‘ধীরা বলছিল শ্বশুরবাড়িতে থাকাটা খুব নিরাপদ মনে করছে না।’
‘তা হলে এখানে চলে আসুক। তোমার কোনো অসুবিধে হবে কি?’
‘মেয়ে এসে থাকবে এতে আমার আবার অসুবিধের কী!’ তারপর স্বগতোক্তির মতো করে কামিনী বললেন, ‘ভালো ছেলে বড়ো ঘর দেখে মেয়ের বিয়ে দিলুম, শেষে অদৃষ্টে এই ছিল! জয়দেবেরও বাপু মানিয়ে গুছিয়ে চলা উচিত ছিল, বড্ড গোঁয়ার ধরনের। কী দরকার ছিল দোকান ভাগ করে আলাদা হওয়ার? আলাদা হয়ে ব্যবসা করার টাকা তো নেই। ভাইয়েরা কি আর সাধে চটেছে?’
কানাইলাল এক চুমুকে গ্লাস খালি করে আলো নিভিয়ে শুয়ে বললেন, ‘আমার মুখে মদের গন্ধ। ওপাশ ফিরে শোও।’
৫
পরদিন তোজু জানাল, ‘যে অথরাইজেশন লেটারটা প্রণবেন্দুদাকে দিয়েছ তাতে সই করেছ কানাই সিনহা বলে, হবে কানাইলাল সিনহা। নতুন একটা চিঠি লিখে দাও। এই ভুলটা না করলে এতদিনে টাকা পাওয়া হয়ে যেত।’
‘আবার কেঁচে গণ্ডূষ! এটা তো প্রণবেন্দুর তখনই দেখা উচিত ছিল। কত ক্ষতি হয়ে গেল বল তো! চিঠিটার একটা জেরক্স কপি আছে, সেটা দে আর কাগজ কলম দে। বেচারা জয়দেব!’
চিঠি লিখে দিয়ে তোজুকে তিনি বললেন, ‘রাজমিস্ত্রির কথাটা মনে রাখিস, কাজ শুরু করতে দেরি করব না।’
শুক্রবার রাতে ভবেশ টেলিফোন করে জানালেন, ‘শনিবার ঠিক ছ-টায় গাড়ি যাবে, রাত দশটায় পালা শুরু হবে। দুপুরে খেয়ে দেয়ে ভালো একটা ঘুম দিয়ে নেবেন।’
কানাইলাল দুপুরে তার প্রিয় পুঁইশাক মাছের তেল ও কাঁটা দিয়ে রাঁধা ব্যঞ্জন দিয়ে প্রচুর ভাত খেয়ে আরামে ঘুমিয়ে বিকেলে উঠলেন, স্নান করলেন। পায়জামা পাঞ্জাবি পরে অপেক্ষা করছেন তখন সদর দরজা থেকে মোটরের হর্ন বাজল।
কামিনী জানলা দিয়ে উঁকি দিলেন, ‘একটা মেয়ে গাড়ি থেকে নামল। বোধ হয় যাত্রার মেয়ে, রংচঙ করা মুখ।’
সদর খোলা থাকে। মেয়েটি দোতলার দরদালানে উঠে এসে উঁচু স্বরে ডাকল, ‘কানাইদা আছেন? আমি আলপনা।’
ঘর থেকে কানাইলাল গলা তুলে বললেন, ‘কে রে আলু? ভেতরে আয়।’ কামিনীকে বললেন, ‘ওকে ভেতরে আনো।’
কামিনী দালানে বেরিয়ে বছর তিরিশের ছিপছিপে সুশ্রী আলপনাকে কড়া চোখে দেখে নিয়ে বললেন, ‘ভেতরে এসো।’
‘আপনি বউদি?’ আলপনা প্রণাম করল, কামিনীর চাহনি একটু নরম হয়ে গেল।
‘এখনও তো দশ মিনিট বাকি ছ-টা বাজতে। সঙ্গে আর কে আছে, চা খাবি?’ আলপনা ঘরে ঢুকতেই স্নেহমাখা গলায় কানাইলাল বললেন। কামিনীর দিকে তাকালেন, ‘সিমলের কড়াপাক আছে না? দুটো দাও আর চা।’
‘সঙ্গে তরুণ। কিন্তু ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পেটটা দম মেরে আছে। চা থাক শুধু একটা সন্দেশ। দাদার বাড়িতে প্রথম এলুম একটু মিষ্টি মুখে না দিলে বউদি শুনবেন কেন?’
কামিনী বেরিয়ে যেতেই কানাইলাল গলা নামিয়ে বললেন, ‘সঙ্গে নিয়েছিস তো?’
‘দুটো পাঁইট, গাড়িতে আছে।’ আলপনা ফিসফিসিয়ে বলল।
রাত সাড়ে ন-টায় গাড়ি পৌঁছল শক্তিগড়ে। আরও আগে পৌঁছনোর কথা, ট্র্যাফিকের জন্য তা সম্ভব হয়নি। আজ হঠাৎ গরম পড়ে গেছে, নভেম্বরে এটা হয় না। গাড়িতে কানাইলাল একটা পাঁইটের অর্ধেকেরও বেশি শেষ করেছেন, পুরোটাই করতেন আলপনা বোতল কেড়ে নেওয়ায় পারেননি। সেজন্য তিনি যৎপরোনাস্তি ক্ষুব্ধ। ক্ষোভটা তিনি উদ্গিরণ করলেন বিভূতি প্রামাণিকের উপর। বিভূতিকে এককথায় বলা যায় ভবেশ সাহার চোখ-কান-নাক, পোশাকি পদ অন্নপূর্ণার ম্যানেজার। দলের সঙ্গে সর্বত্র যান বগলে একটা ছোটো ব্যাগ নিয়ে। অতি বিনয়ী, মৃদুভাষী।
‘বিভূতি, খাওয়ার কী ব্যবস্থা হয়েছে?’ ঈষৎ জড়ানো স্বরে কানাইলাল বললেন।
‘এরা তো ভাত মাংসের ব্যবস্থা করেছে।’ বিভূতির সতর্ক গলা।
‘ভাত নয় আমি লুচি খাব। আর ল্যাংচা। শক্তিগড়ে এসে যে ল্যাংচা না খায় সে ব্যাটা মিষ্টির কিসসু জানে না। খাব আর এক হাঁড়ি নিয়ে যাব।’ দ্বিরুক্তি না করে বিভূতি সাজঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন লুচি আর ল্যাংচার ব্যবস্থা করতে। কানাইলাল সার দিয়ে মেঝেয় বসে মেক আপে ব্যস্ত অভিনেতাদের দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন। ঘামছেন। রুমালে কয়েকবার মুখ মুছলেন। তক্তপোশে রাখা তাকিয়া টেনে কোলে নিয়ে ঝুঁকে বসলেন।
একটু পরে বিভূতি এলেন। কানাইলালের কানে কানে বললেন, ‘দাঁয়েদের বাড়িতে আপনার আর মেয়েদের খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। বলে দিয়েছি আপনি লুচি খাবেন। মেয়েরা ওই বাড়িতেই একতলার একটা ঘরে মেক আপ নিচ্ছে। বৃন্দাবন দাঁ ভীষণ বড়োলোক।’
রুক্ষ স্বরে কানাইলাল বললেন, ‘কথাটা বললে কেন? ভীষণ বড়োলোক তো আমার কী?’
‘আপনার বাবার নাম করতেই বললেন, ‘ওরে বাবা বেনেটোলার কেষ্ট সিংগির ছেলে! খুব নামি ঘর।’ বললেন আপনার এক কাকার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে ওনার ছোটোপিসির।’
‘ভদ্রলোকের নামটা কী, বয়স কত?’ কানাইলাল কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলেন।
জিভ কেটে বিভূতি বললেন, ‘ওটাই তো জানা হয়নি। আচ্ছা আমি জেনে এসে বলছি।’
বিভূতি জানতে গেলেন। কানাইলাল তাকিয়ায় মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লেন। তরুণ এক অভিনেতা সশ্রদ্ধ স্বরে বলল, ‘কানাইদা মেক আপ করবেন না? আপনার তো প্রথম সিন।’
কানাইলাল উঠে বসলেন। যেটুকু নেশা হয়েছিল তা ছুটে গেছে। মেক আপ অবশ্য সামান্যই। সামাজিক যাত্রা, দরিদ্র পরিবারের বাবা হতে হবে। চুল আর মুখে রং বদলানো ছাড়া আর কিছু করার নেই। আধময়লা ধুতি আর বগল-ছেঁড়া গেঞ্জিটা পরে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন নায়িকা আলপনার জন্য, একসঙ্গে দু-জনে আসরে যাবেন। বিভূতি একটি লোককে তখন সঙ্গে করে হাজির হলেন।
