‘এই তো আমাকে আবার খেলাচ্ছেন। পঁচাত্তর, রাজি হয়ে যান। গেস্ট হাউসে অনেক টাকা লাগাতে হবে।’
‘এক পয়সাও কম নয়।’ কানাইলাল স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন ভবেশের দিকে। বুঝলেন লোকটা দ্রুত হিসেব কষছে।
‘আচ্ছা এক লাখ তবে এক্ষুনি দিতে পারব না। মাসখানেক সময় দিন।’
কানাইলাল ভেবে নিলেন জয়দেবকে এই এক লাখ ছাড়া আরও এক লাখ দিতে হবে। সেটা দিতে হলে পোস্ট অফিসের অনেকগুলো সার্টিফিকেট ভাঙাতে হবে। সরকারি ব্যাপার, তিনদিনে যে কাজ হওয়া উচিত সেটা একমাসও লেগে যেতে পারে। ওগুলো ম্যাচিওর করেনি, এখনও ছ-মাস থেকে চার বছর বাকি। সেজন্য সুদের টাকা কম পাওয়া যাবে, ব্যাঙ্ক থেকে তুলে বাকিটা পূরণ করে দু-লাখ হয়ে যাবে।
‘এক মাস, ঠিক বলছেন নড়চড় হবে না?’
‘ঠিক বলছি। আজ সতেরো তারিখ সামনের সতেরোয় ক্যাশ দিয়ে যাব।’
‘সামনের পয়লা তারিখে আমি গদিতে যাব তারপর।’
৪
কানাইলাল বিকেলে ছাদে পায়চারি করছেন। আট বছর পর ছাদে উঠলেন। শেষবার উঠেছিলেন বিশ্বকর্মা পুজোর দিন।
বারো বছরের মজু বাবার ঘুড়ি ওড়ানো দেখছিল। ওর দুই দিদি ধীরা, নীলা আর দাদা তোজুও ছিল ছাদে। একটা ঘুড়ি ভোকাট্টা হয়ে ভেসে যাচ্ছিল ছাদের উপর দিয়ে, পাঁচিল ঘেঁষে রাস্তায় নেমে যাচ্ছে। মজুর মাথার উপর দিয়ে কাটা ঘুড়ির সুতো চলে যাচ্ছে। সে সুতোটা ধরার জন্য ছুটল। নীচু পাঁচিলে ঝুঁকে হাত বাড়ায় ধরার জন্য। কোমর থেকে শরীর বার করে সুতো ধরতে গিয়ে ভার সামলাতে পারেনি। চারজনের চোখের সামনে মজু উলটে দিয়ে নীচের রাস্তায় পড়ে যায়। দুর্গাপুজোয় পরার জন্য মজুর নতুন জামা প্যান্ট আর জুতো কামিনী আলমারিতে তুলে রাখে। প্রতি বছর বিশ্বকর্মা পুজোর দিন সেগুলো বার করে শোয়ার ঘরের টেবলে সাজিয়ে ফুল ছড়িয়ে দেয়।
ছাদে পায়চারি করতে করতে কানাইলাল পাঁচিলের ধারে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে নীচে তাকালেন। গাঁথুনি চুন সুরকির, পাঁচিলের উপরের ইটের পলেস্তারা খসে পড়ে ইট আলগা হয়ে রয়েছে। কানাইলাল সরে এলেন। তার মধ্যেই দেখে ফেলেছেন কার্নিশে একটা অশ্বত্থ গাছ ডালপালা মেলে ঝাঁকড়া হয়ে উঠেছে। ছাদের মেঝেয় ফাটল ধরে নীচের কলঘরে জল পড়ত। তোজু পিচ লাগিয়ে ফাটল বোঁজায়। একটা কালো সাপের খোলসের মতো হয়ে রয়েছে। কানাইলাল পায়চারি করতে করতে স্থির করলেন শুধু ছাদটাই নয় গোটা বাড়িটাই সারাতে হবে, পুবমুখো হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। দাদা বাড়িটা প্রমোটারকে দিয়ে ভেঙে নতুন তিনতলা ফ্ল্যাট বাড়ি তুলেছে। নিজের জন্য নীচের তলা বাকি দুটো প্রমোটারের। চার ঘর পরিবার তাতে বাস করে। ফ্ল্যাটগুলো প্রশস্ত।
ওবাড়ির ছাদে একটি ফ্রকপরা মেয়ে শুকনো কাপড় দড়ি থেকে তুলছে। কানাইলাল পাঁচিলের ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন। মেয়েটি বার দুই-তিন তার দিকে তাকাল। কানাইলাল হাসলেন, মুখ নামিয়ে মেয়েটি তাড়াতাড়ি ছাদের দরজার দিকে চলে গেল। তার মনে হল মেয়েটি গ্রাম থেকে এসেছে, কৈশোর শরীর ছুঁয়েছে। এইরকম একটি মেয়ে তাদের সংসারেও কাজ করতে এসেছিল হুগলির এক গ্রাম থেকে। বছর দুয়েক পর চোদ্দো বছরের মেয়েকে ওর মা বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যায় বিয়ে দেবার জন্য, এই মেয়েটি কতদিন থাকবে? বড়োজোর আর বছরখানেক।
‘বাবা বিকেলের ওষুধটা খেয়েছ?’
তোজু ছাদে উঠে এসেছে। কানাইলাল হাত তুলে বললেন, ‘হ্যাঁরে বাবা খেয়েছি। তোজু তুই ছাদে আর উঠিস না বোধহয়, কী অবস্থা হয়েছে দেখেছিস? এবার সারাতে হবে। বহু বছর কলি পড়েনি সেই ধীরার বিয়ের সময় ঘরগুলো আর দালানটা চুনকাম হয়েছিল। তোর চেনা রাজমিস্ত্রি থাকলে আসতে বল, একটা এস্টিমেট আগে দিক। আর শঙ্করের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নে। সার্টিফিকেটগুলোয় তো পাঁচদিন আগে সই করিয়ে নিয়ে গেল। কবে টাকা পাওয়া যাবে সেটা যদি বলতে পারে।’
‘টাকা তোলার হঠাৎ দরকার পড়ল কেন?’ বাবার পাশে হাঁটতে হাঁটতে তোজু কৌতূহল দেখাল। কানাইলাল দাঁড়ালেন।
‘একটাই কারণ। জয়দেব ভাইদের আর দোকানটা নিয়ে বিপদে পড়েছে।’ কানাইলাল আবার চলতে শুরু করলেন। ‘ওর ভাই দুটো কী জিনিস জানিস তো। ছেলেটার উচ্চচাকাঙ্ক্ষা আছে, বড়ো হতে চায়। নতুনভাবে ব্যবসা করতে চায়। এটা আমার খুব ভালো লেগেছে। ওকে আমি সাহায্য করতে চাই। কাউকে বলিনি, জয়দেব আমার কাছে দু-লাখ টাকা চেয়েছে। এক লাখ ব্যাঙ্ক আর পোস্টাপিস থেকে ম্যানেজ করতে পারব, বাকি এক লাখ চেয়েছি ভবেশের কাছে। ও দেবে বলেছে তবে ওর লোকসান যাতে না হয় সেটা আমায় দেখতে হবে।’
তোজু থমকে দাঁড়িয়ে বলল, ‘দেখতে হবে মানে? কীভাবে দেখবে?’
‘যাত্রা করে দেনা চোকাব বলেছি।’
‘এই শরীর নিয়ে যাত্রা!’
‘আমি এখন ফিট। মাইল্ড স্ট্রোক হয়েছে বলে তো রোজগার বন্ধ করে বাড়িতে বসে থাকা যায় না। স্ট্রোক হওয়া মানুষদের ব্যক্তিগত নানান সমস্যা থাকে, ডাক্তাররা তো সেটা বোঝে না। ওরা কেতাবি বিদ্যেমতো রুটিন আউড়ে যায়। ওসব মানলে আমার চলবে না। তোর লেখাপড়ার খরচ, বাড়িটা সারানো, জয়দেবের সমস্যা মেটানো, নীলার বিয়ের কথা ভাবতে হচ্ছে, সেটাও তো বড়ো এক খরচের ব্যাপার, আপাতত এইগুলোই আমাকে দুর্ভাবনায় ফেলেছে। তোজু, যাত্রায় আমাকে নামতে হবেই আর এই পয়লা থেকেই। জানি তুই কী বলবি কিন্তু আমি তা শুনব না। বাঁচতে হলে ভালোভাবে বাঁচা উচিত। যেসব কাজ করে যেতে পারলে সুখ বোধ করব, সেই কাজগুলো করতে পারাই ভালোভাবে বেঁচে থাকা। তোজু, তুই আমাকে সাহায্য কর, আমাকে ভালোভাবে বাঁচতে দে।’
