‘সব বাজে কথা। আমাকে ভয় দেখাবার জন্য বলেছে যাতে বাড়িতে বন্দি করে রাখা যায়। এই দ্যাখ আমি ফিট।’ বলেই কানাইলাল তড়াক করে বিছানায় উঠেহাঁটু গেড়ে বসে একটা ডিগবাজি দিয়ে সদর্পে জামাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
‘গ্যাস জমে বুকে সামান্য ব্যথা হয়েছিল। সেটাকেই মাইল্ড অ্যাটাক বলে রটাচ্ছে।’
এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল ধীরা। সে বলল, ‘বাবা বাহাদুরি আর দেখিয়ো না। এই বয়সে ডিগবাজি দিলে মটাস করে শিরদাঁড়া ভেঙে যাবে। ডাক্তার যা বলবেন তাই করো। দেখছ না ডাক্তারের কথা অগ্রাহ্য করে ওর চেহারা কী হয়েছে? দুশ্চিন্তা বলে দুশ্চিন্তা! ব্যবসায় টানাপোড়েন তার সঙ্গে মামলা।’
কানাইলাল জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন জামাইয়ের দিকে। জয়দেব বলল, ‘কী কুক্ষণেই যে দোকানটা ভাগ হয়েছিল। আগে জ্যাঠামশাই ছিলেন মাথার ওপর, তিনিই সব কিছু চালাতেন। এখন আমাদের ভাগের দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর। সেটা পছন্দ হল না আমার দুই ভাইয়ের। ওদের বললুম এই রেডিমেড গার্মেন্টসের দোকান যেভাবে চালানো হচ্ছে সেভাবে আর চলবে না। মডার্ন টেস্টের মালপত্তর রাখতে হবে, নতুন করে দোকান সাজাতে হবে। এজন্য দরকার কম করে দু-লাখ টাকা, অথচ হাতে টাকা নেই। বললুম তোরা টাকা জোগাড় কর, না পারলে অন্য কোনো ব্যবসা ধরা যায় কি না সেটা দেখ, ভেবেচিন্তে কিছু একটা কর।’
ধীরা বলল, ‘তোমরা কথা বলো আমি ওঘরে যাচ্ছি। পরশু মা ফোন করেছিল কী যেন বলবে আমাকে, শুনে আসি।’
ধীরা বেরিয়ে যাবার পর জয়দেব শুরু করল, ‘জনা এক মাড়োয়ারি ছোকরাকে আনল। সে আইসক্রিম পার্লার করতে চায় দোকানের অর্ধেকটা ভাড়া নিয়ে। এককথায় ভাগিয়ে দিলুম। তাইতে জনা রেগে আগুন। যাচ্ছেতাই বলল আমাকে। বিষ্টুও আনল একটা পার্টি কিন্তু একই ব্যাপার ফিফটি-ফিফটি পার্টনারশিপে উপহারের, ঘর সাজাবার জন্য পেতলের কাঠের, পাথরের জিনিস বিক্রি করবে। মালপত্তর ওরা দেবে আমরা দেব ঘর। ক্যাশেও বসবে ওদের লোক, আমরা হব সেলসম্যান। পত্রপাঠ বিদেয় করি। একটা ফ্রেঞ্চ কোম্পানি, ওয়ার্ল্ড ফেমাস, নানারকম চামড়ার ব্যাগ আর সুটকেস তৈরি করে, ওরা কলকাতায় সেলস আউটলেট খুঁজছে। কপাল ঠুকে চিঠি দিলুম, ইন্সপেক্ট করে লোকেশন পছন্দ হল ওদের। কমিশন দেবে থার্টিথ্রি পারসেন্ট। তবে আর্নেস্টমানি তিন লাখ দিতে হবে। নিউ মার্কেটের মতো জায়গা যত ছোটোই হোক কেউ কি ছাড়ে? ভাইদের বসিয়ে বললুম তোরা রাজি হ, ওদের সঙ্গে তা হলে এগ্রিমেন্ট করি। ওরা ঘাড় নাড়ল, বলল, ধারধোর করে দু-জনে এক লাখ টাকা তুলে দেবে, বড়দা, বাকি দু-লাখ তুমি জোগাড় করো। আমি কোথা থেকে জোগাড় করব? ধীরা বলল বাবাকে বলে দেখি।’
কানাইলাল বললেন, ‘কই ধীরা তো আমাকে কিছু বলেনি! বললে নিশ্চয় চেষ্টা করতুম। চিৎপুরে এখনও আমাকে পাবার জন্য অনেক গদিওয়ালা মুখিয়ে আছে। ভেবো না, দু-লাখ জোগাড় হয়ে যাবে। তুমি তো সোজা আমাকেই বলতে পারতে, আমিও কি তোমার বাবা নই?’
জয়দেব দু-হাতে কানাইলালের দুটো পা আঁকড়ে ধরল, ‘বাবা আমাকে বাঁচান। ভাইয়েরা আমার নামে মামলা করেছে, আমি নাকি ওদের বঞ্চিত করে দোকানটা দখল করতে চাইছি। ওদের সম্মতি ছাড়া আমি যেন কোনো এগ্রিমেন্ট কারোর সঙ্গে না করি। কোর্ট ওদের পক্ষেই রায় দিয়েছে। এখন দু-লাখ পেলে ভাই দুটোকে বুঝিয়ে দিতে পারব আমি তোদের ঠকিয়ে দোকানটা কবজা করতে চাই না। বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন মহলে ওরা রটিয়ে দিয়েছে দাদা ওদের ভাগিয়ে দোকান দখল করতে চাইছে। কী লজ্জার কথা!’
কানাইলাল অবাক হয়ে বললেন, ‘অ্যাতো কাণ্ড হয়ে গেছে অথচ আমি এর বিন্দুবিসর্গও জানি না! অবশ্য বিয়ে হয়ে গেলে মেয়ে তো আর বাবার থাকে না, তখন সে শ্বশুরবাড়ির, বাবা তখন পর। কিছুদিন অপেক্ষা কর, বাড়ি থেকে আগে বেরোই।’
কানাইলাল মনে মনে দ্রুত ভেবে নিলেন ব্যাঙ্কে আর পোস্ট অফিসে ছয় বছর মেয়াদি সার্টিফিকেটে কত টাকা আছে। লাখখানেক তো হবেই। জয়দেবকে দিতে অসুবিধা হবে না। টাকা জমাচ্ছেন গাড়ি কেনার এবং নীলার বিয়ের জন্য। এ ছাড়া আর কোনো খরচ আপাতত আছে বলে তার মনে হল না। নিশ্চিন্ত বোধ করে তিনি জয়দেবকে বললেন, ‘নীলা তো এবার পার্ট-টু দেবে। একটা ভালো ছেলে দেখে দাও তো।’
জয়দেব বলল, ‘এখনই কেন, বি এ-টা পাশ করুক। ভালো ছেলেরা বি এ পাশ বউ চায়।’
‘তোমার বউ তো বি এ পাশ নয়, তার মানে কি তুমি ভালো ছেলে নও?’ কানাইলাল সস্নেহে জামাইয়ের দিকে তাকালেন। জয়দেব লাজুক হেসে মুখ নামিয়ে বলল, ‘ভালো ছেলে আর হলুম কই! আপনার মেয়ে ছেঁড়া শাড়ি সেলাই করে বাড়িতে পরে! নতুন শাড়ি কিনে দেবার ক্ষমতা যার নেই তাকে ভালো ছেলে বলবেন?’
এই সময় দু-কাপ চা নিয়ে এল নীলা। মেয়েদের মধ্যে কানাইলালের সেজোমেয়েটিই বাবার মতো গৌরবর্ণ, লম্বা এবং আকর্ষণীয় গড়নের। কথাবার্তাতেও পটু।
দু-জনের হাতে কাপদুটো দিয়ে নীলা বলল, ‘বাবা ডাক্তারবাবু কিন্তু কথা কম বলতে বলেছেন।’
‘কখন বলল?’
‘সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে দাদাকে বলে গেছেন। বোনাইবাবু ভাত খেয়ে যাবেন কিন্তু।’
জয়দেব তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘আমাকে দোকান যেতে হবে। আমি উঠি এখন।’ দ্রুত চুমুক দিয়ে দিয়ে কাপের চা শেষ করে সে উঠে দাঁড়াল, ‘তোমার দিদি বরং খেয়ে যাক। বাবা আমি আসি। ফোনে খবর নোব কিংবা আপনিও খবর দিতে পারেন।’
