জয়দেব চলে যাবার পর নীলা জিজ্ঞাসা করল, ‘বাবা, কীসের খবর তুমি দেবে?’
‘তেমন কিছু নয়। ব্যবসার একটা পার্টনার খুঁজছে যে টাকা ঢালবে। বললুম খোঁজ পেলে জানাব। আজকের খবরের কাগজটা কোথায় রে?’
তোজু ওষুধ কিনে এনেছে। দুটো বড়ি বাবাকে খেতে দিয়ে বলল, ‘দুপুরে খাওয়ার পর এইটা, রাতে খাওয়ার পর এইটা।’ ওষুধের দুটো পাতা তুলে দেখাল। ‘এখন তো বেশ ভালোই আছ মনে হচ্ছে। তবে বাড়ির বাইরে ক-টা দিন আর যেয়ো না। ভারী কিছু তুলো না, ছাদে গিয়ে একটু হাঁটতে পারো, হজম হয় এমন হালকা খাবার খেতে হবে। দুটো ব্লাড টেস্ট করিয়ে নিতে বললেন ডাক্তারবাবু।’
‘আর? উপুড় হয়ে নয়, চিৎ হয়ে শুতে হবে, রোজ নয় দু-দিন অন্তর দাড়ি কামাতে হবে।’
‘ঠাট্টা নয়। তোমার ব্লাড প্রেশার নর্ম্যালের অনেক ওপরে। দুশ্চিন্তা, উত্তেজনা হয় এমন ব্যাপার থেকে দূরে থাকতে বলেছেন।’
‘দুশ্চিন্তা তো তুই মাথায় ঢুকিয়ে দিলি অতগুলো নিষেধ জারি করে।’
বিকেলে ভবেশ সাহা এলেন। সদাব্যস্ত মানুষ। অবশ্য ব্যস্ত থাকারই কথা। চারটে ব্যবসা। দুটো দোকান ছাড়াও সামলাতে হয় অন্নপূর্ণা অপেরাকে। ধুতি ফুটশার্ট পাম্পশ্যু, ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, পাঁচ ফুট দু-ইঞ্চি, ঘাড়ে গলায় চর্বি। খসখসে কণ্ঠস্বর, ভবেশ সাহার এটাই বাইরের চেহারা। ভিতরের রূপটি সম্পর্কে নানান মত আছে। কেউ বলেন ওর মাথা থেকে পা পর্যন্ত একটা হিসেবের খাতা। অনেকের মতে খাতা নয় কপাল। কোনো ব্যবসায় লোকসানের মুখ দেখেননি।
‘কী হল কানাইবাবু? ছেলে তো ফোন করে বলল বাবার স্ট্রোক হয়েছে, কতবার আপনাকে বলেছি ওইসব ছাইপাঁশ খাবেন না। ডাক্তার কী বলছে? আপনাকে তো এখন বেশ ফিট দেখাচ্ছে।’ ভবেশের স্বরে কিঞ্চিৎ সন্দেহের মিশেল। কোনো কিছু প্রথমেই তিনি বিশ্বাস করে নেন না, ওর ব্যবসায়িক সাফল্যের এটা অন্যতম কারণ।
‘দেখাচ্ছে তো বটেই, আমি তো চিকেন পক্সের রোগী নই যে চামড়ায় রোগ ফুটে থাকবে। টেবলে কার্ডিয়োগ্রাফটায় সব বলা আছে, দেখে নিন।’ কানাইলাল আঙুল দিয়ে দেখালেন। সত্যমিথ্যা সন্দেহ ভঞ্জনের জন্য ভবেশ টেবলের কাছে গিয়ে কাগজের ফিতেটা দেখলেন। কী বুঝলেন কে জানে। প্রেসক্রিপশনটা পড়লেন, ওষুধের পাতাগুলো নাড়াচাড়া করে ফিরে এলেন।
‘ডাক্তার কী বললেন?’
‘রেস্ট। দু-মাস।’ শান্তমুখে বললেন কানাইলাল।
‘ওটা দু-হপ্তা হয় না?’
‘হয়। পাঁচ লাখ টাকার একটা লাইফ ইন্সিয়োরেন্স যদি করে দেন।’
‘ইন্সিয়োরেন্স আপনার করা নেই!’ ভবেশ তাজ্জব হয়ে গেলেন।
‘আপনার করা আছে?’
ভবেশ ডান হাত তুললেন বললেন, চার আঙুলে পাথর বসানো আংটি। ‘পঁচাশি বছরের আগে মরব না। মিছিমিছি প্রিমিয়ামের টাকা গুনব কেন? দু-হপ্তা না হলে বেশ তিন হপ্তা? সত্যচরণকে দিয়ে নয় চালিয়ে দোব এই ক-টা দিন। মালদা আর বহরমপুরে চারটে বায়না রয়েছে সামনের মাসে। আপনি আর আলপনা আসরে না নামলে কোনো পার্টি ফুল পেমেন্ট করবে না বলেছে। কানাইবাবু, বহু হাজার টাকা লোকসান হয়ে যাবে। শিবুকে দিয়ে নতুন পালা লেখাচ্ছি, পৌরাণিক। এখন দেবদেবীদের লীলাখেলা লোকে আবার দেখতে চায়। টিভি সিরিয়ালগুলো দেখেন না তো, দেখুন। যদি সমাজকে বুঝতে চান তা হলে রামায়ণ মহাভারত দেখুন। রাস্তা সুনসান ফাঁকা। সারা দেশ টিভির সামনে বসে। এই পাবলিকই আমার লক্ষ্মী। শিবুকে বলেছি পাশা খেলা আর বস্ত্রহরণের ঘটনাদুটো নিয়ে মহাভারতের একটা পিস হাইলাইট করে পালা লিখে দিতে।’
‘আপনি বলছেন লোকে দেখবে?’
ভবেশ ঊরুতে চাপড় মেরে বললেন, ‘দেখবে না মানে গোগ্রাসে দেখবে! নট দুলাল শকুনি পাশা খেলছে, সাট্টার রমরমা দেখেননি? ভাগনেদের কুপরামর্শ দিচ্ছে, বোকা যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীকে বাজি ধরল, হারল। তারপর দুঃশাসনের খেল। আলপনা দাঁড়িয়ে থাকবে আর তরুণ শাড়ির আঁচল ধরে ওকে ঘুরে ঘুরে শাড়ি খুলবে, খুলতে খুলতে শায়া-সিনটা একবার ভাবুন আলপনার ফিগারটাও সেই সঙ্গে ভাবুন।’
‘ভেবেছি। এই মহাভারত আগে লেখা হোক তো, অনেক দেরি আছে। তবে তিন মাস আমি বাড়ি থেকে বেরোচ্ছি না।’ কঠিন গলায় কানাইলাল কথা শেষ করলেন। ওর মুখের ভাব লক্ষ করে ভবেশ আর কথা বাড়ালেন না।
‘বেশ। শরীর মানুষের সম্পদ, আপনাকে সম্পদ নষ্ট করতে বলব না। হাজার ষাটেক টাকা গচ্চচা যাবে, যাক। শরীরও সম্পদ টাকাও সম্পদ তবে শরীরের দাম বেশি। টাকা গেলে টাকা আসে, শরীর গেলে আর আসে না।’ ভবেশ উঠে দাঁড়ালেন। ‘আপনাকে আমার দরকার, আপনারও আমাকে দরকার।’
ভবেশ দরজার বাইরে জুতোয় পা গলাচ্ছেন তখন কানাইলাল তাকে ডাকলেন।
‘একটা অনুরোধ করব। রাখলে আপনার অনুরোধটাও রাখব।’
জিজ্ঞাসু চোখে ভবেশ তাকিয়ে রইলেন।
‘তিন সপ্তাহ পর্যন্ত আমাকে রেস্ট দিতে চেয়েছেন তিন মাসের বদলে। আমি দু-সপ্তাহ রেস্ট নিয়ে আবার যাত্রা করব।’
ভবেশ জুতো থেকে পা বার করে ঘরে ঢুকে এলেন।
‘আমাকে এক লাখ টাকা দিতে হবে।’
‘কী ব্যাপার? অ্যাতো টাকা!’
‘অ্যাডভান্স, যাত্রা করে শোধ দোব। রাজি?’
‘হলদিয়ায় একটা গেস্ট হাউস করতে যাচ্ছি। এক লাখ টাকা এখন তো দেওয়া মুশকিল। মেরে কেটে হাজার পঞ্চাশ দিতে পারি। না কানাইবাবু এর বেশি পারব না।’ হাতজোড় করলেন ভবেশ সাহা।
‘তা হলে আমিও প্রাণের ঝুঁকি নেব না।’ কানাইলাল মনে মনে বললেন, পিঁপড়ে টিপে গুড় বার করো ভবেশ, তোমাকে হাড়ে হাড়ে চিনি।
