কানাইলাল প্রথম যেদিন মদ খেয়ে বাড়ি ফেরেন কামিনী তাকে সিঁড়ির দেওয়ালে হাত রেখে একপা একপা করে উঠতে দেখে ভয়ে ‘তোজু তোজু’ বলে বড়ো ছেলের নাম ধরে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন। তেজেশ ছুটে আসে। বাবাকে সে দু-হাতে জড়িয়ে শোবার ঘরে নিয়ে খাটে শুইয়ে ধীর গলায় মাকে জানিয়ে দেয়, ‘মদ খেয়েছে। চেঁচিয়ো না। ওবাড়ির ওরা হাসবে।’ ওবাড়ি মানে জ্যাঠা নন্দলালের বাড়ি।
স্বর নামিয়ে কামিনী গজরান, ‘জানতুম, প্রথম থেকেই আমার মন বলেছিল যাত্রায় বদসঙ্গে পড়বে। মদ ধরবে তারপর মেয়েমানুষ নিয়ে কেলেঙ্কারি করবে। দরকার নেই আর যাত্রা করে।’
কানাইলাল চোখ বন্ধ করে শুয়েছিলেন। এবার চোখ খুলে হাসলেন। ‘যাত্রা আর করব না। তুমিই সংসার চালিয়ো।’ বলে চোখ বন্ধ করলেন।
কামিনী জোরালো উত্তর দিতে গিয়ে থমকালেন, তারপর বললেন একটু তেজ দেখিয়েই, ‘হ্যাঁ, আমিই চালাব। তেমন হলে লোকের বাড়ি ঝি-রাঁধুনির কাজ করে চালাব।’
‘শিবু গাঙ্গুলিও এমন পচা ডায়লগ এখন আর লিখবে না, অন্যকিছু ছাড়ো। সংসারে লোক ক-টা গুনে দেখেছ? তোজু, বিজু, নীলা, সুষি, সুরো, তুমি, আমি, ধীরার বিয়ে হয়ে গেছে। ও থাকলে, আঙুলের কর গুনে কানাইলাল জানালেন, ‘আটজন। ধীরা নেই সাতজন, পারবে? পারলে কালই যাত্রা ছেড়ে দেব।’
নিজেকে ঠেলেঠুলে তুলে কানাইলাল উঠে বসে তোজুর দিকে তাকালেন। বড়ো ছেলেটি তার খুবই বাধ্য এবং আদরের। বাবার মতোই সুদর্শন। তার বড়ো গুণ সে শান্তিপ্রিয় ও নরম চরিত্রের, যেটা প্রায় ব্যক্তিত্বহীনতার পর্যায়ে পড়ে যায়। লেখাপড়ায় মনোযোগী। কেমিস্ট্রিতে এখন ষষ্ঠ বর্ষের ছাত্র। বাবা কী বলতে চায় বুঝে নিয়ে তোজু বোতামগুলো খুলে পাঞ্জাবিটা মাথার উপর দিয়ে টেনে বার করে নিল, আলনা থেকে পাজামাটা এনে বলল, ‘পরো।’
কানাইলাল উঠে দাঁড়ালেন। টলে গেলেন, তোজু ধরে ফেলল। ধুতিটা খুলে খাটের উপর ছুড়ে দিলেন। আন্ডারওয়্যারের দড়ি ধরে টান দিতেই কামিনী, ‘অসভ্যতার একটা সীমা আছে। লজ্জা-ঘেন্নাটাও যাত্রা করে ঘুচিয়েছ?’ বলেই তিনি দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
‘দে।’ কানাইলাল হাত বাড়ালেন। তোজু পাজামাটা এগিয়ে দিল।
খাটে আবার শুয়ে ক্লান্ত জড়িত স্বরে কানাইলাল বললেন, ‘লেখাপড়া করেনি, বাড়ি থেকে বেরোয়ও না। তোর মা মধ্য যুগে পড়ে আছে। সি ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড মাই পরিশ্রম মাই টেনশন। বয়স বাড়ছে রে তোজু। নায়ক ছিলুম এখন খলনায়ক। দেহপট সনে নট সকলি হারায়, কী দারুণ একটা কথা রসরাজ বলে গেছেন। তোকে দেখলে আমি চল্লিশ বছর আগে ফিরে যাই। তুই বাবা আমার কাছে কাছে থাকিস।’ বলেই তিনি পাশ ফিরে কোলবালিশটা জড়িয়ে ধরলেন এবং দু-মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লেন।
এরপর তিনি মদ খেয়ে ফিরলেও কাউকে টের পেতে দিতেন না। তার গাড়ি থামার শব্দ পেলে তোজু নীচে নেমে দরজায় দাঁড়াত। কানাইলাল পছন্দ করতেন না কেউ তাকে ধরে দোতলায় তুলে দিক। ছেলের কাঁধে হাত রেখে সিঁড়ি ভেঙে উঠতেন। একদিন তিনি বুকে ব্যথা অনুভব করলেন। ঘরে এসে ঘামছিলেন। তার মুখের দিকে তাকিয়ে তোজু বলল, ‘শিগগিরি শুয়ে পড়ো।’ পাখার রেগুলেটর ঘুরিয়ে ফুলস্পিড করে দিয়ে সে কামিনীকে ডেকে আনল।
উদবিগ্ন মুখে তিন মেয়ে বাবার মাথার কাছে দাঁড়াল।
‘আমি ডাক্তার রায়কে ডেকে আনছি।’ তোজু বেরিয়ে গেল।
‘ব্যথা করছে? কষ্ট হচ্ছে?’ কামিনী স্বামীর বুকে হাত রেখে ভীত গলায় বললেন। মেজোমেয়ে সুনীলা বলল, ‘বাবা বড্ড পরিশ্রম করে। কয়েক মাস রেস্ট নিতে বাড়িতে থাকুক।’
‘বললেই কী আর শুনবে।’ সেজোমেয়ে সুষমা ফ্রক ছেড়ে সালোয়ার-কামিজ সদ্য ধরেছে, সে ঠোঁট বাঁকিয়ে নীচু স্বরে বলল, ‘বাড়িতে থাকলে ওসব খাওয়া তো বন্ধ হয়ে যাবে।’
ছোটোমেয়ে সুরমা দিদিদের কথায় যোগ দিল না, শুধু মাকে মনে করিয়ে দিল, ‘মা উনুনে কিছু চাপিয়ে এসেছ কি?’
‘হ্যাঁ, তাইতো, সুধি দৌড়ে গিয়ে গ্যাসটা বন্ধ করে আয়। চা পরে খাব আগে ডাক্তার আসুক।’
হাতে ছোটো কার্ডিয়োগ্রাফ যন্ত্র ঝুলিয়ে ডাক্তার এলেন। যন্ত্রে হার্টের অবস্থা পরীক্ষা করে কাগজের ফিতেয় আঁকাবাঁকা উঁচুনীচু স্পন্দন রেখার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তেমন কিছু তো দেখছি না। ভয় পাওয়ার মতো কিছু নয় তবে সাবধানে থাকতে হবে। ওর যা পেশা তাতে হার্টের ওপর স্ট্রেইন হবেই। এক মাস অন্তত রেস্টে থাকুন।’
সুনীলা তোজুর দিকে তাকিয়ে বিজ্ঞের মতো বলল, ‘আমি তো একথাই বলেছি একটু আগে। আমাদের ক্লাসের শিপ্রার বাবাকে ডাক্তার ঠিক এই কথাই বলেছিল।’
ব্লাড প্রেশার পরীক্ষা করে ডাক্তারবাবু ভ্রূ কোঁচকালেন। চারটে ওষুধ লিখে দিয়ে চারশো টাকা নিয়ে ডাক্তার চলে যাবার আগে কামিনীকে বলে গেলেন, ‘ড্রিঙ্কস একদম বন্ধ, সিগারেট একটাও নয়।’
তোজু ওষুধ কিনতে বেরোবার আগে ফোন করল ধীরাকে আর ভবেশ সাহাকে। আধঘণ্টার মধ্যে হাজির হল জয়দেবকে সঙ্গে নিয়ে ধীরা। জয়দেবকে দেখে কানাইলাল অবাক হয়ে বললেন, ‘এ কী চেহারা হয়েছে তোমার। অসুখ-বিসুখ হয়নি তো?’
জয়দেবের মুখে ফুটে উঠল বেদনার ছাপ। সে শুকনো হেসে বলল, ‘গ্যাস্ট্রিকটা ইদানীং বেড়েছে। চিন্তার তো শেষ নেই, খাওয়া-দাওয়াটাও ঠিকমতো হচ্ছে না।’ মুখ থেকে বেদনা সরিয়ে সে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার এরকম কেন হল?’ তোজু বলল ‘একটা মাইল্ড স্ট্রোক হয়েছে, ডাক্তারবাবু ওকে তাই বলেছেন।’
