‘কানাইদা ইনি বৃন্দাবন দাঁর পাড়ার লোক। একে জিজ্ঞেস করুন।’
‘নামটা জানলুম বৃন্দাবন, শুনলুম ভীষণ বড়োলোক। তা টাকাটা হল কীভাবে?’
লোকটি বিগলিত ‘নট দুলালের’ সঙ্গে কথা বলার সৌভাগ্যে। মাথা চুলকে বলল, ‘ওদের বিষয়-সম্পত্তি মেলা। দু-তিন পুরুষের টাকা। এককালে হাজার বিঘে ধানি জমি ছিল। চালের ব্যবসা, রাইস মিল, একটা সিনেমা হল, বর্ধমানে ওষুধের দোকান। আজকের যাত্রার খরচ তো উনিই দিচ্ছেন।’
কানাইলাল আঁতকে ওঠার ভান করে বললেন, ‘ওরে বাবা এ তো দেখছি টাকার তিমি, ভবেশ সাহার পূজ্যপাদ হবার যোগ্য। এমন একজনের সঙ্গে আত্মীয়তা রয়েছে, দূরসম্পর্কের হলেও, জেনে খুব গর্ব হচ্ছে! বিভূতি তাড়াতাড়ি আসতে বলো আলপনাকে।’
রাত দুটোয় যাত্রা শেষ হল। সাজঘরে বিভূতির পাশে এক বেঁটেখাটো স্থূলকায় উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের মধ্যবয়সি লোক, গলায় কণ্ঠি। গেরুয়া পাঞ্জাবি। দু-হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে। টাক ঢাকার জন্য চুল পাতাকাটা।
‘কানাইদা ইনি হলেন বৃন্দাবনবাবু। এর বাড়িতে আপনার খাওয়ার বন্দোবস্ত হয়েছে। আর দেরি করা নয়, চলুন যাওয়া যাক। ওখানেই মেকাপ তুলে নেবেন।’
‘হ্যাঁ আসুন।’ বৃন্দাবনের কণ্ঠস্বর মোলায়েম। ‘আপনার নামই শুনেছি আজ চোখে দেখলুম, অভিনয় চোখ জুড়িয়ে গেল। শিশির ভাদুড়ি দেখিনি, অহীন চৌধুরি, ছবি বিশ্বাসও দেখিনি, কলকাতায় কালেভদ্রে গেছি। দু-বার দেখেছি আমাদের কমল মিত্তিরকে রংমহলে, কী গলা ছিল আর আজ দেখলুম কানাই সিংগিকে। জানেন তো, আপনার কাকা হলেন আমার পিসেমশাই, আপন।’
কানাইলাল মনে করতে পারলেন না তার কাকাকে। তুতো কাকা তো পাঁচজন। তিনি কারোরই খবর রাখেন না। বৃন্দাবনের বাড়িটি যাত্রার আসর থেকে হেঁটে দু-মিনিট। লোহার গেট। বাড়িটি তিনতলা। বাইরের বারান্দা গ্রিল দিয়ে সুরক্ষিত।
একতলাতেই বিরাট খাবার ঘর। টেবলটায় আটটা চেয়ার। চারটি মেয়ে, বিভূতি আর কানাইলাল বসলেন। বাড়ির লোকেরা টেবল থেকে দূরে দাঁড়িয়ে। তাদের মধ্যে তিন-চার জন বাড়ির মেয়ে। সাদা খোলের চওড়া পাড় শাড়িপরা, নাকে কানে হিরের সঙ্গে দু-হাতে সোনার ঝলসানি দিয়ে যে বয়স্কা মহিলা প্লেটে প্লেটে লুচি রাখলেন তিনিই যে বাড়ির কর্ত্রী সেটা বুঝতে কারোরই অসুবিধে হল না। কানাইলাল অনুভব করলেন তার শরীরের ভিতরটা মাঝে মাঝে থরথর করছে, মাথা ভারভার লাগছে। উঠে পড়তে ইচ্ছে করলেও বসে থেকে ধীরে ধীরে খেতে থাকলেন।
‘রান্না কেমন হয়েছে বলুন?’ কর্ত্রী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বেশি রাত হবে যাত্রা ভাঙতে, তখন বেশি খেলে শরীর খারাপ লাগবে তাই অল্পই রান্না করেছি। আর একটা মাছ?’
‘না না, এই যথেষ্ট। আপনি ঠিকই বলেছেন। বেশি রাত হয়ে গেলে বেশি খাওয়া যায় না। মাছ আবার মাংস! এত করতে গেলেন কেন? বাড়িতে আমি রাতে দুটো রুটি আর একটু তরকারি ব্যস। আজই বরং বেশি খেয়ে ফেললুম শুধু রান্নার গুণে। নিশ্চয় আপনার হাতের কাজ।’ কানাইলাল আড়চোখে গৃহকর্ত্রীকে দেখে নিলেন। পুলক ও রোমাঞ্চ লাগলে কিশোরীদের মুখে যেমনটি হয় পঞ্চাশোর্ধ মহিলার সেই অবস্থা দেখে তার মজা লাগল।
‘নিরিমিষ্যি যা কিছু সব আমার করা, আমিষ করেছে রাণু, আমার মেজোমেয়ে। এই যে।’ তিনি ঠেলে সামনে এনে দিলেন বেনারসির মতো শাড়িপরা মায়ের মতোই একটি গোলগাল বছর কুড়ির মেয়েকে। এর অঙ্গে গহনার পরিমাণ মায়ের থেকে কিছুটা কম। কালো রঙের মুখে কিছু একটার প্রলেপ থাকায় বেগুনি আভা ফুটেছে। ভুরুর কেশ তুলে খিলেন করা। খোঁপায় জড়ানো গোড়ের মালা। দেখে মনে হয় বিয়ে বাড়ি যাবে। কানাইলাল বুঝলেন, যাত্রা এদের কাছে একটা বিরাট উৎসবের মতো। যাত্রার নামি নায়ক-নায়িকাকে বাড়িতে আনা, খাওয়ানো নিজেদের মর্যাদা বৃদ্ধির একটা উপায়। কলকাতায় টেস্ট ক্রিকেটারদের নিয়ে যা হয়ে থাকে অনেকটা সেইরকম।
‘মাংসটা তুমি রেঁধেছ?’ কানাইলাল ঠিক করে রাখলেন ‘হ্যাঁ’ শোনামাত্র দারুণ, অসাধারণ, ফাইভস্টার হোটেলের মতো, এমন একটা কিছু বলবেন।
কিন্তু তিনি খোনা স্বরে বলা একটা বাক্য শুনলেন, ‘আমি আবার কোথায় রাঁধলুম! সব তো লীলামাসি করেছে।’
কানাইলাল প্রথমে চমকে উঠেছিলেন রাণুর নাকি স্বর শুনে, এবার হতভম্ভ হলেন তার বুদ্ধির বহর দেখে। মা-কে এইভাবে ডুবিয়ে দিল যে তার মাথার মধ্যে কী থাকতে পারে ভেবে পেলেন না। দেখলেন যাত্রার মেয়েরা অবাক চোখে রাণুর দিকে খাওয়া বন্ধ করে তাকিয়ে। একটা অস্বস্তিকর অবস্থা। কথাবার্তা অন্যদিকে ঘোরাবার জন্য কানাইলাল বললেন, ‘বৃন্দাবনবাবুর কাছে জানলাম আপনারা আমার আত্মীয়। একবার আসুন না আমাদের বাড়িতে।’
বৃন্দাবন বললেন, ‘নিশ্চয় যাব। দক্ষিণেশ্বরে কল্পতরু উৎসবে যাব তখন দেখা করে আসব।’
‘আপনাদের বাড়িতে কে কে আছেন?’ বললেন বৃন্দাবন-পত্নী।
‘স্ত্রী পুত্র কন্যারা। বড়োমেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, আরও তিনটির বিয়ে দিতে হবে।’
রাণুর মা বললেন, ‘ছেলেরা কী করে?’
‘একটিই ছেলে এম এসসি পড়ে এইবার ফাইনাল দেবে।’
রাণুর মা স্বামীর দিকে তাকালেন। বৃন্দাবন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পাশ করে কী করবে?’
‘আগে তো পাশ করুক তারপর দেখা যাবে। রিসার্চের লাইনে যাবে না চাকরি করবে, না কলেজে পড়াবে।’
