তোজু শুনতে শুনতে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। বাবার কনুই চেপে ধরে বলল, ‘বাবা এক্ষুনি যাত্রা শুরু করলে তোমার প্রাণসংশয় হতে পারে। ডাক্তার রায় এমনই আমাকে বলেছেন, খুব সাবধানে এখন তোমায় জীবন কাটাতে হবে।’
‘তোজু, এক একজনের সাকসেস এক এক ভাবে আসে। আমি গণ্ডমুখ্যু। আমি শম্ভু মিত্র নই, তারাশঙ্কর মেঘনাদ সাহা নই, উদয়শঙ্কর সত্যজিৎ নই, হেমন্ত মুখুজ্জেও নই। যতটুকু সাকসেস পেয়েছি অন্নপূর্ণা অপেরার দৌলতে যাত্রার অ্যাকটর হয়ে। এটা ছাড়া আমার সামনে আর কোনো রাস্তা ছিল না নিজেকে জাহির করার। খুব বড়ো একটা কিছু করছি বলে কোনোদিন ভাবিনি। শুধু ভেবেছি সংসার চালানোর জন্য রোজগার করতে হবে। তাই করতে করতে নাম করে ফেললুম। এটা স্রেফ পড়ে পাওয়া ধন চোদ্দো আনা। দেখছিস যাত্রার অভ্যেস কীরকম মজ্জায় ঢুকে গেছে! তোকে কেমন একটা ডায়লগ ঝেড়ে দিলুম।’ কানাইলাল হাসতে শুরু করলেন, হাসিতে শব্দ হল না। ‘যদি এনকোর দিস তা হলে কিন্তু রিপিট করতে পারব না।’
‘বাবা, তোমার নিজস্ব কোনো শখ কি সাধ ছিল না যা পূর্ণ করতে পারনি?’ বাবার বাহু ধরে হাঁটছে তোজু, স্বর নামিয়ে জিজ্ঞাসা করল।
‘শখ? সাধ?’ কানাইলাল সামনে নন্দলালের ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ‘একটা নতুন অ্যাম্বাসাডার। দাদা কিনেছিল সেকেন্ডহ্যান্ড, আমি কিনব নতুন। টাকা জমাচ্ছিলুম, ধীরার বিয়েতে খরচ হয়ে গেল। আবার জমাতে শুরু করি এটাও খরচ হয়ে যাবে। খরচগুলো এমন আচমকা ঝপ করে সামনে লাফিয়ে এসে পড়ে না? জানি এবারও আর গাড়ি কেনা হবে না। যাক গে।’ কানাইলাল মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিলেন বিষয়টা।
ওবাড়ির তিনতলার ছাদে দুটি তরুণী গল্প করতে করতে ঘুরছে। ওদের দিকে তাকিয়ে কানাইলাল বললেন, ‘ওবাড়িতে কারা থাকে বল তো? সব ফ্ল্যাটেই তো এসি মেসিন দেখি, পয়সাওলা লোক, কী করে জানিস?’
‘সবার জানি না। তিনতলায় স্বামী-স্ত্রী স্কুল মাস্টার, স্বামীর টিউটোরিয়াল আছে, তার পাশে ডাক্তার। দোতলায় অবাঙালি, মণিমুক্তোর ব্যবসা করে আর একজন ব্যাঙ্ক ম্যানেজার। একতলাটা তো জ্যাঠামশায়ের।’
‘সনৎ তো দিল্লিতে থাকে?’
‘হ্যাঁ। ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড কমার্স মিনিস্ট্রিতে আছে।’
‘প্রচুর টাকা নিয়ে দাদা ওর বিয়ে দিয়েছে, তেমনি প্রচুর টাকা দিতেও হয়েছে মেয়ের বিয়েতে। পূর্ণ এখনও হায়দ্রাবাদেই আছে, জামাই বদলি হয়নি?’
‘বলতে পারব না। ওদের অত খোঁজখবর রাখি না। শুধু জানি সঞ্জীবদা ঘুষ নিতে গিয়ে ধরা পড়েছিল। তারপর কীভাবে যেন ম্যানেজ করে নেয়।’
সেই ফ্রক পরা কাজের মেয়েটিকে কানাইলাল আবার দেখতে পেলেন, ছাদে দুই তরুণীর সঙ্গে কথা বলছে। এখন ফ্রক নয়, সালোয়ার-কামিজ পরা, চুলে রিবন। মুখ পরিষ্কার ঝকঝকে।
তোজু বলল, ‘ওই মেয়েটাকে সেদিন ধমক দিয়েছি। দুপুরে সিঁড়ির জানলায় বসে টোপা কুল খাচ্ছে আর বিচিগুলো ছুড়ে ছুড়ে আমাদের কলঘরের মধ্যে জানলা দিয়ে ফেলছে, আমি তখন কলঘরে ছিলুম দেখতে পায়নি। টেনে এক ধমক দিতেই দুড়দুড় করে নীচে নেমে গেল।’
‘কলঘরের জানলার নতুন পাল্লা লাগাতে হবে, কাপড় টাঙিয়ে আর চলছে না। তুই রাজমিস্ত্রির খোঁজ তাড়াতাড়ি নে সেইসঙ্গে ছুতোর মিস্ত্রিরও। হাতে টাকা থাকতে থাকতে ব্যাপারগুলো সেরে ফেলতে হবে। কলঘরটা বড্ড বেআব্রু জানলার জন্য। চল এবার নীচে যাই।’ সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বললেন, ‘মাঠে যাসটাস? কার্ডটা রিনিউ করতে কখনো ভুলিসনি।’
পয়লা তারিখে সন্ধ্যায় নিমতলা স্ট্রিটে অন্নপূর্ণা অপেরার গদিতে কানাইলাল হাজির হলেন। ব্যস্ত হয়ে উঠলেন ভবেশ সাহা। হাঁকডাক করে কোকাকোলার বোতল আনালেন। কানাইলাল খেলেন না, কাজের কথায় এলেন।
‘নেক্সট যাত্রা কবে?’
‘সামনের শনিবার শক্তিগড়ে। অন্তত তিরিশবার করেছেন ‘ছেঁড়া চটি ছেঁড়া আঁচল।’ পরিশ্রম কম হবে, ভোরেই বাড়ি পৌঁছে যাবেন। শিবু নতুন একটা কমিক সিন ঢুকিয়েছে তাতে অবিশ্যি আপনি নেই। তবে রবি সোম পরপর দু-দিন আছে, তমলুকে আর বাজকুলে, কাছাকাছি। তমলুকে হোটেলে থাকবেন। পুরোনো পালা ‘লক্ষ্মীর ঘরে অলক্ষ্মী,’ একবার পড়ে নেবেন নাকি?’ ভবেশ পাঁচালি পড়ার মতো বলে গেলেন।
‘হ্যাঁ, খাতাটা দিন। আজকাল মেমারিটা কেমন গোলমাল করছে। আপনার মালদা বহরমপুরটা কবে?’
‘বাজকুলের পর গঙ্গার ওপারে আপাতত বায়না নেই। এপারে মালদা দিয়ে শুরু তারপর বহরমপুরে, বসিরহাটে, শেষ মধ্যমগ্রামে।’
‘ফোন করে জানিয়ে দেবেন শনিবার কখন গাড়ি পাঠাচ্ছেন।’
নাটকের খাতা নিয়ে কানাইলাল ফেরার পথে ট্যাক্সি থামিয়ে হুইস্কি কিনে বাড়িতে ঢুকলেন।
রাত্রে খাটে উঁচু বালিশে পিঠ রেখে পা ছড়িয়ে কানাইলাল ‘লক্ষ্মী-অলক্ষ্মী’ পড়ছিলেন, পাশের টুলে হুইস্কির গ্লাস। শুতে এলেন কামিনী।
‘আর কতক্ষণ পড়বে? পড়ারও একটা ধকল আছে।’
‘হ্যাঁ, যাত্রা করার থেকেও বেশি ধকল।’ নিস্পৃহ স্বরে বললেন কানাইলাল।
কামিনী চুপ করে রইলেন। কানাইলাল খাতাটা পাশে রেখে বললেন, ‘ধীরা আর কিছু বলল?’
‘ফোনে আর কত বলা যায়। ভাইয়েরা জয়দেবকে মারধোর করেছে শুধু এইটুকু বলল। আর বলল, বাবা টাকা জোগাড় কবে করবে?’
‘তোজু কাল একবার প্রণবেন্দুর বাড়িতে যাক। পোস্টাফিসের এজেন্ট, ও ব্যাপারটা বোঝে। টাকা তোলার জন্য অথরিটি লেটার তো ওকে দিয়েছি। জিপিও থেকে অর্ডার এল কি না সেটা প্রণবেন্দুকে খোঁজ নিতে বলুক। ধীরাকে ক-টা দিন অপেক্ষা করতে বলো। শনিবার শক্তিগড় যাব তারপর থেকে তো টানা যাত্রা চলবে। আমি আর সময় পাব না।’
