজু? তাহলে তো গয়না বিক্রি করতে হবে! তুই একবার প্রণবেন্দুর কাছে যা, যদি টাকা পোস্টাপিসে এসে গিয়ে থাকে।’
